স্টাফ রিপোর্টার | ক্রাইম ক্রনিকল
ইংল্যান্ডকে হারিয়ে বিশ্বকাপ ফাইনাল নিশ্চিত করার আনন্দের মধ্যেই নতুন এক বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছে আর্জেন্টিনা। সেমিফাইনাল শেষে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের ওপর নিজেদের দাবির সমর্থনে একটি ব্যানার প্রদর্শনের জেরে ফিফার শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মুখে পড়তে পারেন লিওনেল মেসিরা।
আটলান্টার সেই ম্যাচে শেষ দিকে নাটকীয়ভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে দুটি গোল করে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা থমাস টুখেলের ইংল্যান্ডকে হারায় ২-১ ব্যবধানে। এনজো ফার্নান্দেজ ও লাউতারো মার্তিনেজের শেষ মুহূর্তের গোলে নিশ্চিত হয় রোববারের ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে খেলার টিকিট। দুই দেশের মধ্যকার ঐতিহাসিক উত্তেজনার কারণে বাড়তি নিরাপত্তার মধ্যে অনুষ্ঠিত হয় এই সেমিফাইনাল।

বাঁশি বাজার শেষ মুহূর্তে আর্জেন্টিনার জয় আর ইংল্যান্ডের চরম হতাশা। ছবি: রয়টার্স
ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজতেই আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়েরা হাতে তুলে নেন স্প্যানিশ ভাষায় লেখা একটি ব্যানার, যার অর্থ দাঁড়ায়—"ফকল্যান্ডস আর্জেন্টিনার"। দক্ষিণ-পশ্চিম আটলান্টিকে অবস্থিত এই ব্রিটিশ-নিয়ন্ত্রিত দ্বীপপুঞ্জের সার্বভৌমত্ব নিয়ে ব্রিটেন-আর্জেন্টিনা বিরোধ এখনো অমীমাংসিত।
ফিফার বিধিতে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও দলীয় আচরণ সংক্রান্ত সুস্পষ্ট বিধিনিষেধ আছে, আর এমন ব্যানার প্রদর্শনের জন্য অতীতে শাস্তি পাওয়ার নজিরও রয়েছে আর্জেন্টিনার। ২০১৪ সালে স্লোভেনিয়ার বিপক্ষে এক প্রীতি ম্যাচের আগে একই বার্তাসংবলিত ব্যানার প্রদর্শনের জন্য আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনকে ২০ হাজার পাউন্ড জরিমানা করেছিল ফিফা, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সংক্রান্ত নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগে। বুধবারের ঘটনার পর একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে শঙ্কা তৈরি হয়েছে, যদিও এখন পর্যন্ত ফিফার তরফে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া মেলেনি।

আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডার জিওভানি লো চেলসো একটি ব্যানার ঠিক করছেন, যাতে লেখা আছে "মালভিনাস (ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ) আর্জেন্টিনার"। ছবি: এএফপি
আর্জেন্টিনার পূর্ব উপকূল থেকে প্রায় ৩০০ মাইল দূরে অবস্থিত এই দ্বীপপুঞ্জকে কেন্দ্র করে ১৯৮২ সালের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়েছিল দুই দেশ। ৭৪ দিনের সেই সংঘাতে প্রাণ হারান ৬৫৫ জন আর্জেন্টাইন সেনা, ২৫৫ জন ব্রিটিশ সেনা এবং দ্বীপপুঞ্জের তিনজন বাসিন্দা। যুদ্ধ শেষে ব্রিটেনের নিয়ন্ত্রণই বহাল থাকে, আর দ্বীপবাসীদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশও ব্রিটেনের সঙ্গে থাকার পক্ষে মত দিয়েছেন। অন্যদিকে আর্জেন্টিনার দীর্ঘদিনের দাবি, ১৮১৬ সালে স্পেন থেকে স্বাধীনতার পর এই দ্বীপ তাদেরই ভূখণ্ডের অংশ ছিল এবং ১৮৩৩ সালে অবৈধ ঔপনিবেশিক পদক্ষেপে ব্রিটেন তা দখলে নেয়।
জয়ের পর আর্জেন্টিনার ভাইস প্রেসিডেন্ট ভিক্টোরিয়া ভিসারুয়েল সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ একাধিক পোস্ট দেন। সেনাদের একটি ভিডিওসহ এক পোস্টে তিনি লেখেন, এই ম্যাচ নিছক আর দশটা ম্যাচের মতো ছিল না। আরেক পোস্টে ফকল্যান্ডসকে আর্জেন্টিনার অংশ দাবি করে তিনি মন্তব্য করেন, স্টেডিয়ামে এসব প্রতীক নিয়ে যাওয়া নিষেধ করা হলেও মানুষ তা রক্তে ও হৃদয়ে বহন করে, এই বাস্তবতা ভুলে যাওয়া হয়েছে। ম্যাচের আগেই তিনি এই সেমিফাইনালকে ব্রিটেনকে নিজেদের অবস্থান বুঝিয়ে দেওয়ার একটি লড়াই হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।
এই প্রবণতা এবারই প্রথম নয়–এর আগে শেষ ষোলোয় মিসরের বিপক্ষে নাটকীয় ৩-২ ব্যবধানের জয়ের পরও আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়েরা ফকল্যান্ডস প্রসঙ্গ এবং দলের কিংবদন্তি দিয়েগো ম্যারাডোনা ও লিওনেল মেসির নাম জুড়ে স্লোগান দিয়েছিলেন।
তবে সেমিফাইনালের আগে দলের কোচ লিওনেল স্কালোনি জানিয়েছিলেন, ফুটবল ও রাজনীতিকে মেলাতে চান না তিনি। ইতিহাসের এই দুঃখজনক অধ্যায়ের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বিষয় দুটিকে আলাদা রাখার পক্ষে মত দেন তিনি, জানান এ নিয়ে তাঁদের করণীয় সীমিত। বিশ্বের নানা প্রান্তে চলা সংঘাতের সমালোচনা করলেও এবং নিহতদের স্মরণ করার কথা বলেও, স্কালোনি জোর দিয়ে বলেন, "এটি একটি ফুটবল ম্যাচ, আমাদের এই দুটিকে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়।"
এই বিশ্বকাপে রাজনৈতিক প্রতীক প্রদর্শনের বিতর্ক নতুন নয়। গত মাসে লস অ্যাঞ্জেলেসে ইরানের ম্যাচের সময় ইরানি বংশোদ্ভূত মার্কিন দর্শকেরা তেহরান সরকারবিরোধী প্রতিবাদের প্রতীক বিপ্লব-পূর্ব ইরানি পতাকা উড়িয়েছিলেন, তবে সে সময় কোনো ঝামেলা হয়নি।
ফাইনালের আগমুহূর্তে এই বিতর্ক নিয়ে ফিফা কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেদিকেই এখন নজর সবার।