স্টাফ রিপোর্টার | ক্রাইম ক্রনিকল


সতর্কীকরণ: এই প্রতিবেদনে শিশু নির্যাতন–সংক্রান্ত স্পর্শকাতর তথ্য রয়েছে।


সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে অর্থের বিনিময়ে শিশু যৌন নির্যাতনের সামগ্রী প্রচারের বিজ্ঞাপন চলছে বলে জানিয়েছে বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। এসব বিজ্ঞাপন ব্যবহারকারীদের নিয়ে যাচ্ছিল টেলিগ্রাম মেসেজিং অ্যাপের বিভিন্ন চ্যানেলে, যেখানে মাত্র ৯৯ টাকায় এ ধরনের ভিডিও কেনার সুযোগ ছিল।


যেভাবে ধরা পড়ল বিষয়টি


ইনস্টাগ্রামের সুপারিশ-প্রযুক্তি ঠিক কী ধরনের কনটেন্টের দিকে ব্যবহারকারীকে ঠেলে দেয়, তা যাচাই করতেই একধরনের পরীক্ষা চালিয়েছিল বিবিসি। ভারত থেকে খোলা একটি ছদ্মনামের অ্যাকাউন্ট দিয়ে অনুসরণ করা হয় প্রায় দশটি অ্যাকাউন্ট, যেগুলোর বেশির ভাগই নারীদের—খোলামেলা পোশাকে খাবার বা আবহাওয়ার মতো সাধারণ বিষয়েও যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ ভাষায় পোস্ট দিতেন তাঁরা। লক্ষণীয় বিষয় হলো, স্পষ্ট যৌন বিষয়বস্তু নিজে থেকে অনুসন্ধান না করা সত্ত্বেও প্ল্যাটফর্মের অ্যালগরিদম এমন কনটেন্টের দিকেই বারবার ফিরিয়ে আনছিল অ্যাকাউন্টটিকে।


ফল মিলতে দেরি হয়নি। কয়েক দিনের মধ্যেই ফিডে হাজির হতে থাকে ভিডিও-কলের প্রস্তাব ও প্রকাশ্য যৌনতা দেখানো বিজ্ঞাপন। এরপর পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক দিকে গড়ায়—প্রাপ্তবয়স্কদের সঙ্গে যৌন প্রেক্ষাপটে শিশুদের দেখানো একাধিক বিজ্ঞাপনও আসতে শুরু করে, প্রতিটির সঙ্গে জুড়ে দেওয়া টেলিগ্রামের লিংক। উল্লেখ্য, ইনস্টাগ্রামের নিজস্ব নিয়ম অনুযায়ী কোনো বিজ্ঞাপন প্রকাশের আগে প্ল্যাটফর্মের মডারেশন প্রযুক্তির প্রাথমিক অনুমোদন পাওয়ার কথা।


বিজ্ঞাপনে কী দেখা গিয়েছিল


মোট প্রায় ৩০টি এমন ভিন্ন বিজ্ঞাপন উঠে আসে যেখানে শিশু যৌন নির্যাতনের সামগ্রী প্রচার করা হচ্ছিল, যদিও কয়েকটি একাধিক অ্যাকাউন্ট থেকে বারবার শেয়ার হয়েছিল। ছদ্মনামের অ্যাকাউন্টটিতে আরও প্রায় ২০টি বিজ্ঞাপন দেখানো হয়েছিল প্রাপ্তবয়স্কদের পর্নোগ্রাফিসংবলিত।


এর মধ্যে একটি বিজ্ঞাপনে আনুমানিক ১২ বছর বয়সী একটি ছেলে ও মেয়েকে যৌন কর্মকাণ্ডে জড়িত অবস্থায় দেখানো হয়েছিল। অন্য একটিতে দেখা যায়, ৫২ বছর বয়সী এক পুরুষ ১২ বছর বয়সী একটি মেয়ের শরীর জড়িয়ে ধরে আছেন, সঙ্গে ছিল টেলিগ্রামমুখী একটি লিংক। আরেকটি বিজ্ঞাপনে দেখা গিয়েছিল কান্নারত অল্পবয়সী এক মেয়েকে, যার বিবরণ থেকে ইঙ্গিত মিলছিল সে যৌন নির্যাতনের শিকার। এই তিনটি বিজ্ঞাপনসহ সব কটি বিজ্ঞাপন ও সংশ্লিষ্ট টেলিগ্রাম চ্যানেল ভারতের কর্তৃপক্ষের কাছে রিপোর্ট করেছে বিবিসি।


ভারতীয় আইনে শিশু যৌন নির্যাতনের সামগ্রী এবং প্রাপ্তবয়স্কদের পর্নোগ্রাফি বিতরণ—দুটিই ফৌজদারি অপরাধ। মেটার নিজস্ব নীতিতেও নগ্নতা, যৌন অঙ্গ প্রদর্শন বা শিশু নির্যাতনসংবলিত বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ।


প্ল্যাটফর্মগুলোর প্রতিক্রিয়া


বিবিসি প্রথমে ইনস্টাগ্রামের কাছে এসব বিজ্ঞাপনের একটি রিপোর্ট করলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্ল্যাটফর্মটি জানায়, তাদের পর্যালোচনায় বিজ্ঞাপনটি কমিউনিটি নির্দেশিকার লঙ্ঘন হিসেবে ধরা পড়েনি। পরে ইনস্টাগ্রামের মূল প্রতিষ্ঠান মেটার কাছে মন্তব্য চাইলে তারা জানায়, একাধিক বিজ্ঞাপন ও সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট তারা সরিয়ে ফেলেছে। বিবিসির অনুসন্ধানের ফল জানার পর আরও কিছু বিজ্ঞাপন-অ্যাকাউন্ট বন্ধ এবং একাধিক লঙ্ঘনকারী ইউআরএল ব্লক করার কথাও জানায় মেটা।


ইনস্টাগ্রামের আয়ের বড় অংশই আসে বিজ্ঞাপন থেকে। মেটা জানুয়ারিতে জানিয়েছিল, ২০২৫ সালের অর্থবছরে তাদের প্রায় দুই হাজার কোটি ডলার আয়ের প্রায় ৯৮ শতাংশ এসেছে বিজ্ঞাপন থেকে, আর বিশ্লেষকদের হিসাবে ইনস্টাগ্রামের আয়ের ৯০ শতাংশের বেশিও বিজ্ঞাপন-নির্ভর। মেটার দাবি, সাধারণ পোস্ট যাচাই ছাড়া প্রকাশিত হলেও প্রতিটি বিজ্ঞাপন অনুমোদনের আগে পর্যালোচনা করা হয়—মূলত স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির মাধ্যমে ছবি, ভিডিও, টেক্সট, অডিও এবং লক্ষ্যদর্শক ও লিংক-গন্তব্য যাচাই করে। অনিশ্চিত ক্ষেত্রে বিষয়টি যায় মানুষের পর্যালোচনায়। মার্চে মেটা জানিয়েছিল, তৃতীয় পক্ষের মানব মডারেটরের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়াচ্ছে।


টেলিগ্রাম বিবিসিকে জানিয়েছে, এ বছর শিশু নির্যাতনের সঙ্গে যুক্ত দুই লাখ ৭৪ হাজারের বেশি গ্রুপ ও চ্যানেল তারা সরিয়ে দিয়েছে, স্বয়ংক্রিয় ও মানবিক—দুই ধরনের মডারেশনই ব্যবহার করে। বিবিসির রিপোর্ট করা দুটি চ্যানেলের একটি তারা বন্ধ করে দেয়, তবে অন্যটি নতুন ভিডিও পোস্ট করে যাচ্ছিল বলে দেখা গেছে।


সমালোচনা ও আইনি জবাবদিহি


ভারতের সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মদন লোকুর বিবিসির পাওয়া তথ্যে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, এই বিষয়টি এতটাই গুরুতর যে সুপ্রিম কোর্ট নিজে থেকেই এটি আমলে নিতে পারে এবং সরকারকে যেকোনো সামাজিক মাধ্যম প্ল্যাটফর্মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিতে পারে। ব্যবহারকারীর আপলোড করা কনটেন্টের জন্য প্ল্যাটফর্মকে আইনি সুরক্ষা দেওয়া হলেও, তাঁর ভাষায়, ইনস্টাগ্রাম "একটি অপরাধমূলক কাজে অংশ নিয়ে অর্থ উপার্জন করছে।"


সাবেক ফেসবুক ভাইস প্রেসিডেন্ট ব্রায়ান বোল্যান্ড বলেছেন, বিবিসির অনুসন্ধানের ফল তাঁকে হতবাক না করলেও উদ্বিগ্ন করেছে। ২০০৯ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত কোম্পানিতে থেকে বিজ্ঞাপন ব্যবসা গড়তে সহায়তাকারী বোল্যান্ডের ভাষ্যে, ইনস্টাগ্রামের অ্যালগরিদম এমনভাবে তৈরি যে ব্যবহারকারীকে প্ল্যাটফর্মে ধরে রাখতে ক্রমেই আরও চরম ও প্ররোচনামূলক কনটেন্ট সামনে আনা হয়। অ্যালগরিদমের উদ্দেশ্য কাউকে অপরাধী বানানো নয় বলে তিনি মনে করলেও, দায়িত্বশীল নিয়ন্ত্রণ ও সক্রিয় সুরক্ষা ব্যবস্থার অভাবে এমন পরিণতি অস্বাভাবিক নয় বলে তাঁর অভিমত। আয় ও ব্যবহারকারীর নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্যের প্রশ্নটি ধীরে ধীরে কোম্পানির অগ্রাধিকার তালিকা থেকে সরে যাওয়াকেই তিনি সবচেয়ে দুঃখজনক বলে বর্ণনা করেছেন। ২০২৫ সালে নিজের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট মুছে ফেলেছেন বোল্যান্ড নিজেই।


এ বছরই যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যে মেটার বিরুদ্ধে করা এক মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছিলেন বোল্যান্ড, যেখানে অভিযোগ ছিল—প্ল্যাটফর্মে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে ব্যবহারকারীদের বিভ্রান্ত করেছে মেটা। আদালত মেটাকে ৩৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার জরিমানা দিতে নির্দেশ দেয়; কোম্পানি এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের পরিকল্পনা জানিয়েছে।


মেটা বিবিসিকে পাঠানো বিবৃতিতে শিশু নির্যাতনকে জঘন্য অপরাধ আখ্যা দিয়ে বলেছে, তারা এর বিরুদ্ধে কঠোরভাবে কাজ করছে। ইচ্ছাকৃতভাবে শিশু-সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞাপন আগ্রহী ব্যবহারকারীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার অভিযোগও তারা অস্বীকার করেছে, পাশাপাশি নিরাপত্তার চেয়ে মুনাফাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার অভিযোগও নাকচ করেছে। মেটার দাবি, সন্দেহজনক আচরণের ভিত্তিতে ২০২৫ সালে তারা নিজে থেকেই ৪০ লাখের বেশি অ্যাকাউন্ট নিষ্ক্রিয় করেছে এবং প্রতিরোধব্যবস্থা উন্নত করতে তাদের বিশেষজ্ঞ দল ক্রমাগত কাজ করে যাচ্ছে।


পরিসংখ্যানে বিশ্ব চিত্র


যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সামাজিক মাধ্যম কোম্পানিগুলোর জন্য নিজেদের প্ল্যাটফর্মে শিশু নির্যাতনের সামগ্রী পাওয়া গেলে তা এনসিএমইসি (ন্যাশনাল সেন্টার ফর মিসিং অ্যান্ড এক্সপ্লয়েটেড চিলড্রেন)-এর সাইবার টিপলাইনে জানানো বাধ্যতামূলক, যেখান থেকে তথ্য পাঠানো হয় সংশ্লিষ্ট দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে।


২০২৫ সালে ভারত পেয়েছে ১৯ লাখ এমন রিপোর্ট, তালিকার শীর্ষে থাকা যুক্তরাষ্ট্র পেয়েছে ২০ লাখ। তেলেঙ্গানা রাজ্যের সাইবার নিরাপত্তা ব্যুরোর পরিচালক শিখা গোয়েলের ভাষ্যে, সবচেয়ে বেশি টিপলাইন রিপোর্ট এসেছে মেটার মালিকানাধীন ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুক থেকেই। তবে তাঁর ব্যাখ্যা, এর অর্থ এই নয় যে এরাই সবচেয়ে বড় সমস্যার উৎস; ভালো শনাক্তকরণ অ্যালগরিদম থাকলে স্বাভাবিকভাবেই বেশি অ্যালার্ট ধরা পড়ে।


মুম্বাইভিত্তিক এনজিও রাতি ফাউন্ডেশন অনলাইনে ক্ষতিগ্রস্ত শিশুদের জন্য একটি হেল্পলাইন চালায় এবং সামাজিক মাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে ক্ষতিকর কনটেন্ট অপসারণে কাজ করে। সংস্থার সহপ্রতিষ্ঠাতা সিদ্ধার্থ পিল্লাইয়ের পর্যবেক্ষণ, অপরাধীরা মডারেশন এড়াতে সহজেই ইনস্টাগ্রাম থেকে টেলিগ্রামে সরে যায়, আর সরিয়ে ফেলা কনটেন্ট বারবার নতুন করে আপলোড করতে থাকে।


বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ, ভারতে শিশু নির্যাতনের সামগ্রী মূলত তৈরি করে মানব পাচারের সঙ্গে যুক্ত সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র, যদিও কখনো কখনো পরিবার বা পরিচিত সম্প্রদায়ের সদস্যরাও এর সঙ্গে জড়িত থাকে। শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা প্রতিরোধে কাজ করা আড়াই শতাধিক সংগঠনের নেটওয়ার্ক জাস্ট রাইটস ফর চিলড্রেনের প্রতিষ্ঠাতা ভুবন রিভুর মতে, এ ধরনের অপরাধ পর্যাপ্ত মাত্রায় রিপোর্ট হয় না এবং পুলিশ এখনো প্রয়োজনীয় কারিগরি সক্ষমতা গড়ে তোলার চেষ্টায় আছে। সংঘবদ্ধ এই অপরাধের চাহিদা-জোগানের পুরো শৃঙ্খল চিহ্নিত করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও সীমান্ত-পারাপার গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়কে জরুরি বলে মনে করেন তিনি।



বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অবলম্বনে, নিজস্ব ভাষায় পুনর্লিখিত। কেউ যদি শিশু নির্যাতনের শিকার হওয়া বা এ–সংক্রান্ত কোনো তথ্য জানেন, স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষ বা শিশু সুরক্ষাবিষয়ক হেল্পলাইনে যোগাযোগ করা উচিত।