স্পোর্টস ডেস্ক | ক্রাইম ক্রনিকল


লিওনেল মেসি—ফুটবলের এমন এক নাম, যার প্রতিটি ম্যাচ যেন নতুন ইতিহাস লেখার অপেক্ষায় থাকে। বছরের পর বছর ধরে অসংখ্য ট্রফি, শত শত গোল, অগণিত অ্যাসিস্ট আর অজস্র ব্যক্তিগত অর্জনের পরও যেন থামার কোনো লক্ষণ নেই আর্জেন্টাইন এই মহাতারকার। তিনি মাঠে নামলেই সমর্থকদের একটাই প্রত্যাশা থাকে—আজ আবার কোন নতুন রেকর্ড গড়বেন? কেপ ভার্দের বিপক্ষেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।




বয়সটা ৩৯ পেরিয়েছে। ইউরোপ ছেড়েছেন আরো ৪ বছর আগে। তবু তিনি বিশ্বমঞ্চে গোল্ডেন বুটের জন্য লড়াই করছেন এই জেনারেশনের এম্বাপ্পে, হালান্ড, হ্যারি কেইন, ভিনি, ডেম্বেলেদের সাথে। শুধু লড়াই করছেন বললে ভুল হবে, এগিয়ে আছেন সবার চেয়ে! ৪ টি ম্যাচ খেলে ৩ টি তেই হয়েছেন ম্যাচের সেরা খেলোয়াড়। গোল করেছেন সব ম্যাচেই। অবিশ্বাস্য!  অনবদ্য!  অকল্পনীয়!  যত বিশেষণই দেয়া হোক না কেনো, তা যেন লিওর বেলায় কম হয়ে যায়!




এইতো কেপ ভার্দের সাথে ম্যাচের ২৯ মিনিটে লিসান্দ্রো মার্টিনেজের হাওয়ায় ভাসানো বলটা যে অসামান্য দক্ষতায় রিসিভ করলেন আর নিখুঁতভাবে জালে জড়ালেন, তার জন্য বিশেষণ আপনি কই খুঁজবেন!




বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের কঠিন লড়াইয়ে আর্জেন্টিনাকে নেতৃত্ব দিয়ে ৩-২ ব্যবধানে জয় এনে দেওয়ার পথে নিজের গোল, আক্রমণে ধারাবাহিক প্রভাব এবং শেষ দিকে কর্নার থেকে জয়সূচক গোলের সূচনা—সব মিলিয়ে আবারও ম্যাচের সবচেয়ে প্রভাবশালী ফুটবলারের ভূমিকায় ছিলেন মেসি। পুরো ম্যাচজুড়ে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের ব্যস্ত রেখেছেন, আক্রমণ সাজিয়েছেন, সুযোগ তৈরি করেছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে দলের জন্য পার্থক্য গড়ে দিয়েছেন। জিতে নিয়েছেন ম্যাচের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার। ভেঙেছেন একের পর এক রেকর্ড।


বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বেশিবার ম্যান অফ দ্য ম্যাচ নির্বাচিত হওয়া খেলোয়াড়ও লিওনেল মেসি (১৪ টি)। ধারেকাছেও নেই আর কোনো খেলোয়াড়।


কেপ ভার্দের বিপক্ষে গোল করে তিনি বিশ্বকাপে প্রথম ফুটবলার হিসেবে ২০ (রেকর্ডে) গোলের মাইলফলক স্পর্শ করেছেন। একই সঙ্গে বিশ্বকাপে ৩০ ম্যাচ খেলা প্রথম ফুটবলার হিসেবেও নিজের নাম লিখিয়েছেন ইতিহাসের পাতায়। শুধু তাই নয়, বিশ্বকাপের দুটি ভিন্ন আসরে সাত বা তার বেশি গোল করা প্রথম খেলোয়াড়ও এখন তিনিই। 




নকআউট পর্বে মেসির ধারাবাহিকতাও এখন সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে। কেপ ভার্দের বিপক্ষে গোল করার মাধ্যমে তিনি টানা পাঁচটি (রেকর্ড) নকআউট ম্যাচে গোল করার বিরল কীর্তি গড়েছেন। বিশ্বকাপের শেষ ছয়টি নকআউট ম্যাচে তিনি সরাসরি অবদান রেখেছেন ১০টি গোলে—নিজে করেছেন ছয়টি, করিয়েছেন আরও চারটি। নকআউটে তার মোট গোল-অ্যাসিস্টের সংখ্যা এখন ১২, যা বিশ্বকাপের রেকর্ড। 


বয়স যে শুধুই একটি সংখ্যা, সেটিও যেন প্রতিনিয়ত প্রমাণ করে চলেছেন ৩৯ বছর বয়সী এই সুপারস্টার। ৩৫ বছর পার হওয়ার পরই বিশ্বকাপে তার গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৪ (রেকর্ড)। ইতিহাসের ৩৫ বছরের বেশি বয়সী অধিকাংশ কিংবদন্তির সম্মিলিত গোলের সঙ্গে তুলনা করলেও মেসির এই পরিসংখ্যান বিস্ময় জাগায়। কেপ ভার্দের ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনিয়ার বিপক্ষে গোল করে তিনি আরেকটি অনন্য রেকর্ডও গড়েছেন—গোলদাতা ও গোলরক্ষকের সম্মিলিত বয়সের হিসেবে এটিই বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ। 




মেসির বিশ্বকাপ যাত্রা এখন শুধু গোলে সীমাবদ্ধ নয়। ২২টি ভিন্ন দেশের বিপক্ষে মাঠে নেমে তিনি ইতোমধ্যেই ১৪টি দলের জালে বল জড়িয়েছেন। আর চলতি বিশ্বকাপে আর মাত্র একটি গোল করলেই ১৯৩০ সালে গুইলারমো স্তাবিলের এক আসরে আর্জেন্টিনার সর্বোচ্চ আট গোলের রেকর্ড স্পর্শ করবেন তিনি। 


ফুটবলপ্রেমীদের কাছে মেসির প্রতিটি ম্যাচ এখন শুধুই একটি ম্যাচ নয়, বরং ইতিহাসের নতুন অধ্যায়। একসময় যে রেকর্ডগুলোকে অসম্ভব মনে করা হতো, সেগুলোই এখন যেন তার নিয়মিত অর্জনে পরিণত হয়েছে। বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় মঞ্চেও তিনি বারবার প্রমাণ করে চলেছেন কেন তাকে ফুটবলের সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় বলা হয়।


কেপ ভার্দের বিপক্ষে ম্যাচটিও সেই ধারাবাহিকতার আরেকটি উজ্জ্বল উদাহরণ। আর্জেন্টিনা পরের পর্বে উঠে গেছে, আর মেসি আবারও দেখিয়ে দিয়েছেন—সময় যতই এগিয়ে যাক, বড় মঞ্চে আলো ছড়ানোর ক্ষমতা এখনও তার হাতছাড়া হয়নি। বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচের সঙ্গে যেন আরও সমৃদ্ধ হচ্ছে তার কিংবদন্তির গল্প, আর নতুন করে লেখা হচ্ছে ফুটবল ইতিহাস।