স্পোর্টস ডেস্ক | ক্রাইম ক্রনিকল


ফুটবলে ফলাফলই শেষ কথা নয়—কখনো কখনো একটি পরাজয়ও হয়ে ওঠে অনুপ্রেরণার গল্প। ২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর লড়াইয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার কাছে হারলেও নিজেদের অসাধারণ পারফরম্যান্সে বিশ্বজুড়ে প্রশংসা কুড়িয়েছে বিশ্বকাপে প্রথমবার অংশ নেওয়া কেপ ভার্দে।


মাত্র ৫ লাখ ২৯ হাজার জনসংখ্যার ছোট্ট এক দেশ অথচ ম্যাচের শুরু থেকেই আর্জেন্টিনার চোখে চোখ রেখে লড়াই করেছে আফ্রিকার দ্বীপরাষ্ট্রটি। বিশ্ব র‍্যাঙ্কিংয়ে আর্জেন্টিনার চেয়ে ৬৩ ধাপ পিছিয়ে থাকা দলটি ১২০ মিনিটজুড়ে এমন ফুটবল উপহার দিয়েছে, যা অনেকের কাছেই সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম স্মরণীয় বিশ্বকাপ ম্যাচ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।


বিশ্বকাপে অভিষেক হওয়া সত্ত্বেও কেপ ভার্দের খেলায় অনভিজ্ঞতার কোনো ছাপ ছিল না। বরং সংগঠিত রক্ষণ, দ্রুত পাল্টা আক্রমণ এবং আত্মবিশ্বাসী ফুটবল দিয়ে একাধিকবার চাপে ফেলে দেয় লিওনেল মেসিদের। ম্যাচের বিভিন্ন মুহূর্তে মনে হয়েছে, বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাই যেন বিপদে পড়েছে।


এই লড়াইয়ের সবচেয়ে উজ্জ্বল নাম গোলরক্ষক ভোজিনিয়া। অভিজ্ঞ এই গোলকিপার পুরো ম্যাচে ৮টি গুরুত্বপূর্ণ সেভ করে আর্জেন্টিনার একের পর এক নিশ্চিত গোল রুখে দেন। বিশেষ করে লিওনেল মেসির একাধিক শট ও ফ্রি-কিক ঠেকিয়ে তিনি ম্যাচের অন্যতম নায়ক হয়ে ওঠেন। মেসি একটি গোল করলেও বাকি সময়জুড়ে ভোজিনিয়ার দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে বারবার হতাশ হতে হয়েছে তাঁকে।




ম্যাচের ষষ্ঠ মিনিটে আর্জেন্টিনা গোলমুখ লক্ষ্য করে একটি শট নিলেও পরের আধা ঘণ্টায় কোনো শটই নিতে পারেনি কেপ ভার্দে। বরং এর মাঝেই ২৯তম মিনিটে আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে দেন লিওনেল মেসি। লিসান্দ্রো মার্তিনেসের লম্বা পাস অসামান্য দক্ষতায় নিয়ন্ত্রণে নিয়ে দ্বিতীয় স্পর্শেই অসাধারণ এক গোল করেন তিনি।




চলতি বিশ্বকাপে এটি মেসির সপ্তম গোল, আর বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের ২০তম। টানা অষ্টম বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল করার বিরল কীর্তিও গড়েন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।




মূলত এরপরই শুরু হয় কেপ ভার্দের প্রতিরোধ–পর্ব।

প্রথমার্ধের বিরতির আগে এনজো ফার্নান্দেজ ব্যবধান বাড়ানোর সুযোগ পেলেও ভোজিনিয়া দারুণ এক সেভে কেপ ভার্দেকে ম্যাচে রাখেন।




বিরতির পর আক্রমণে সাহসী হয়ে ওঠে কেপ ভার্দে। দেরয় দুয়ার্তের জোরালো শট এমিলিয়ানো মার্তিনেজ না ঠেকালে ৫৪ মিনিটেই দলটি গোল পেয়ে যেতে পারত। তবে পাঁচ মিনিট পর আর রক্ষা হয়নি। রায়ান মেন্দেসের কাটব্যাক থেকে দুরূহ কোণ থেকে নেওয়া শটে আর্জেন্টিনার জালে বল জড়ান দুয়ার্তে।




গোল হজম করার পর যেন অস্থিরই হয়ে পড়ে আর্জেন্টিনা। স্কালোনি একে একে মাঠে নামান হুলিয়ান আলভারেজ, নিকোলাস গনসালেস, লিয়ান্দ্রো পারেদেসদের। মেসিও একের পর এক সুযোগ তৈরি করেন। ৬২ মিনিটে ভোজিনিয়া তাঁর সামনে দেয়াল হয়ে দাঁড়ান। ৭২ মিনিটে মেসির দুর্দান্ত ফ্রি-কিকও প্রতিহত করেন কর্নারের বিনিময়ে। শেষ দিকে মেসির আরেকটি ফ্রি-কিক এবং পারেদেসের দূরপাল্লার শটও ঠেকিয়ে দেন ৪০ বছর বয়সী এই গোলকিপার। ৯০ মিনিটের খেলা ১–১ সমতায় থাকায় ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে।


অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয় মিনিটেই আবার এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। কর্নার থেকে আলেক্সিস ম্যাক আলিস্টারের ফ্লিকে বল পেয়ে বাঁ পায়ের দুর্দান্ত শটে জাল খুঁজে নেন লিসান্দ্রো মার্তিনেস।




কিন্তু কেপ ভার্দে যে হার মানার দল নয়! ১০৩ মিনিটে বাঁ দিক থেকে ভেতরে ঢুকে ডান পায়ের দুর্দান্ত বাঁকানো শটে বল জড়ান সিডনি কাবরাল। এমি মার্তিনেজের কিছুই করার ছিল না। টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা গোলের দাবিদার এই গোল আবারও স্তব্ধ করে দেয় আর্জেন্টিনাকে।




ম্যাচ তখন টাইব্রেকারের দিকেই এগোচ্ছিল। তবে ১১১ মিনিটে আসে কেপ ভার্দের ‘নিষ্ঠুর মুহূর্ত’। মেসির কর্নার থেকে রোমেরোর হেড বোর্হেসের হাতে লেগে খানিকটা দিক পাল্টে জড়িয়ে যায় জালে। আত্মঘাতী এই গোলেই ভেঙে যায় কেপ ভার্দের স্বপ্ন।




তবু শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই ছাড়েনি আফ্রিকার দলটি। ১১৬ মিনিটে কাবরালের দুর্দান্ত ফ্রি-কিক এমি মার্তিনেজ আঙুলের ডগায় ছুঁয়ে কর্নারের বিনিময়ে ঠেকান। ১১৯ মিনিটে গিলসন বেঞ্চিমোলের সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ে আরেকটি নিশ্চিত গোল বাঁচান আর্জেন্টাইন গোলকিপার। যোগ করা সময়ে পাল্টা আক্রমণে আলভারেজের জন্য সুযোগও তৈরি হয়েছিল, কিন্তু সেটি কাজে লাগাতে পারেননি তিনি।

শেষ পর্যন্ত ৩–২ ব্যবধানের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে আর্জেন্টিনা। তবে স্কোরলাইন যতই তাদের পক্ষে থাকুক, এই ম্যাচ মনে রাখা হবে কেপ ভার্দের জন্যই।


পুরো ম্যাচে কেপ ভার্দের ফুটবলাররা অসাধারণ শৃঙ্খলা, সাহস ও দলগত সমন্বয়ের পরিচয় দিয়েছেন। রক্ষণ থেকে আক্রমণ—প্রতিটি বিভাগেই তারা নিজেদের সর্বোচ্চটা উজাড় করে দিয়েছেন। ফলে জয় না পেলেও সম্মান, ভালোবাসা এবং বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের শ্রদ্ধা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে দলটি।


শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনা জয় নিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠলেও, কেপ ভার্দে রেখে গেল এক অবিস্মরণীয় গল্প। বিশ্বকাপে প্রথম অংশগ্রহণেই তারা প্রমাণ করেছে, ফুটবলে নাম বা ইতিহাস নয়—সাহস, আত্মবিশ্বাস এবং লড়াইয়ের মানসিকতাই সবচেয়ে বড় শক্তি।


পরাজয়ের মধ্য দিয়েই বিশ্বমঞ্চ থেকে বিদায় নিল কেপ ভার্দে। তবে তাদের রোমাঞ্চকর এই যাত্রা এবং বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে কাঁপিয়ে দেওয়ার গল্প দীর্ঘদিন স্মরণে রাখবেন ফুটবলপ্রেমীরা।