আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ক্রাইম ক্রনিকল
একসময় জাপানের ঘন বনাঞ্চল ও দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সীমাবদ্ধ ছিল ভালুকের বিচরণ। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিস্থিতি দ্রুত বদলেছে। এখন শুধু গ্রাম বা পাহাড় নয়, দেশের বিভিন্ন শহর ও আবাসিক এলাকাতেও নিয়মিত দেখা মিলছে এশীয় কালো ভালুকের। ফলে জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে এবং নতুন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছে জাপান।
চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত ভালুকের হামলায় চারজনের মৃত্যু হয়েছে। সর্বশেষ গত সপ্তাহে উত্তর-পূর্ব জাপানের আকিতা অঞ্চলে ৭৩ বছর বয়সী এক নারী ভালুকের আক্রমণে প্রাণ হারান। শীতনিদ্রা শেষে এপ্রিল থেকে সক্রিয় হয়ে ওঠা এসব প্রাণীর উপস্থিতি এখন দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সম্প্রতি টোকিওর কাছের উৎসোনোমিয়া শহরে একাধিকবার ভালুকের দেখা মেলে। শহরের কেন্দ্রস্থল, আবাসিক এলাকা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে প্রাণীটির বিচরণ ধরা পড়ে সিসিটিভি ক্যামেরায়। নগর কর্তৃপক্ষের মতে, শহরের কেন্দ্রভাগে এ ধরনের ঘটনা ছিল নজিরবিহীন।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে নিরাপত্তার স্বার্থে শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দুদিনের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়। পুলিশ, স্থানীয় শিকারি ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা দিনরাত অভিযান চালিয়ে প্রাণীটির অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা করেন। অবশেষে একটি আবাসিক এলাকার ঝোপে লুকিয়ে থাকা ভালুকটিকে চেতনানাশক প্রয়োগের মাধ্যমে আটক করা সম্ভব হয়। এতে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে।
তবে উৎসোনোমিয়ার ঘটনাই একমাত্র নয়। এর আগে ফুকুশিমা শহরে একটি ভালুক চারজনকে আহত করে এবং একটি ইলেকট্রনিকস কারখানায় ঢুকে পড়ে। সেখানে প্রাণীটির আচরণ দেখে বিস্মিত হন কর্তৃপক্ষ। ফাঁদে রাখা মধু ও ফল খেয়ে ফেললেও ফাঁদে ধরা দেয়নি সে। এমনকি পানির কল খুলে পানি পান করা এবং পরে নিজেই জানালা খুলে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাও নজরে আসে। স্থানীয় মেয়র একে ‘অত্যন্ত বুদ্ধিমান’ বলে মন্তব্য করেন।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ অর্থবছরে জাপানে ৫০ হাজারেরও বেশি বার ভালুক দেখা যাওয়ার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যা আগের সময়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। একই সময়ে ভালুকের হামলায় ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বনাঞ্চলে খাদ্যের সংকট, মানুষের বসতি বিস্তার এবং গ্রামীণ জনসংখ্যা হ্রাস পাওয়ায় ভালুকগুলো ক্রমশ মানুষের আবাসিক এলাকায় চলে আসছে।
বৈশ্বিকভাবে এশীয় কালো ভালুককে ঝুঁকিপূর্ণ প্রজাতি হিসেবে বিবেচনা করা হলেও জাপানে তাদের সংখ্যা গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার স্থানীয় প্রশাসনকে জরুরি প্রয়োজনে আবাসিক এলাকাতেও ভালুক শিকারের অনুমতি দিয়েছে।
জাপানের অভিজ্ঞতা শুধু একটি দেশের বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনার সংকট নয়; এটি মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সহাবস্থানের ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জেরও প্রতিচ্ছবি। জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত ভারসাম্যের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের সংঘাত আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।