পরিবেশ ডেস্ক | ক্রাইম ক্রনিকল
পৃথিবীর সবচেয়ে ঠান্ডা অঞ্চলগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত সাইবেরিয়া এখন পুড়ছে অস্বাভাবিক গরমে। উত্তর রাশিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় তাপমাত্রা নিয়মিতভাবে ৯০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ৩২ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
গত ৩ আগস্ট বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী সায়েন্টিফিক আমেরিকান-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি সপ্তাহজুড়েই মেরু অঞ্চলটিতে এই উত্তাপ অব্যাহত রয়েছে এবং তা চলতি গ্রীষ্মে ভেঙে যাওয়া তাপমাত্রার রেকর্ডের তালিকাকে আরও দীর্ঘ করেছে।
জ্যাকি ফ্লিন মোজেনসেনের লেখা ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, আর্কটিক বৃত্তের কাছাকাছি অবস্থিত সেলাগনসি আবহাওয়া কেন্দ্রে গত কয়েক দিনে ৯৩ ডিগ্রি ফারেনহাইট (৩৩ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস) তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। একই সময়ে পাশের ওলেনেক কেন্দ্রে পারদ উঠেছে ৯০ দশমিক ৯ ডিগ্রি ফারেনহাইটে (৩২ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস)।
আবহাওয়া তথ্যসেবা সংস্থা ওগিমেট এই উপাত্ত সংগ্রহ করে। পরে জলবায়ুবিদ ম্যাক্সিমিলিয়ানো হেরেরা তা বিশ্লেষণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন।
তুলনা করলে দেখা যায়, বছরের এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের অরল্যান্ডো শহরে ঠিক এমন তাপমাত্রাই স্বাভাবিক। অর্থাৎ যেখানে বরফে ঢাকা থাকার কথা, সেই মেরু অঞ্চল এখন গ্রীষ্মমণ্ডলীয় শহরের মতো উত্তপ্ত।
সমুদ্রের বরফ গলছে, বাড়ছে উত্তাপ
বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই ঘটনার পেছনে কাজ করছে একটি বিপজ্জনক চক্র। সমুদ্রের বরফ গলে গেলে আর্কটিকের সূর্যালোক প্রতিফলনের ক্ষমতা কমে যায়, ফলে গাঢ় রঙের সমুদ্রপৃষ্ঠ আরও বেশি তাপ শুষে নেয়।
এতে বরফ গলার গতি আরও বাড়ে, তাপমাত্রাও চড়ে। এই চক্রের কারণেই আর্কটিক অঞ্চল বিশ্বের বাকি অংশের তুলনায় চার গুণ পর্যন্ত দ্রুত উষ্ণ হচ্ছে।
সায়েন্টিফিক আমেরিকান-এর ওই প্রতিবেদনে স্বাধীন আবহাওয়াবিদ অ্যালান জেরার্ড বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোর গবেষণায় দেখা গেছে সমুদ্রের বরফ হারানোর প্রতিক্রিয়ায় আর্কটিক পৃথিবীর অন্য যেকোনো অঞ্চলের চেয়ে অনেক দ্রুত উষ্ণ হচ্ছে। তিনি বলেন, এ কারণে উঁচু অক্ষাংশে এমন সর্বকালীন রেকর্ড তাপমাত্রা দেখা যাওয়াটা বিস্ময়কর নয়।
এল নিনো নিয়ে নতুন শঙ্কা
জেরার্ড ওই প্রতিবেদনে আরও বলেন, এই উত্তাপ শিগগিরই কমার সম্ভাবনা কম। কারণ চলতি বছর একটি শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এল নিনোর সময় প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা অস্বাভাবিক বেড়ে যায়। এর প্রভাবে বিশ্বের কোথাও ভারী বৃষ্টি, কোথাও খরা দেখা দেয় এবং সামগ্রিক তাপমাত্রাও ঊর্ধ্বমুখী হয়।
এই আবহাওয়াবিদের আশঙ্কা, সম্ভাব্য রেকর্ড এল নিনো তৈরি হতে থাকায় ২০২৭ সালে চলতি বছরের চেয়েও বেশি রেকর্ড গরম দেখা যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রেও ভাঙছে রেকর্ড
শুধু মেরু অঞ্চল নয়, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন এলাকাতেও তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙেছে। নিউইয়র্ক সিটির সেন্ট্রাল পার্কে ২০১২ সালের পর প্রথমবারের মতো তাপমাত্রা ১০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট (৩৭ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস) ছুঁয়েছে।
একই সময়ে মন্টানা অঙ্গরাজ্যের কিছু অংশে তাপমাত্রা উঠেছে ১১১ ডিগ্রি ফারেনহাইট (৪৩ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস) পর্যন্ত। আইডাহো, উটাহ ও ওয়াইওমিংয়ের বিভিন্ন এলাকাতেও পারদ ১০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট ছাড়িয়ে গেছে।
প্রভাব পড়বে গোটা বিশ্বে
জলবায়ু বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন, আর্কটিকের এই দ্রুত উষ্ণায়ন হিমবাহ গলার গতি বাড়িয়ে দেয় এবং চিরহিমায়িত মাটি বা পারমাফ্রস্ট গলিয়ে দেয়।
পারমাফ্রস্টের নিচে আটকে থাকা মিথেনের মতো বিপুল পরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস বেরিয়ে এলে উষ্ণায়ন আরও ত্বরান্বিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে বিশ্বজুড়ে বায়ুপ্রবাহ ও আবহাওয়ার স্বাভাবিক ধরন এলোমেলো হয়ে যেতে পারে। ফলে মেরু অঞ্চলের এই গরমের খেসারত দিতে হবে বহু দূরের দেশগুলোকেও।
(তথ্যসূত্র: সায়েন্টিফিক আমেরিকান, ৩ আগস্ট ২০২৬)