স্টাফ রিপোর্টার | ক্রাইম ক্রনিকল
জলবায়ু আন্দোলনকর্মী ও শিক্ষা সংস্কারক সোনম ওয়াংচুকের একটি পুরনো ভিডিও নতুন করে সামনে আসায় অনলাইনে বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে। সম্প্রতি অভিনেতা আমির খান দাবি করেছিলেন, ২০০৯ সালের বহুল আলোচিত চলচ্চিত্র "থ্রি ইডিয়টস" নির্মাণের সময় তিনি কিংবা ছবির নির্মাতারা কেউই ওয়াংচুকের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন না। এই বক্তব্যের পরপরই ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিও সেই দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে।
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ওই ক্লিপে দেখা যাচ্ছে, সোনম ওয়াংচুক ২০০৮ সালে মুম্বাইয়ে আমির খানের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতের কথা স্মরণ করছেন—যা "থ্রি ইডিয়টস" মুক্তি পাওয়ার এক বছর আগের ঘটনা। ওয়াংচুকের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি অনুষ্ঠানে তাঁদের দুজনের দেখা হয়েছিল, যেখানে তিনি সিয়াচেন সংঘাত নিয়ে একটি চলচ্চিত্রের ধারণা আমিরের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছিলেন।


ভিডিওতে ওয়াংচুক জানান, তিনি আমিরকে সিয়াচেন সংঘাতের মানবিক ও আর্থিক ক্ষতির দিকগুলো তুলে ধরে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের পরামর্শ দিয়েছিলেন। তিনি এমন একটি গল্পের প্রস্তাব দেন, যেখানে দুই দেশের সাধারণ নাগরিকরা মিলে উত্তেজনা প্রশমনে ভূমিকা রাখবেন, যাতে সামরিক ব্যয় কমিয়ে সেই সম্পদ শিক্ষাখাতে ব্যবহার করা সম্ভব হয়।
ওয়াংচুকের দাবি, আমির খান তাঁর এই ধারণা মনোযোগ দিয়ে শুনেছিলেন এবং এ বিষয়ে তাঁর প্রস্তুত করা একটি উপস্থাপনাও দেখেছিলেন। ভিডিওতে ২০০৮ সালের ওই অনুষ্ঠানের কিছু দৃশ্যও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যেখানে দেখা যায় ওয়াংচুক একটি পুরস্কার গ্রহণ করছেন এবং দর্শক সারিতে বসে আমির খান হাততালি দিচ্ছেন।
ওই আন্দোলনকর্মী আরও জানান, এর অল্প কিছুদিন পরই তিনি আর্থ আর্কিটেকচার বিষয়ে পড়াশোনার উদ্দেশ্যে ইউরোপে পাড়ি জমান। তবে ২০০৯ সালের শেষদিকে "থ্রি ইডিয়টস" মুক্তি পাওয়ার পর আমির খানের নাম আবার তাঁর জীবনে ফিরে আসে, যখন অনেক বন্ধু ছবিটি দেখার পর তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে শুরু করেন।
ওয়াংচুকের ভাষ্যমতে, বেশ কয়েকজন তাঁকে জানান যে ছবিটি লাদাখে তাঁর জীবন ও শিক্ষা-সংক্রান্ত কর্মকাণ্ড থেকে অনুপ্রাণিত বলে মনে হচ্ছে। এই দাবিতে কৌতূহলী হয়ে তিনি নিজের স্কুলের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং জানতে পারেন, একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ দল প্রকৃতপক্ষে সেই ক্যাম্পাসে গিয়েছিল। তবে সেখানে শুটিংয়ের অনুমতি দেওয়া হয়নি বলে জানা যায়, কারণ ওই দলটি প্রকল্প সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি এবং ক্যাম্পাসে প্লাস্টিক সামগ্রী নিয়ে আসার পরিকল্পনা করেছিল, যা স্কুলের পরিবেশ সংক্রান্ত নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল। ফলে, শুটিং স্থানান্তরিত করে কাছাকাছি অন্য একটি স্কুলে নিয়ে যাওয়া হয় বলে ওয়াংচুক জানান।
উল্লেখ্য, "থ্রি ইডিয়টস" ছবিতে আমির খান অভিনীত চরিত্র ফুনসুখ ওয়াংড়ু নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা জল্পনার জবাব দেওয়ার পরপরই এই ভিডিওটি নতুন করে সামনে আসে। লন্ডন ইন্ডিয়ান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে এক প্রশ্নোত্তর পর্বে আমির খান বলেছিলেন, এই চরিত্রটি সোনম ওয়াংচুকের ওপর ভিত্তি করে তৈরি—এমন ধারণা একটি "ভুল বোঝাবুঝি" মাত্র।

আমির খান দাবি করেন, ছবি নির্মাণের সময় তিনি নিজে, পরিচালক রাজকুমার হিরানি কিংবা চিত্রনাট্যকার অভিজাত জোশী—কেউই সোনম ওয়াংচুকের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন না। তাঁর এই মন্তব্য ভারতের একাধিক বিরোধী রাজনীতিবিদের সমালোচনার মুখে পড়ে। রাষ্ট্রীয় জনতা দলের (আরজেডি) রাজ্যসভা সাংসদ মনোজ ঝা প্রশ্ন তোলেন, আমির খান এই বিষয়টি স্পষ্ট করতে এত বছর কেন সময় নিলেন, একইসঙ্গে তিনি সোনম ওয়াংচুকের চলমান অনশন কর্মসূচির প্রসঙ্গও উত্থাপন করেন।
আম আদমি পার্টির (আপ) নেতা সঞ্জয় সিং-ও অভিনেতার সমালোচনা করে অভিযোগ করেন, ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে কথা বলতে জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বরা ক্রমশ অনীহা প্রকাশ করছেন। অন্যদিকে কংগ্রেস নেতা হুসেইন দলওয়াই আমির খানকে সোনম ওয়াংচুকের পক্ষে সমর্থন প্রকাশের আহ্বান জানান।
এই বিতর্ক সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীদের মধ্যেও বিভাজন সৃষ্টি করেছে। একদল ব্যবহারকারী পুনরায় প্রকাশিত ২০০৮ সালের ভিডিওকে "থ্রি ইডিয়টস" মুক্তির আগেই আমির খান ও সোনম ওয়াংচুকের সাক্ষাতের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরে আমিরের সাম্প্রতিক মন্তব্যের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। আবার অন্য একটি অংশ আমির খানের পক্ষ নিয়ে যুক্তি দিচ্ছেন যে, খ্যাতিমান ব্যক্তিরা নিয়মিতভাবে বহু মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং বছরের পর বছর পরে প্রতিটি সাক্ষাতের কথা মনে রাখা তাঁদের পক্ষে সম্ভব নাও হতে পারে।
এই নতুন করে সামনে আসা তথ্য ফুনসুখ ওয়াংড়ু চরিত্রটি সোনম ওয়াংচুক দ্বারা অনুপ্রাণিত কি না—এই দীর্ঘদিনের বিতর্ককে আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। আমির খান ছবি নির্মাণের সময় এমন কোনো সংযোগের কথা দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করলেও, ২০০৮ সালের তাঁদের সাক্ষাতের পুনরায় প্রকাশিত ফুটেজ ভক্ত ও পর্যবেক্ষকদের মধ্যে নতুন করে জল্পনার জন্ম দিয়েছে।
এদিকে, এই বিতর্কের মধ্যেই সোনম ওয়াংচুকের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগজনক খবর সামনে এসেছে। শনিবার, ১৮ জুলাই, তাঁর অনির্দিষ্টকালীন অনশন কর্মসূচি ২১তম দিনে গড়ানোর মধ্যেই তাঁকে একটি সরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। দিল্লি পুলিশের বরাত অনুযায়ী, ওয়াংচুকের অবনতিশীল স্বাস্থ্য পরিস্থিতির কথা বিবেচনায় নিয়ে দিল্লি হাইকোর্টের নির্দেশ এবং চিকিৎসকদের পরামর্শের ভিত্তিতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
তবে এই স্থানান্তর প্রক্রিয়া নিয়ে জন্তরমন্তরে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে জানা গেছে। কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া (সিপিআই)-এর পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, ওয়াংচুককে জোরপূর্বক সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এর ফলে তাঁর হাসপাতালে স্থানান্তরকে ঘিরে বিতর্ক আরও ঘনীভূত হয়েছে, এবং এই ঘটনা তাঁর দীর্ঘদিনের আন্দোলন ও "থ্রি ইডিয়টস" সংক্রান্ত বিতর্কের প্রেক্ষাপটে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।