আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ক্রাইম ক্রনিকল 


গত ২৪ ঘণ্টায় মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে দুই সংবাদমাধ্যম দুই বিপরীত খবর দিয়েছে। একটির ভাষ্য ইস্পাতকঠিন, অন্যটির ভেতর বারুদের গন্ধ আর পর্দার আড়ালের দৌড়াদৌড়ির গল্প।


ইরান-ভিত্তিক তাসনিম নিউজ এজেন্সি আজ মঙ্গলবার সকালে জানায়, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সব ধরনের আলোচনা বাতিল করেছে এবং হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি বন্ধ করা হবে। তাদের ঘোষণা অনুযায়ী, লেবানন ও গাজা থেকে ইসরায়েলের পুরোপুরি সরে না যাওয়া পর্যন্ত কোনো কূটনৈতিক পথ খোলা থাকছে না। এই খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম লাফিয়ে বাড়ে ৫ শতাংশ। হোয়াইট হাউসে টেলিফোনের ঘণ্টা বেজে ওঠে, জরুরি বৈঠকে বসেন মার্কিন কর্মকর্তারা। আপাতদৃষ্টিতে পরিস্থিতি যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে ঠেকেছে বলে মনে হচ্ছিল।


কিন্তু আজ সোমবার রাতেই রয়টার্স কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র ফাঁস করে। তাদের প্রতিবেদন বলছে, তাসনিমের কঠোর অবস্থানের ঠিক বিপরীতে ইরান গোপনে আমেরিকার সঙ্গে একটি সীমিত আকারের চুক্তি করার জন্য মরিয়া হয়ে দরকষাকষি করছে। ইরানের মূল লক্ষ্য অর্থনৈতিক চাপ কমানো, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা এবং ২০২৪ সালের জানুয়ারির মতো ভয়াবহ গণবিক্ষোভের পুনরুত্থান ঠেকানো। তবে রয়টার্স আরও জানিয়েছে, এই চুক্তিতে পরমাণু কর্মসূচিতে কোনো ছাড় দিতে রাজি নয় ইরান। তারা কেবল নিষেধাজ্ঞার কিছু শিথিলতা চাচ্ছে। আর হরমুজ প্রণালীকে ইরান এখন ‘স্থায়ী কৌশলগত সম্পদ’ হিসেবে দেখছে, যার ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ চুক্তির পরও অটুট থাকবে।


তাহলে ইরান আসলে কোন পথে হাঁটছে? একই দিনের সকাল ও রাতের দুই প্রতিবেদন যেন দুই ভিন্ন দেশের কথা বলছে। রাজধানী তেহরানের নীতিনির্ধারণী মহলের ভেতর হয়ত দুটি পক্ষ সক্রিয় - একটি কঠোর অবস্থান নিয়ে জনমনে ভয় তৈরি করতে চায়, অপরটি অর্থনীতির বাস্তবতায় গোপনে চুক্তির দরবার করছে। আবারও হতে পারে, তাসনিমের কঠোর অবস্থানটি কেবল পাবলিক পজিশন; আর রয়টার্সের ফাঁস করা তথ্যই প্রকৃত চিত্রের কাছাকাছি। কারণ ইরান আজ যে চরম অর্থনৈতিক চাপে – মুদ্রাস্ফীতির দহনে জ্বলছে সাধারণ মানুষ, নিষেধাজ্ঞায় রুদ্ধশ্বাস দেশের অর্থনীতি – সেই বাস্তবে গোপন আলোচনা চালানো ছাড়া উপায় থাকে না। পাশাপাশি, ২০২৪ সালের জানুয়ারির গণবিক্ষোভের স্মৃতি ভুলতে পারেনি তেহরানের শীর্ষ নেতৃত্ব; সেই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি তাদের জন্য আতঙ্কের নাম। এই আতঙ্ক থেকেই তারা চুক্তির পথে হাঁটতে বাধ্য হচ্ছে – ঠিক যেমনটা রয়টার্স জানিয়েছে।


কিন্তু আবার হরমুজ বন্ধের হুমকি দেওয়ার মানে কী? এটি ইরানের পুরোনো ‘চাপ প্রয়োগের কৌশল’ ছাড়া আর কিছু নয়। তারা চাচ্ছে, এক হাতে চুক্তির প্রস্তাব নিয়ে বসবে, অন্য হাতে তেলের প্রবাহ বন্ধের হুমকি দিয়ে দর কষাকষির পাল্লা ভারী করবে। এই দ্বিমুখী কৌশল মধ্যপ্রাচ্যের পুরোনো খেলারই অংশ।


যতক্ষণ পর্যন্ত ইরানের সরকারি মুখপাত্র বা হোয়াইট হাউস আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না জানাচ্ছে, ততক্ষণ এই দ্বিধাবিভক্তি বজায় থাকবেই। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত: তাসনিম বলছে ‘যুদ্ধ’, রয়টার্স বলছে ‘চুক্তির গুঞ্জন’ – এই দুই বিপরীত স্রোতের মাঝেই দুলছে তেলের দাম, অনিশ্চিত আন্তর্জাতিক কূটনীতি আর শ্বাসরুদ্ধ এক অপেক্ষার প্রহর।