নিজস্ব প্রতিবেদক | ক্রাইম ক্রনিকল
শেরেবাংলা নগরের যে ফটক দিয়ে একসময় কেবল রাষ্ট্রীয় গাড়িবহর ঢুকত, আগামীকাল থেকে সেই ফটক দিয়ে ঢুকবেন সাধারণ মানুষ।
প্রায় দেড় দশক ধরে গণভবন ছিল সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারি বাসভবন। রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু এই ভবনটির ভেতরে কী হয়, তা নিয়ে বাইরের মানুষের কৌতূহল ছিল সবসময়ই।
দুই বছরের ব্যবধানে সেই ভবনই হয়ে উঠেছে 'জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর'। আজ বুধবার সকাল ৯টায় ফলক উন্মোচন করে জাদুঘরটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
যেদিন খুলে গিয়েছিল ফটক
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে সরকারপ্রধান পদত্যাগ করে দেশ ছাড়ার পর গণভবনের ফটক আর আটকে রাখা যায়নি।
সেদিন হাজারো মানুষ ঢুকে পড়েছিলেন ভবনটিতে। যে ভবন ছিল ক্ষমতার প্রতীক, কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তা রূপ নিয়েছিল উৎসুক জনতার ভিড়ে।
সেদিনের ছবি ও ভিডিও দেশ-বিদেশের গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন দৃশ্য এর আগে দেখা যায়নি।
সিদ্ধান্ত থেকে আইন
গণভবনকে জাদুঘরে রূপান্তরের ভাবনা আসে অভ্যুত্থানের পরপরই। তবে সিদ্ধান্ত থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত পথটি ছিল দীর্ঘ।
গত বছরের ১৩ নভেম্বর অন্তর্বর্তী সরকার জাদুঘর প্রতিষ্ঠা-সংক্রান্ত অধ্যাদেশ জারি করে। এরপর প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এগোয় ধাপে ধাপে।
চলতি বছরের ১০ এপ্রিল জাতীয় সংসদে সংশোধনীসহ পাস হয় 'জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর বিল, ২০২৬'। এর মধ্য দিয়ে জাদুঘরটি আইনি ভিত্তি পায়।
সংসদে উত্থাপিত সংশোধনী প্রস্তাবগুলোর একটি ছিল জাদুঘর পর্ষদের সভাপতি নির্বাচন নিয়ে। বাইরে থেকে মনোনীত বিশেষজ্ঞের বদলে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে সভাপতি করার প্রস্তাব সেখানে ছিল।
উদ্বোধনের সকাল
আজকের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন ব্যারিস্টার জাইমা রহমান। উদ্বোধনের পর তাঁরা জাদুঘরের বিভিন্ন গ্যালারি ও প্রদর্শনী ঘুরে দেখেন।
উপস্থিত ছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান।
অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত হয় গণ-অভ্যুত্থানের ঘটনাপ্রবাহ, জনগণের অংশগ্রহণ ও বিজয়ের ইতিহাস নিয়ে নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্র।
জুলাই যোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যরা মঞ্চে দাঁড়িয়ে স্মৃতিচারণা করেন। কারও কণ্ঠ কেঁপে ওঠে, কেউ থেমে যান মাঝপথে। সাংস্কৃতিক পর্বে দেশের বিশিষ্ট শিল্পীরা দেশাত্মবোধক গান ও আবৃত্তি পরিবেশন করেন।
কেন এই জাদুঘর
সরকারি ব্যাখ্যা অনুযায়ী, জাদুঘরটির উদ্দেশ্য তিনটি – অভ্যুত্থানের স্মৃতি সংরক্ষণ, প্রকৃত ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং শহীদ ও জুলাই যোদ্ধাদের আত্মত্যাগের স্মারক হিসেবে টিকে থাকা।
সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী এটিকে বাংলাদেশের ফ্যাসিবাদবিরোধী গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাসে একটি অবিস্মরণীয় মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
বিশ্বের নানা দেশে স্বৈরশাসনের প্রতীকী স্থাপনাকে জাদুঘরে রূপান্তরের নজির আছে। গণভবনের এই রূপান্তরও সেই ধারারই একটি সংযোজন।
আগামীকাল থেকে সবার জন্য
উদ্বোধনের দিনটি বিশেষ অতিথি ও শহীদ পরিবারের জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। আগামীকাল বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) থেকে জাদুঘরটি সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেওয়া হবে।
গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্কৃতিমন্ত্রী এ তথ্য জানান। দর্শনার্থীদের অনলাইনে আবেদন করে প্রবেশের সুযোগ নিতে হবে।
তবে প্রস্তুতি পুরোপুরি শেষ হয়েছে, তা বলা যাচ্ছে না। জাদুঘরটির স্থায়ী জনবল নিয়োগ প্রক্রিয়া এখনো সম্পন্ন হয়নি বলে জানা গেছে।
সংবাদ সম্মেলনে সংস্কৃতিমন্ত্রী বলেন, জাদুঘর নির্মাণ বা ব্যবস্থাপনা নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলে তা গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হবে।
ভবনটি এখন কী বলবে
একটি ভবনের চরিত্র বদলে যাওয়া নিছক স্থাপত্যের ব্যাপার নয়। যে দেয়ালগুলো একসময় ক্ষমতার আড়াল ছিল, সেগুলোই এখন প্রদর্শনীর পটভূমি।
দুই বছর আগেও সাধারণ মানুষের কাছে এই ভবন ছিল দূরের, দুর্গম। আগামীকাল থেকে সেখানে ঢুকবে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা, ঢুকবেন শহীদ পরিবারের সদস্যরা।
তবে প্রশ্ন থেকেই যায় – স্মৃতি সংরক্ষণের এই আয়োজন কতটা টেকসই হবে, আর শহীদ পরিবারগুলোর দৈনন্দিন বাস্তবতায় কতটা পরিবর্তন আসবে। জাদুঘরের ফলক উন্মোচনের পর সেই উত্তর খোঁজার দায়িত্ব রাষ্ট্রেরই।