বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ডেস্ক | ক্রাইম ক্রনিকল
মহাকাশ নিয়ে বড় একটি সুখবর দিলেন বিজ্ঞানীরা। আমাদের সৌরজগৎ থেকে প্রায় ৭৩ আলোকবর্ষ দূরে থাকা এক নক্ষত্রের কাছে তাঁরা সম্ভবত প্রথমবারের মতো খুঁজে পেয়েছেন একটি 'চাঁদ'-এর মতো বস্তু। সিডি-৩৫ ২৭২২ নামের একটি নক্ষত্রব্যবস্থায় মিলেছে এই আবিষ্কারের প্রমাণ।
গত ২২ জুলাই ২০২৬ বিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী নেচারে এই গবেষণাটি প্রকাশিত হয়। এরপর ২৭ জুলাই (বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে ৯টার দিকে) মার্কিন সংবাদমাধ্যম গুড নিউজ নেটওয়ার্কসহ বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবরটি বিস্তারিতভাবে প্রকাশিত হয়।

পোলিশ এবং মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী আলেকজান্ডার ওলশ্চান। তিনি সৌরজগতের বাইরের প্রথম গ্রহগুলো আবিষ্কার করেন।
বহু বছর আগে বিজ্ঞানী আলেকজান্ডার ওলশ্চান সৌরজগতের বাইরে প্রথম একটি গ্রহ খুঁজে পেয়েছিলেন। তখনই তিনি বলেছিলেন, ভবিষ্যতে এমন আরও হাজারো গ্রহ পাওয়া যাবে। তাঁর সেই কথা সত্যি হয়েছে। এখন ৮০ বছর বয়সী এই বিজ্ঞানীর সেই ধারাবাহিকতাতেই এবার পাওয়া গেল চাঁদও।
কেন একে সহজে 'চাঁদ' বলা যাচ্ছে না
আমাদের চেনা চাঁদগুলো সব সময় কোনো না কোনো গ্রহকে ঘিরে ঘোরে। কিন্তু নতুন পাওয়া এই বস্তুটি কোনো গ্রহকে ঘিরে ঘুরছে না। এটি ঘুরছে এমন একটি বস্তুকে ঘিরে, যেটি নিজেই একটি নক্ষত্রকে ঘিরে ঘোরে। অর্থাৎ এখানে মোট তিনটি স্তর—প্রথমে নক্ষত্র, তারপর সেটিকে ঘিরে ঘোরা একটি বড় বস্তু, আর তারপর সেই বস্তুকে ঘিরে ঘোরা আরেকটি ছোট বস্তু। এমন তিন স্তরের ব্যবস্থা বিজ্ঞানীরা এই প্রথম দেখলেন। আকারেও এই 'চাঁদ' আমাদের চেনা যেকোনো চাঁদের চেয়ে ঢের বড়।
এই আবিষ্কারের পেছনে আছেন চিলিতে কর্মরত তরুণ শিক্ষার্থী-গবেষক কেভিন হয়। মাসের পর মাস গবেষণা করে তিনি বলেছেন, পুরো ব্যবস্থাটা আমাদের সৌরজগতের তুলনায় সত্যিই অদ্ভুত।
কী আছে এই ব্যবস্থায়
সিডি-৩৫ ২৭২২ নক্ষত্রটির ভর সূর্যের প্রায় অর্ধেক। এই নক্ষত্রকে ঘিরে ঘুরছে একটি 'বাদামি বামন' (ব্রাউন ডোয়ার্ফ), যাকে অনেকে 'ব্যর্থ নক্ষত্র'ও বলেন। এই নাম পাওয়ার কারণ, এটি অন্য নক্ষত্রের মতোই তৈরি হতে শুরু করে, কিন্তু ভেতরে হাইড্রোজেন থেকে হিলিয়াম তৈরি হওয়ার মতো যথেষ্ট ভর জোগাড় করতে পারে না, তাই সত্যিকারের নক্ষত্রের মতো জ্বলে ওঠা হয় না তার। ভরের হিসেবে এটি বৃহস্পতির চেয়ে ১৩ থেকে ৮০ গুণ পর্যন্ত ভারী হতে পারে, তারপরও সূর্যের ভরের মাত্র সামান্য একটা অংশ মাত্র। আর এই বাদামি বামনকেই ঘিরে ঘুরছে বৃহস্পতি গ্রহের সমান আকারের একটি বড়, গ্যাসীয় বস্তু, যাকে বিজ্ঞানীরা বলছেন সম্ভাব্য 'চাঁদ'।
বিজ্ঞানীরা দিলেন নতুন নাম
এই বস্তুটাকে ঠিক 'গ্রহ' বা 'চাঁদ' কোনোটাই বলা যাচ্ছে না। তাই বিজ্ঞানীরা একে একটা নতুন নাম দিয়েছেন—'এক্সোস্যাটেলাইট'। কেভিন হয় বলেন, বস্তুটা আকারে একটা গ্রহের মতোই বড়, কিন্তু সরাসরি কোনো নক্ষত্রকে ঘিরে ঘোরে না। তবু যেহেতু এটি একটা বড় বস্তুকে ঘিরে ঘোরে, তাই একে চাঁদ বলেই ডাকতে ইচ্ছে করে তাঁর—যদিও আমাদের সৌরজগতের ছোট পাথুরে চাঁদগুলোর সঙ্গে এর প্রায় কোনো মিলই নেই।

কেভিন হয় এবং অ্যালিস জুরলো; চিলির ইউনিভার্সিটি ডিয়েগো পোর্টালেস এবং ইউরোপীয় সাউদার্ন অবজারভেটরির এই দুই জ্যোতির্বিজ্ঞানী যথাক্রমে পিএইচডি গবেষক এবং ইয়েমস (YEMS) নিউক্লিয়াস ডিরেক্টর।
গবেষণায় তাঁর সহযোগী ছিলেন অ্যালিস জুরলো। তিনি বলেন, আমাদের সৌরজগতে গ্রহ আর সূর্যের মধ্যে পার্থক্য বোঝা সহজ। কিন্তু এই নতুন ব্যবস্থায় নক্ষত্র, গ্রহ আর চাঁদের মধ্যে সীমারেখা এতটাই অস্পষ্ট যে বোঝানোটাই কঠিন হয়ে পড়ে। তাঁর মতে, এটি সত্যিকারের একটা বড় আবিষ্কার।
এখনই পুরোপুরি 'চাঁদ' বলছেন না বিজ্ঞানীরা
তবে গবেষক দল এখনই একেবারে নিশ্চিতভাবে বলছেন না যে এটি সত্যিকারের একটি এক্সোমুন বা বহির্জাগতিক চাঁদ। কারণ এটা বলতে হলে আগে 'চাঁদ' শব্দটার একটা নতুন, স্পষ্ট সংজ্ঞা ঠিক করতে হবে, যা এখনো তৈরি হয়নি। তবে একটা বিষয়ে তাঁরা পুরোপুরি নিশ্চিত—এটি একটি 'এক্সোস্যাটেলাইট', আর এখন পর্যন্ত এমন প্রথম শনাক্তকরণ। ভবিষ্যতে একে ঠিক কী নামে ডাকা হবে, তা যা-ই হোক না কেন, এই আবিষ্কারের গুরুত্ব কমছে না।
কীভাবে খুঁজে পেলেন বিজ্ঞানীরা
এখন পর্যন্ত সৌরজগতের বাইরে ছয় হাজারের বেশি গ্রহ পাওয়া গেছে। কিন্তু চাঁদ পাওয়া গেছে হাতে গোনা কয়েকটি মাত্র, তা-ও পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। এবার বিজ্ঞানীরা ইউরোপিয়ান সাউদার্ন অবজারভেটরির ভেরি লার্জ টেলিস্কোপ (ভিএলটি) ব্যবহার করে বাদামি বামনটির খুব সামান্য একটা কাঁপুনি লক্ষ করেন। এই কাঁপুনির কারণ, তার চারপাশে ঘুরতে থাকা বস্তুটির নিজস্ব মহাকর্ষ বল। এই কাঁপুনি মেপেই বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হন, সেখানে সত্যিই একটি বস্তু ঘুরছে।
কেন এই খবরটা গুরুত্বপূর্ণ
আমাদের সৌরজগতে আটটি গ্রহের মধ্যে ছয়টিরই নিজস্ব চাঁদ আছে। তাই মহাবিশ্বেও এমন চাঁদ থাকাটা স্বাভাবিক হওয়ারই কথা। সমস্যা শুধু একটাই—চাঁদগুলো আকারে অনেক ছোট হয়। যেমন আমাদের চাঁদও পৃথিবীর তুলনায় ছোট, আর মঙ্গল গ্রহের চাঁদ ফোবোস তো মাত্র সাত মাইল (প্রায় সাড়ে এগারো কিলোমিটার) চওড়া। তাই এত দূরের নক্ষত্রব্যবস্থায় এত ছোট একটা বস্তু খুঁজে পাওয়া এত দিন প্রায় অসম্ভবই ছিল।
ভবিষ্যতে এই কাজে বড় ভূমিকা রাখতে পারে চিলিতে নির্মাণাধীন 'এক্সট্রিমলি লার্জ টেলিস্কোপ' (ইএলটি), যা এক্সোমুন ও এক্সোস্যাটেলাইট খোঁজার কাজে বিশেষভাবে ব্যবহৃত হবে বলে আশা করছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। তাঁদের ভাষায়, প্রথম বহির্গ্রহ শনাক্তের পর থেকেই একটা বিষয় বারবার প্রমাণিত হচ্ছে—মহাবিশ্বের গ্রহব্যবস্থাগুলো কতটা বৈচিত্র্যময় ও বিস্ময়কর হতে পারে, তার কোনো সীমা নেই।