হাসিনোসংস্কার: আজব হাসিনোসের গুজব কাহিনী-০১

হাসিন সরকার


নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন লোটা সংস্কার আন্দোলন চলছে। হাসিনোস দর্শন বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। পড়াশোনার কোন ইচ্ছা তাঁর ছিলো না। ঘনশ্যাম ত্যাজ্যপুত্র করে দেবার হুমকি দিয়েছিলেন; কারণ গুল্টুসাংসারিক চাপে দার্শনিক হতে না পারার বেদনা তিনি পুত্রকে দিয়ে উপশম করতে চান। শেষে গুল্টুশমামণির মাথার দিব্যিতে বিহারে পড়াশোনা করতে আসা হাসিনোসের। বিহারে পড়াশোনা বাদে সব কিছুই করা হয় তাঁর, তাই আন্দোলনের খবর পাওয়া মাত্রই সে যোগ দেয়। যদিও পিতার দিক থেকে যবন নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর জন্য নির্ধারিত লোটা বরাদ্দ ছিলো হাসিনোসের জন্য, তবুও সে লোটা সংস্কার চায়। বিশেষ করে কয়েক প্রজন্ম আগে অত্যাচারি খন্দ বংশের শেষ রাজা যোহন খন্দের বিরুদ্ধে মৌর্য বংশের প্রতিষ্ঠাতা মহান শক মৌর্যবর ও তাঁর চৌকস প্রধানমন্ত্রী চাণ উদ্দিনের নেতৃত্বে যারা জনযুদ্ধ করেছিলেন তাঁদের তৃতীয় প্রজন্ম পর্যন্ত লোটা দেবার নাম করে ব্যাপক অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও মেধাবিদের বঞ্চনা চলছিলো, হাসিনোসচেতন ব্যক্তি মাত্রই এর প্রতিবাদে হাসিনোসোচ্চার হয়েছিলেন।


গুল্টুশমণি ও নানাবাড়ির আদরে বড় হাসিনোস ছোটবেলা থেকেই পোংটা প্রকৃতির ছিলেন। তৎকালীন মৌর্য সম্রাট আশেককে খেপাতে তিনি ‘মহাগাঁজা, তোমায় খেলাম’, ‘আমি গাঁজাকার’ ইত্যাদি লিখিত প্ল্যাকার্ড নিয়ে ক্যাম্পাসে যেতে লাগলেন। 


উল্লেখ্য, আশেক গাঁজা খেয়ে হরদম উষ্টুম ধুষ্টুম বকতেন আর কপিল দেবের বোলিঙের ভিডিও দেখতেন, কিন্তু গাঁজাকারকে একদমই দেখতে পারতেন না। তবে খেলার সাথে তিনি আবার রাজনীতি মেশাতেন না। তাই গাঁজাকারের ছেলের সাথে নিজের মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর নাতি-নাতনিকে তিনি গাঁজাকারের নাতি-নাতনি হিসেবে স্বীকৃতি দেন না। তাই তাঁদের জন্য বরাদ্দ রয়েছে স্বর্ণনির্মিত বিশেষ লোটা।


এদিকে ক্যাম্পাসে তখন ভাইপো’র ত্রাসের রাজত্ব। ভাইপো হচ্ছে সহবত ভাইয়ের সংগঠন। নালন্দার হলে হলে তখন একটাই বুলি-’সহবত  ভাই’। কেউ কিছুতে হাঁ করলেও ‘সহবত ভাই’, না করলেও ‘সহবত ভাই’। যেদিকে তাকাই শুধু ‘সহবত ভাই’ আর ‘সহবত ভাই’, ‘সহবত ভাই’ ছাড়া আর কিছু নাই। এই সহবত ভাইয়ের ছেলে মানে পো(লা)দের নিয়েই মৌর্যযুদ্ধের সপক্ষের সংগঠন-ভাইপো; যার অনুকরণে পরবর্তীতে হিটলারের জার্মানিতে গড়ে উঠে গেস্টাপো। আর তৎকালীন মৌর্য ভারতে ছিলো গুপ্তঘাতকের দল-খাপো। পুলি্সের ক্ষমতা বলতে কিছু ছিলো না। খাপো আর ভাইপোরাই সরকারের পক্ষে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের কাজটা করতো, আন্দোলন দমনের দায়িত্বও তাদের উপরই পড়েছিলো।


ভাইপোরা আশেকস্তম্ভের সামনে আন্দোলনরত তাদেরই ভাইদের উপর যখন হামলে পড়ে, তখন তাদেরকে সহায়তা দিতে মেয়াদোত্তীরণ টিয়ার শেল ও রাবার শেল নিয়ে পথে একশনে নামে মৌর্য পুলিস। রাতের বেলা সানগ্লাস পরে হাসিনোস মেয়াদোত্তীরণ টিয়ার শেল সংগ্রহ করছিলেন ভোক্তা অধিকার আদালতে মামলা করবেন বলে। কিন্তু কিছু সময় পরে  আর না পেরে ‘আই হেইট টিয়ারস রে’ বলে চোখের জল, নাকের জল ও অনুচ্চার্য অন্য জল এবং বলকে কোনমতে এক করে প্রাণ বাঁচাতে বাধ্য হয়ে তিনি আশ্রয় নিলেন ‘বেগম সঙ্ঘমিত্রা কা মাল’ হলে-এটি ছিল মেয়েদের হল; সম্রাট আশেকের পুণ্যবতী কন্যা ও রাবণভূমি লঙ্কায় মহামতি বুদ্ধের বাণী প্রচারকারিণী সঙ্ঘমিত্রার নামে করা।

জল ও বল এক করে এই হল আশ্রয় করলেন হাসিনোস। হলের মেয়েদেরকে উদ্দেশ্য করে বাজপড়া গলায় কিছুক্ষণ ‘হলে হলে হো যায়েগা পেয়ার’ গাইলেন। তারপর গেস্টরুমে একটু রেস্ট করে চেস্টে কিছুটা স্বস্তি ফিরাবেন ভেবে যেই না চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যহমানের সুবিশাল প্রতিকৃতি খচিত দুয়ার পেরিয়েছেন, তখুনি তিনি যা দেখলেন…রাসেল ভাইপার দেখার জন্য তিনি প্রস্তুত ছিলেন, কিন্তু এ দৃশ্য দেখার জন্য নয়। তিনি দেখলেন সোডোম ভাইকে এবং বিশিষ্ট সঙ্গীতশিল্পী কেশাকে। বিহারের গোমোরাহ জেলার সোডোম ভাইয়ের কথা তিনি আগে লোকমুখে শুনেছেন, নিন্দুকেরা বলে গোমোরাহের এই সূর্যসন্তান নানা রকম গোমরাহীতে লিপ্ত। তিনি হলেন কেন্দ্রীয় খাপো কমিটির নারী ও শিশু বিষয়ক সম্পাদক।


সাধারণভাবে বলতে গেলে, হাসিনোস দেখলেন, নারী ও শিশু বিষয়ক সম্পাদক সোডোম ভাই নারী ও শিশু সম্পাদনা করছেন; সম্পাদনা করছেন তিনি কেশাকে যে কিনা একইসাথে নারী ও শিশু। হাসিনোস এটা বুঝেছেন কারণ সোডোম ভাই একটু পর পরই কেশাকে ‘মাই গার্ল’ ও ‘মাই বেবি’ বলে আদুরে স্বরে সম্বোধন করছিলেন। বিশেষভাবে বলতে গেলে, হাসিনোস দেখলেন, লোটা সংস্কার ও আন্দোলন বিরোধী সোডোম ভাই হাতমুখ ধুয়ে মুখ দিয়ে বোঁটা সংস্কার ও হাত দিয়ে ওটা আন্দোলন করছিলেন। সোডোম ভাইয়ের চিৎকার ও কেশা আপুর শীৎকারে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে আসছিলো, নিষ্কাম মহাপুরুষ হাসিনোসের স্থলে অন্য কেউ হলে সে রাতে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারতো না সে কথা বলাই বাহুল্য।



হাসিনোসের নিজেকে তখন এম্ফিথিয়েটারের গ্যালারির দর্শকের সারিতে বসা দাদাবাড়ি গ্রিসের রাইভাল রোমের সম্রাট বলে মনে হচ্ছিলো। সোডোম ভাইকে মনে হচ্ছিলো গ্ল্যাডিয়েটর স্পারটাকাস আর কেশা আপুকে নিখিল ইটালিক পেনিনসুলার উন্মত্ততম সিংহী। অথবা মাঝে মাঝে নিজেকে স্টেডিয়ামে ইটালিয়ান সিরি ‘আ’র দর্শক বলেও মনে হচ্ছিলো। সোডোম ভাই যেন ইন্টারকোর্স মিলন, থুক্কু ইন্টার মিলন; আর কেশা আপু যেন এসি মিলন। অথবা উল্টোটা।



সবই ঠিক ছিলো। কিন্তু ঘটনার ঘনঘটায় হাসিনোসের মুখ দিয়ে মরোক্কান শিষ্য বিশ্বভ্রামক ইবনে বতুতার (Travellers of Bihar এর এক পোস্টে তার সাথে হাসিনোসের পরিচয়; এরপর থেকে যখনি ইবনে বতুতা বাংলায় আসে, হাসিনোসের জন্য তোহফা হিসেবে বগলমে নাইকির জুতা নিয়ে আসে) মুখে শোনা ‘আস্তাগফিরুল্লাহ মিন জালিক’ বেরিয়ে গেলো। কোন এক অজানা রহস্যময় কারণে এতক্ষণ সোডোম ভাই এবং কেশা আপুর দুই নয়ন আমোদে বুজে ছিলো। মৌর্য ভারতে আচম্বিত মরুদেশের বুলি শুনে তাদের চমক ভাঙলো। ঘটনার আকস্মিকতা সামাল দিতে তাড়াহুড়া করতে গিয়ে সোডোম ভাই ভুলে সোফার নিচে পড়ে থাকা কেশার কামিজ পরতে শুরু করলেন, আর কেশা আপু সোডোম ভাইয়ের শার্ট।



হাসিনোস কী করবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না। হাস্যরস, সোমরস (টেবিলে বিহারি মদের বোতল ছিলো), করুণরস, আদিরস-সর্বরসে টইটুম্বুর এক অদ্ভুত পরিবেশ তখন। কামিজ পরেই তুখোড় ছাত্রনেতা সোডোম ভাই বেরিয়ে গেলেন, আর কেশা আপু দুই সাইজ বড় শার্ট পরে হতভম্ব হয়ে বসে রইলেন।



কেশা আসলে নিজের ইংরেজি কোন গানের কলি গাইছিলো নাকি সেকথা জিজ্ঞাসা করবেন কিনা ভাবছিলেন হাসিনোস, এমন সময় কামিজ পরিহিত সোডোম ভাই সহবত ভাইয়ের আরো কিছু অনুসারীকে নিয়ে রুমে ঢুকে গর্জাতে লাগলেন, ‘এই তোরা এই গাঁজাকারের বাচ্চাকে ধর। ওরাই উপাচার্যের বাড়িতে এটাক করছে।’ পাশ থেকে বেমক্কা কে জানি বলে উঠলো, ‘কিন্তু সোডোম ভাই, উপাচার্যের বাড়িতে তো আমরা এটাক করছি। সহবত ভাইয়ের অর্ডারে।’ সোডোম ভাই হুংকার দিয়ে উঠলেন, হুংকারের প্রেসারে দুই সাইজ ছোট কামিজের এ জায়গায়, ও জায়গায় এবং সে জায়গায় সেলাই ছেঁড়ার পটপট আওয়াজ শোনা গেলো। ‘তুমি আবার ‘আমরা’ চোদাও ক্যান? এই যবনের পুত ব্লোজব ছড়াইছে। ওকে পুলিসে দিতে হবে।’



যবদ্বীপের যবের রুটি হাসিনোস খেয়েছেন বটে, কিন্তু ব্লোজব কী বস্তু তা তিনি জানেন না। জিজ্ঞাসা করার সুযোগ তিনি পেলেন না। তার আগেই  সোডোম ভাই উদাস স্বরে কেশার দিকে শাহাদাত অঙ্গুলি নির্দেশ করে বললেন, ‘কেশা এ রুমে কার সাথে কী করছিলো বলে তোমাদের মনে হয়? অনৈতিক জবে জড়িত থাকার অপরাধে কেশাকে ভাইঝি’র সঙ্গীত বিষয়ক সম্পাদকের পদ থেকে এক্ষণ অব্যাহতি দেয়া হলো।’ কেশা অবাক হয়ে প্রতিবাদ করতে যাচ্ছিলো, কিন্তু অনুসারীদের ‘জি, সোডোম ভাই। সোডোম ভাই জিন্দাবাদ।’ স্লোগানে কলকলিয়ে উঠতে পারলো না সেথায় নারীর প্রতিবাদ। যুবসমাজের অবক্ষয় রোধে ব্লোজব ছড়ানোর অভিযোগে ভাইপো’র বীরপুঙ্গবেরা রাজপথের লড়াকু সৈনিক ও মৌর্যবাদের ত্রাস মহামতি হাসিনোসকে ব্লোজব ছড়ানোর অভিযোগে জনগণের বন্ধু পুলিসের হাতে সোপর্দ করতে মারতে মারতে টেনে নিয়ে চললো। হাসিনোসের দুঃখ এই যে, কেউ একটি বারের তরে পুঁছলো না সোডোমের পরনে কেন কামিজ আর কেশার পরনে কেন শার্ট। অস্ট্রীয় মনোবিজ্ঞানী ফ্রয়েড বিস্তর ইতিহাস ঘেঁটে প্রমাণ করতে প্রয়াস পেয়েছেন যে, ক্রসড্রেসিঙের এটাই রেকর্ডেড সর্বপ্রথম দৃষ্টান্ত।



তা যা হোক, ব্লোজব ছড়ানোর অভিযোগে হাসিনোস তো গ্রেফতার হলেন। তাকে রাখা হলো পাটলিপুত্র কেন্দ্রীয় কারাগারে। খবর চলে গেলো বাংলায়। বাংলায় মৌর্য সাম্রাজ্যবাদকে প্রতিরোধকারী বারভৌমিকের এক ভৌমিক ছিলেন হাসিনোসের মাতামহ। পাটলিপুত্রে এই মর্মে সম্মিলিত বারভৌমিকের পত্র গেলো যে, পত্রপাঠ ওয়ারী বটেশ্বরের ভৌমিকের দৌহিত্রকে যদি মুক্তি না দেয়া হয় তাহলে নিখিল বঙ্গ সেনাবাহিনী অনতিবিলম্বে মগধ আক্রমণ করবে। পাটলিপুত্রের মৌর্যবাদী কর্তৃপক্ষ ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে ভবিষ্যতে আর কখনও ব্লোজবসহ কোন ধরনের অনৈতিক ‘কামকাণ্ডে’ না জড়ানোর মর্মে মুচলেকা নিয়ে হাসিনোসকে মগধ ও বঙ্গের সীমান্তবর্তী চরসাঁকো (Bridge of Spies) দিয়ে তার মাতামহের প্রযত্নে সযত্নে হস্তান্তর করে। 

(অসমাপ্ত)