কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি, ক্রাইম ক্রনিকল।
প্রতিপক্ষকে হত্যা মামলায় ফাঁসানোর পরিকল্পনায় নিজের মাকে হত্যার অভিযোগ উঠেছে মেয়ের বিরুদ্ধে। কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জে প্রায় তিন বছর আগে সংঘটিত হালিমা (৬৫) হত্যা মামলার তদন্তে চাঞ্চল্যকর এ তথ্য উঠে এসেছে। মামলার বাদী নিহতের মেয়ে চাম্পা (৪৮)-কেই গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। পরে তিনি আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পিবিআই।
পিবিআই সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালের ১৪ মার্চ করিমগঞ্জ উপজেলার একটি পতিত জমি থেকে হালিমার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মরদেহের মাথার অংশ মাটিতে পুঁতে রাখা ছিল। তাঁর নাক-মুখে রক্তাক্ত জখমের চিহ্ন এবং গলায় সাদা রশি পেঁচানো অবস্থায় পাওয়া যায়।
এ ঘটনায় নিহতের মেয়ে চাম্পা বাদী হয়ে করিমগঞ্জ থানায় মামলা করেন। মামলায় প্রতিবেশী বিল্লালসহ পাঁচজনের নাম উল্লেখ করা হয় এবং অজ্ঞাত আরও চার থেকে পাঁচজনকে আসামি করা হয়। করিমগঞ্জ থানার মামলা নম্বর-১২, তারিখ ১৪ মার্চ ২০২৩; মামলাটি দণ্ডবিধির ৩০২/২০১/৩৪ ধারায় দায়ের করা হয়।
মামলা দায়েরের দুই দিন পর, ১৭ মার্চ ২০২৩ তারিখে পিবিআই কিশোরগঞ্জ জেলা স্ব-উদ্যোগে মামলাটির তদন্তভার গ্রহণ করে। বর্তমানে মামলাটি তদন্ত করছেন পুলিশ পরিদর্শক আশরাফুল আলম।
তদন্তের একপর্যায়ে মামলার বাদী চাম্পার কর্মকাণ্ড ও বক্তব্যে অসংগতি এবং বিভিন্ন সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে তাঁর প্রতি তদন্ত কর্মকর্তার সন্দেহ সৃষ্টি হয়। পরে গত ১৮ আগস্ট ২০২৬ কিশোরগঞ্জ সদর থানা এলাকা থেকে চাম্পাকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়।
পিবিআইয়ের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে চাম্পা তাঁর মাকে হত্যার পরিকল্পনার কথা স্বীকার করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিনের জমি বিরোধকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের ওপর প্রতিশোধ নেওয়া এবং তাদের হত্যা মামলায় ফাঁসানোর উদ্দেশ্যেই তিনি সহযোগীদের নিয়ে নিজের মাকে হত্যার পরিকল্পনা করেন।
পিবিআইয়ের তদন্ত ও চাম্পার আদালতে দেওয়া জবানবন্দির বরাত দিয়ে জানা যায়, প্রায় ৩০ বছর আগে হালিমা প্রতিবেশী বিল্লালের কাছ থেকে সাড়ে তিন শতাংশ বাড়ির জায়গা কিনেছিলেন বলে দাবি করলেও জমিটির কোনো দলিল ছিল না। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছিল। এ বিরোধকে কেন্দ্র করে ধর্ষণ ও মারামারিসহ একাধিক মামলা-মোকদ্দমাও চলছিল।
ঘটনার প্রায় ১৫ দিন আগে একটি মারামারির ঘটনায় হালিমা আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। এ পরিস্থিতিতে প্রতিপক্ষের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার পরিকল্পনা করেন চাম্পা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১৩ মার্চ রাত আনুমানিক ১১টার দিকে সমঝোতার কথা বলে চাম্পার দুই সহযোগী হালিমাকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যান। পরে তাঁকে হত্যা করা হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
হত্যার পর পরিকল্পিতভাবে ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে চাম্পা নিজেই বাদী হয়ে প্রতিবেশী বিল্লালসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন বলে জানিয়েছে পিবিআই।
গ্রেপ্তারের পর চাম্পাকে আদালতে হাজির করা হলে তিনি গত ১৮ আগস্ট ২০২৬ তারিখে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
পিবিআই জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আরও কেউ জড়িত ছিল কি না, সহযোগীদের ভূমিকা কী ছিল এবং ঘটনার পেছনে অন্য কোনো কারণ বা সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মামলার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
পিবিআই বলছে, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট অন্য ব্যক্তিদের বিষয়ে চূড়ান্তভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না।