স্টাফ রিপোর্টার | ক্রাইম ক্রনিকল
সতর্কীকরণ: এই প্রতিবেদনে শিশু নির্যাতন ও যৌন হয়রানি–সংক্রান্ত স্পর্শকাতর তথ্য রয়েছে।
অনুসন্ধানী গণমাধ্যম দ্য ডিসেন্টের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, দেশের বিভিন্ন কওমি ও কোরআন শিক্ষা মাদ্রাসার অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীদের ভিডিও টিকটকে প্রকাশ করছেন কিছু শিক্ষক, যেগুলোর ক্যাপশন ও উপস্থাপনায় থাকছে স্পষ্টভাবে ইঙ্গিতপূর্ণ ভাষা। এসব ভিডিওর মন্তব্যঘরে জমা হচ্ছে শিশুদের নিয়ে যৌন ইঙ্গিতবাহী অসংখ্য মন্তব্য।
কেন্দ্রীয় ঘটনা: নাইম হাসানের একাউন্ট
দ্য ডিসেন্টের অনুসন্ধানের কেন্দ্রে আছেন ঝালকাঠির রাজাপুরের মারকাজুল কোরআন হাফিজিয়া মাদ্রাসার শিক্ষক এইচ এম নাইম হাসান। তাঁর টিকটক একাউন্টে আপলোড করা একটি ভিডিওতে দেখা যায়, শিশু বয়সী কয়েকজন ছাত্রী বোরকা-নিকাব পরিহিত অবস্থায় মেঝেতে বসে কোরআন তেলাওয়াত করছে। ভিডিওর স্ক্রিনে বড় করে লেখা হয়েছে, "কনটা পছন্দ হয়?"—সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে ভালোবাসার ইমোজি। ভিডিওটি আপলোড হয় ২০২৫ সালের ২৪ জুন।

ছবি: দ্য ডিসেন্ট
দ্য ডিসেন্ট নাইমের ১০০টির বেশি ভিডিও পর্যালোচনা করে জানিয়েছে, অন্তত ২২টি ভিডিওতে অনুরূপ ইঙ্গিতপূর্ণ ক্যাপশন ব্যবহৃত হয়েছে—কোথাও শিক্ষার্থীদের নিয়ে বিয়ে-সংক্রান্ত রসিকতা, কোথাও তাদের চেহারা নিয়ে মন্তব্য। এসব ভিডিওর মন্তব্যঘরে শত শত ব্যবহারকারী প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন, যার একটি বড় অংশই ছিল যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ, এমনকি নির্দিষ্ট শিশুদের 'পছন্দ' করে নেওয়ার ধরনের মন্তব্যও পাওয়া গেছে।
অনুসন্ধানে শনাক্ত ও মুখোমুখি
ভিডিওগুলো বিশ্লেষণ করে দ্য ডিসেন্ট প্রথমে নাইমের সম্ভাব্য অবস্থান হিসেবে ফরিদপুর ও ঝালকাঠিকে চিহ্নিত করে, পরে ডিজিটাল অনুসন্ধানের মাধ্যমে তাঁর কর্মস্থল রাজাপুরের ওই মাদ্রাসা নিশ্চিত করে। মাদ্রাসার পরিচালক হাফেজ আল মামুন খান দ্য ডিসেন্টের কাছে নিশ্চিত করেন, নাইম তাঁর প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক এবং বর্তমানে সেখানেই কর্মরত।
ভিডিওগুলো দেখানোর পর মামুন খান বিষয়টিকে "মারাত্মক অপরাধমূলক কাজ" আখ্যা দিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। যে দুই ছাত্রকে নিয়ে নাইম আপত্তিকর ক্যাপশন দিয়েছিলেন, তারাও তাঁরই মাদ্রাসার শিক্ষার্থী বলে নিশ্চিত করেন পরিচালক। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে শনিবার মাদ্রাসা ব্যবস্থাপনা কমিটির একটি বৈঠক ডাকা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

ছবি: দ্য ডিসেন্ট
মুখোমুখি হওয়ার পর নাইম হাসান দ্য ডিসেন্টকে জানান, তিনি নিজের ভুল বুঝতে পেরেছেন এবং বিষয়টি সামাজিক মাধ্যমে আলোচিত হওয়ার পর থেকে একাউন্ট থেকে ১২৭টি ভিডিও মুছে ফেলেছেন। মেয়ে শিক্ষার্থীদের ভিডিওগুলো সম্পর্কে তিনি জানান, সেগুলো তাঁর বর্তমান মাদ্রাসায় নয়—যেখানে কেবল ছেলেরাই পড়ে—বরং প্রায় দুই বছর আগে রাজাপুরের অন্য একটি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতাকালীন ধারণ করা, যেখানে তাঁর স্ত্রীও কয়েকজন ছাত্রীকে পড়াতেন।
শিক্ষার্থীদের ভিডিও প্রকাশের আগে অভিভাবকদের অনুমতি নেওয়া হয়েছিল কি না জানতে চাইলে নাইম জানান, কোনো অভিভাবকের অনুমতি নেওয়া হয়নি; আনুমানিক ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী বিষয়টি জানত বলে তিনি জানান। এসব ভিডিও থেকে কোনো আর্থিক আয় করেননি বলেও দাবি করেন তিনি, এবং জানান, ভবিষ্যতে এ ধরনের ইঙ্গিতপূর্ণ কনটেন্ট আর প্রকাশ করবেন না।
একক ঘটনা নয়
দ্য ডিসেন্ট জানিয়েছে, শুধু নাইমের একাউন্ট নয়—কাওমি ও কোরআন শিক্ষা মাদ্রাসার অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীদের নিয়ে একই ধরনের কনটেন্ট প্রচারকারী কয়েক ডজন টিকটক আইডি তারা চিহ্নিত করেছে। এসব একাউন্টে আকর্ষণীয় বিবেচিত শিশুদের আদুরে অথচ ইঙ্গিতপূর্ণ নানা নামে ডাকার প্রবণতাও লক্ষ করা গেছে। কিছু একাউন্টের নামেই ব্যবহার করা হয়েছে "কিউট হুজুর"-ঘরানার শব্দ, যেখানে শিক্ষকেরা নিজেদের বা শিক্ষার্থীদের একই ধাঁচের ভাষায় উপস্থাপন করেন।
শিশু নির্যাতনের পৃথক ঘটনা
অনুসন্ধানে ভিন্ন প্রকৃতির আরও একটি উদ্বেগজনক ঘটনা উঠে এসেছে। লক্ষ্মীপুরের রায়পুরের হায়দরগঞ্জ দারুল কোরআন ইসলামিক একাডেমির এক শিক্ষার্থীকে নিয়ে একটি ভিডিওতে দেখা যায়—তেলাওয়াতরত এক শিশুকে শারীরিকভাবে উত্ত্যক্ত করে তার কান্নার দৃশ্য ধারণ করে তা বিনোদনমূলক ভঙ্গিতে প্রকাশ করা হয়েছে। ভিডিওটি সামাজিক মাধ্যমে আলোচনায় আসার পর সংশ্লিষ্ট একাউন্টটি মুছে ফেলা হয়।

ছবি: দ্য ডিসেন্ট
প্রতিষ্ঠানটির সভাপতি মো. মঞ্জুর আহমেদ দ্য ডিসেন্টকে জানান, বিষয়টি নিয়ে তাঁরা অবগত হয়েছেন এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে জড়িত ব্যক্তির বিস্তারিত পরিচয় বা নির্দিষ্ট ব্যবস্থা কী হবে, তা জানতে চাইলে ব্যস্ততার কথা বলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন তিনি। এ বিষয়ে রায়পুর থানার ওসির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সাড়া মেলেনি বলে জানিয়েছে দ্য ডিসেন্ট।
আইনি ও নীতিগত প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশের শিশু আইন, ২০১৩ অনুযায়ী ১৮ বছরের কম বয়সী সবাই শিশু হিসেবে বিবেচিত। আইনের ৮১ ধারায় শিশুর স্বার্থবিরোধী এমন তথ্য বা ছবি প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা আছে, যার মাধ্যমে শিশুকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শনাক্ত করা সম্ভব—যদিও এই ধারা মূলত বিচারাধীন বা অপরাধ-সংশ্লিষ্ট শিশুদের পরিচয় সুরক্ষার জন্য প্রযোজ্য, তারপরও এটি শিশু-সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশে দেশের আইনি দৃষ্টিভঙ্গি নির্দেশ করে বলে জানিয়েছে দ্য ডিসেন্ট।
২০০৯ সালে হাইকোর্ট কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে নির্দেশনা দেন, যা নতুন আইন না হওয়া পর্যন্ত কার্যকর থাকার কথা; ২০২৩ সালে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিরোধ কমিটি গঠনের নির্দেশও দেন আদালত। চলতি বছরের মে মাসে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন প্রতিটি মাদ্রাসায় পৃথক যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠনের দাবি জানায়।
টিকটকের নীতিমালাতেও শিশুদের যৌন উপস্থাপনামূলক কনটেন্ট নিষিদ্ধ। প্ল্যাটফর্মটি জানিয়েছে, এমন কনটেন্ট শনাক্ত হলে তারা তা সরিয়ে নেওয়া, একাউন্ট বন্ধ করা এবং প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার পদক্ষেপ নিতে পারে।
দ্য ডিসেন্টের পর্যবেক্ষণ
দ্য ডিসেন্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব ভিডিওতে সরাসরি যৌন কর্মকাণ্ড দেখা না গেলেও ইঙ্গিত তৈরি হয়েছে মূলত ক্যাপশন ও উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে। কোরআন পড়া, ক্লাসে বসে থাকা বা লজ্জা পাওয়া—এসব একটি শিশুর স্বাভাবিক শৈশব ও শিক্ষাজীবনেরই অংশ। কিন্তু সেই মুহূর্তগুলো গোপনে ধারণ করে যখন প্রাপ্তবয়স্কদের 'পছন্দ' বা আকর্ষণের ভাষায় প্রকাশ করা হয়, তখন নিজের ভাবমূর্তির ওপর ওই শিশুর নিয়ন্ত্রণ আর থাকে না। প্রতিবেদনের ভাষ্যে, তখন সে আর কেবল একজন শিক্ষার্থী থাকে না—অচেনা দর্শকের সামনে পরিণত হয় পছন্দ-অপছন্দের একটি বস্তুতে।
প্রতিবেদনটি অনুসন্ধানী গণমাধ্যম দ্য ডিসেন্ট-এর মূল অনুসন্ধান অবলম্বনে প্রস্তুত করা হয়েছে; মূল অনুসন্ধানে কন্ট্রিবিউট করেছেন দ্য ডিসেন্টের ফ্যাক্ট-চেক ইন্টার্ন রাব্বী মিয়া। পাঠক সতর্কতা ও শিশু সুরক্ষার স্বার্থে নির্দিষ্ট অ্যাকাউন্ট লিংক এবং প্রতিটি পৃথক আপত্তিকর মন্তব্য বা ক্যাপশন এখানে সংক্ষিপ্ত/সারাংশ আকারে উপস্থাপন করা হয়েছে।