নিজস্ব প্রতিবেদক | ক্রাইম ক্রনিকল

লেখা: ফাহিম ফয়সাল


দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ওয়াজ আমি আগ্রহ নিয়ে শুনিনি কখনো। ছোটবেলায় ঢাকার ডিআইটি রোডে দেখতাম, শীতকালে আর রমজানে ভ্যানে করে তাঁর ওয়াজ বাজিয়ে বাজিয়ে হামদ-নাত-গজলের সিডি-ক্যাসেট বিক্রি হচ্ছে। তখন তিনি বহাল এমপি।


ঢাকার রাস্তায় যদি এত কপি বিক্রি হয়ে থাকে, ঢাকার বাইরে যে আরও বেশি হয়েছে তা অনুমান করা কঠিন নয়। প্রচারযন্ত্রটি ছোট ছিল না।


আমি না শুনলেও আমার প্রয়াত বাবা এবং তাঁর অধিকাংশ বন্ধুর মুখে সাঈদীর প্রশংসা শুনতাম, দু-একজন ছাড়া। যদিও বাবাকে জীবনে একদিনও তাঁর ওয়াজ শুনতে দেখেছি বলে মনে করতে পারি না।


হয়তো লোকমুখে ভালো শুনে তিনিও ভালো বলতেন। কিংবা নিছক বিএনপির জোটসঙ্গী হওয়ার কারণেই বলতেন।


যে শব্দগুলো কানে বাজত

ওই সিডি-ক্যাসেটে উঁচু গলায় যা বলা হতো, তার মধ্যে পুনরাবৃত্তির কারণে যে শব্দগুলো বারবার কানে বাজত — "মা", "মেয়েদের পর্দা", "ঠিক কি না?", "জান্নাত", "হুর", "হে যুবক"।


বর্তমান সময়ের বক্তাদের মধ্যে মিজানুর রহমান আজহারীর মধ্যেই এই ধারাটি ধরে রাখার প্রবণতা সবচেয়ে স্পষ্ট বলে আমার মনে হয়।


সেই সময় থেকে আজ পর্যন্ত এসব বিষয়ের একটিতেও আমি কোনো আকর্ষণ বোধ করিনি।


মা প্রসঙ্গে

মাকে নিয়ে আদিখ্যেতার বিশেষ অর্থ নেই। প্রতিটি পুরুষই তার মায়ের সেবা করে — সব দেশে, সব যুগে। জাহেলি আরবেও করত।


কুরআনে এর বেশি আলোচনা নেই। বরং মায়ের চেয়ে বেশি বলা হয়েছে আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং উলিল আমরের আনুগত্য ও ভালোবাসার কথা।


কারণ মাকে মানুষ সব যুগেই সেবা করেছে; কিন্তু আল্লাহ, নবী-রাসূল ও আল্লাহর নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রতি আনুগত্যের চেয়ে বেয়াদবির ইতিহাসই বেশি প্রবল। কুরআন, হাদিস, বাইবেল, ইহুদি ধর্মগ্রন্থ — সবই তা-ই ইঙ্গিত করে।


অর্থাৎ শুধু মায়ের সেবা করে জান্নাত পাওয়ার সরল কোনো ব্যবস্থা ধর্মে নেই। সাহাবিদের জীবনী পড়লে বরং উল্টো চিত্র মেলে — যাঁরা সত্যের প্রশ্নে পিতা বা মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক পর্যন্ত ছিন্ন করেছিলেন, তাঁরাই সর্বশ্রেষ্ঠ সাহাবির মর্যাদা পেয়েছেন।


আর হজরত ওয়াইস কারনি — মায়ের সেবার কারণে যাঁকে নবীজির সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে দেওয়া হয়নি — তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ তাবেয়ি ও ওলির মর্যাদা পেয়েছেন, কিন্তু সাহাবির মর্যাদা পাননি।


হুর ও জান্নাতের আলোচনা

আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্যের সঙ্গে যৌনতাসংশ্লিষ্ট একটি অংশ জুড়ে দিয়ে সেটিকে বারবার হাইলাইট করলে ধর্মকে ছোট জায়গায় নামিয়ে আনা হয় — এটি আমি ছোটবেলা থেকেই অনুভব করতাম।


জান্নাতের বর্ণনায় লোভের উপাদানগুলো নবীজির যুগে কাদের সামনে উপস্থাপিত হতো, সেটিও ভাবার বিষয়। আবু বকর, উমর, উসমান, আলীর সঙ্গে এসব প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা হতো না।


তখন এতটা বুঝতাম না। শুধু প্রশ্ন জাগত — এঁদের আলোচনায় এত নারী আসে কেন? আল্লাহর আনুগত্যকে হুর-পরি পাওয়ার স্তরে নামিয়ে আনা হচ্ছে কেন?


একটি স্ববিরোধিতা

২০২৫ সালে এসে সাঈদীর বেশ কয়েকটি ওয়াজ শুনলাম। দেখলাম, তিনি বড় পীর আবদুল কাদির জিলানীর প্রশংসা করছেন; অথচ খাজা বাবাকে ব্যঙ্গ করে "গাজা বাবা" বলছেন। খাজা বাবার মা ছিলেন বড় পীরের আত্মীয়। মামাকে ভালো বলা হচ্ছে, আর ভাগ্নের লকব বিকৃত করা হচ্ছে।


আবদুল কাদির জিলানীকে বলা হয় মুহিউদ্দিন — ধর্মের পুনর্জীবনদানকারী। এক হাজার বছর আগে বাগদাদে যখন প্রকৃত ইসলামের শিক্ষা ক্ষয়িষ্ণু, তখন লাখো মানুষকে মুরিদ করে তিনি সেই শিক্ষা সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন।


তিনি সত্যপীর ছিলেন বলেই ভবিষ্যতের বিপর্যয় সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। তাঁর ওফাতের (১১৬৬ খ্রি.) অর্ধশতাব্দীর মধ্যেই চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বে মঙ্গোল শক্তির উত্থান ঘটে; ১২১৯-২১ সালে তাদের অভিযান মুসলিম প্রাচ্যকে বিধ্বস্ত করে ফেলে।


আর ১২৫৮ সালে চেঙ্গিসের নাতি হালাকু খানের হাতে বাগদাদের পতন ঘটে। নগরটি লুণ্ঠিত ও ধ্বংস হয়, লাখো মানুষ নিহত হন, নারী-শিশুরা নজিরবিহীন নৃশংসতার শিকার হন — ইতিহাসে এটিই আব্বাসীয় খিলাফতের সমাপ্তি।


সম্ভবত সেই আজাব আসার আগেই তিনি তাঁর নিয়ামতপ্রাপ্ত খলিফা ও মুরিদদের সপরিবারে বাগদাদ ত্যাগ করার নির্দেশ দিয়ে যান। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে, বিভিন্ন অঞ্চলে ইসলামের সত্য তরিকা প্রচারের দায়িত্ব দিয়ে তাঁদের প্রেরণ করেন।


এমনই এক নির্দেশপ্রাপ্ত পরিবার আজমিরের খাজা বাবার পরিবার। আর খাজা বাবাই এ উপমহাদেশে ইসলামের অবিসংবাদিত প্রবর্তক।


এ দেশে কুরআন নিজে নিজে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। যে খাজা বাবাকে ব্যঙ্গ করা হয়েছে, তাঁর কাঁধে ভর করেই এ অঞ্চলে কুরআন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল — তখনো শাহজালাল (রহ.)-এর জন্মই হয়নি।


উসিলার প্রশ্ন

আবার বাগদাদের কথায় আসি। বাগদাদসহ গোটা বিশ্বে ইসলাম যখন ওলী-আল্লাহ ও পীরদের পথ থেকে সরে গিয়ে বিদআতে ভরে যাচ্ছিল, বড় পীর তখন তা সংস্কার করে বিশ্বব্যাপী এক বড় পুনর্গঠন ঘটিয়েছিলেন। সেই ঐতিহাসিক অবদানের স্মৃতিতেই আজও ‘ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম’ উপলক্ষে সরকারি স্কুল-কলেজে ছুটি পালিত হয়।


"বিদআতে ভরে যাচ্ছিল" বলতে কী বোঝাতে চাইছি? সে যুগেও কিছু মৌলভি ও জন্মসূত্রে মুসলিম মানুষ বিশ্বাস করতেন, কোনো মাধ্যম বা উসিলা ছাড়াই সরাসরি আল্লাহর কাছে পৌঁছে যাওয়া যায়।


অথচ চাঁদে যেতেও রকেটের উসিলা লাগে — যেমন সাঈদীকে চাঁদে দেখা যাওয়ার সেই প্রচারণার কথাই ধরুন। আল্লাহর সান্নিধ্যে পৌঁছাতে নাকি কোনো মাধ্যমই লাগে না!


এমন বিষাক্ত ধারণা যাঁরা মানতেন, তাঁরা প্রকৃত ওলী-আউলিয়াদের ইসলাম থেকে দূরে সরে গিয়েছিলেন খারিজিদের মতোই।


খারিজিরা যেমন হজরত আলীর (রা:) খিলাফতের সময় প্রচার করত, "হুকুম তো একমাত্র আল্লাহর, আলী হুকুম দেওয়ার কে?" — ঠিক সেভাবেই বাংলাদেশের জমিনে ওই ধারণা ছড়াতে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রেখেছিলেন এই সাঈদী। আর তাঁর শেষ পরিণতির কথা তো আপনারা সবাই জানেন।


মুজাদ্দিদে আলফে সানি প্রসঙ্গে

তাঁর ভিডিওতে দেখলাম, তিনি মুজাদ্দিদে আলফে সানির বিপ্লবী জীবন নিয়ে ওয়াজ করতেন — কারণ ইমাম আহমদ সিরহিন্দি তাঁর যুগের প্রতাপশালী সম্রাট আকবরের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন।


কিন্তু ওই বিরুদ্ধাচরণকে "বিপ্লব", "সাহসিকতা" বলে উদযাপন করলেও, মুজাদ্দিদে আলফে সানির পীরত্ব কিংবা নকশবন্দিয়া-মুজাদ্দেদিয়া তরিকার ইমাম হওয়া নিয়ে তিনি একটি ওয়াজও করতেন না।


অথচ মুজাদ্দিদে আলফে সানি মূলত পীরই ছিলেন, মাদ্রাসাপড়ুয়া আলেম নন। বস্তুত সে সময় ভারতে মাদ্রাসাই ছিল না। তাঁর 'মাকতুবাত' বা 'মাবদা ওয়া মাআদ' পড়লে যে কেউ তা বুঝতে পারবেন।


সত্যের সঙ্গে মিথ্যা মিশিয়ে যে ইসলাম কোটি মানুষের মধ্যে ইনজেক্ট করা হয়েছে, আজকের সমাজে আমরা তার ফলই দেখছি।


ঈদে মিলাদুন্নবীর ছুটি ও একটি স্মৃতি

২০০১-০৬ সময়ে এই ঘরানার একটি দল খালেদা জিয়ার কাছে গিয়ে ঈদে মিলাদুন্নবীর ছুটি বাতিলের প্রস্তাব দিয়েছিল। তিনি নবীজি এবং ওলী-আউলিয়া কী, তা ভালোভাবেই বুঝতেন।


প্রস্তাব শুনে তিনি বলেছিলেন — "এসব কথা আমার সামনে একবার বলেছ, আর কোনোদিন বলবে না, চলে যাও।" অন্য এক প্রসঙ্গে ওই দলটিকে তিনি বলেছিলেন, "যারা শুয়ে আছে, তাদের শুয়ে থাকতে দাও; জাগলে সামাল দিতে পারবে না।"


অবস্থান বদলের প্রশ্ন

ইউটিউব-ফেসবুকে ভিডিও আছে, খুঁজে দেখতে পারেন — একবার তিনি লালদীঘি ময়দানে দাঁড়িয়ে মিলাদ পড়ছেন, আবার অন্যত্র বলছেন মিলাদ পড়া বিদআত।


এই সময়ের ব্যবধানে কী ঘটল? প্রশ্নটি রাখাই যথেষ্ট।


যে ব্যক্তি অবস্থান বদলান, তাঁকে ওলী-আউলিয়ার কাতারে বসালে ইউরোপ-আমেরিকায় ইসলামোফোবিয়া তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। এর জন্য প্রথমেই পাশ্চাত্যকে দায়ী করা যায় না — আগে মুসলিম জনগোষ্ঠীকেই দায় নিতে হয়।


নবীজিকে যেভাবে উপস্থাপন করা হলো

এক ওয়াজে তিনি বলেছেন, নবী বড় ভাইয়ের মতো। আরেক ওয়াজে বলেছেন, নবীজি নূর। আবার কোথাও বলেছেন, মাটির তৈরি।


নবী করিম (সা.)-এর জীবনকে তিনি এমনভাবে মানুষের মানসপটে ঢোকানোর চেষ্টা করেছেন, যেন মনে হয় আমরাও তাঁর মতো, তিনিও আমাদের মতো।


কাজী নজরুল লিখেছিলেন, "দেখে আমিনা মায়ের কোলে দোলে শিশু ইসলাম দোলে।" যাঁর কাজই সুন্নত, যাঁর মুখের কথাই কুরআন ও হাদিসের ভিত্তি — তিনি সাধারণ মানুষ নন। নজরুল হৃদয়ঙ্গম করেছিলেন, নবীজি নিজেই ইসলাম। এই শিক্ষাটি এই ধারার বয়ানে অনুপস্থিত।


এই লেখায় প্রকাশিত মতামত সম্পূর্ণরূপে লেখকের নিজস্ব; সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল থাকা আবশ্যক নয়। লেখায় উল্লিখিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা ও ঐতিহাসিক মূল্যায়ন লেখকের বিশ্বাস ও পর্যবেক্ষণভিত্তিক।