আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ক্রাইম ক্রনিকল
প্লেজারিজমের অভিযোগ ঘিরে বিতর্কের মধ্যে পদত্যাগ করা কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক জেসন আরডেকে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। তাঁর বয়স হয়েছিল ৪১ বছর।
শুক্রবার (১৪ আগস্ট) দক্ষিণ লন্ডনের ব্যাটারসি এলাকার একটি বাসা থেকে তাঁকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
লন্ডনের মেট্রোপলিটন পুলিশ জানিয়েছে, স্থানীয় সময় বিকেল ৩টা ১২ মিনিটে এক ব্যক্তিকে অচেতন অবস্থায় পাওয়ার খবর পেয়ে তারা ঘটনাস্থলে যায়। সেখানেই তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয় এবং পরিবারকে অবহিত করা হয়।
পুলিশের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মৃত্যুটিকে আপাতত অপ্রত্যাশিত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, তবে এতে সন্দেহজনক কিছু আছে বলে মনে করা হচ্ছে না।
পরিবারের বিবৃতি
মৃত্যুর পর দেওয়া এক বিবৃতিতে আরডের পরিবার তাঁর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে চলা হয়রানির অভিযোগ তুলেছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, কেমব্রিজে অধ্যাপকের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে তাঁকে লক্ষ্য করে ধারাবাহিক আক্রমণ চালানো হয়েছে।
পরিবারের ভাষ্য, ভুল তথ্যের এই প্রচারণা তাঁর জন্য অসহনীয় হয়ে উঠেছিল। তাঁকে একজন কোমল স্বভাবের মানুষ হিসেবে বর্ণনা করে বিবৃতিতে বলা হয়, তিনি সবার মধ্যে ভালো দিকটিই দেখতে চাইতেন।
যেভাবে বিতর্কের শুরু
গত ৫ আগস্ট কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এবং জেসাস কলেজের ফেলো পদ থেকে পদত্যাগ করেন আরডে।
তাঁর ডক্টরাল অভিসন্দর্ভে প্লেজারিজমের অভিযোগ এবং একাডেমিক যোগ্যতা ও ব্যক্তিগত জীবনের বিবরণ নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর বিশ্ববিদ্যালয় তদন্ত শুরুর ঘোষণা দিয়েছিল।
গত মাসে তাঁর যোগ্যতা নিয়ে প্রকাশ্যে প্রশ্ন তোলেন কেমব্রিজের সাবেক এক দর্শন গবেষক। এরপর একাধিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বিষয়টি আলোচনায় আসে।
পদত্যাগপত্রে আরডে জানিয়েছিলেন, ধারাবাহিক অভিযোগ, জল্পনা ও প্রকাশ্য মন্তব্য তাঁর ও তাঁর প্রিয়জনদের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে।
তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেছিলেন, এই পদত্যাগকে যেন তাঁর বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া বয়ানগুলো মেনে নেওয়া হিসেবে ধরে নেওয়া না হয়।
চলতি সপ্তাহেই প্রকাশিত হয়েছে তাঁর আত্মজীবনীমূলক বই, যেটি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল।
যে পথ পেরিয়ে এসেছিলেন
২০২৩ সালে ৩৭ বছর বয়সে কেমব্রিজে যোগ দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যাপক হন আরডে।

২০২৩ সালে সবচেয়ে কম বয়সী অধ্যাপক হওয়ার পর বিবিসির অনুষ্ঠানে গেস্ট এডিটর হিসেবে এসেছিলেন জেসন আরডে
তাঁর জীবনকাহিনি ব্রিটেনে ব্যাপক আলোচিত হয়েছিল। তিনি জানিয়েছিলেন, শৈশবে অটিজম ও ডিসলেক্সিয়া শনাক্ত হয় এবং এগারো বছর বয়স পর্যন্ত তিনি কথা বলতে পারতেন না।
পরবর্তী জীবনে বর্ণবৈষম্য, অসাম্য ও শিক্ষা নিয়ে গবেষণায় পরিচিতি পান তিনি। কেমব্রিজের আগে গ্লাসগো ও ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন।
২০১০ সালে দাতব্য সংস্থার জন্য অর্থ সংগ্রহে ৩৫ দিনে ৩০টি ম্যারাথন দৌড়েছিলেন তিনি। এই কাজের স্বীকৃতিতে ২০১২ সালের লন্ডন অলিম্পিকে মশালবাহক হিসেবে নির্বাচিত হন।
প্রতিক্রিয়া
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডেবোরাহ প্রেন্টিস এক বিবৃতিতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। আরডের পরিবার ও বন্ধুদের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন তিনি।
যুক্তরাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী লুসি পাওয়েলও শোক জানিয়েছেন। তিনি এই কঠিন সময়ে পরিবারের ব্যক্তিগত পরিসরকে সম্মান জানানোর আহ্বান জানান। তাঁর মন্তব্য, এসব ঘটনার সঙ্গে বাস্তব মানুষ ও তাঁদের প্রিয়জনরা জড়িত — এটি মনে রাখা প্রয়োজন।
তথ্যসূত্র: মেট্রোপলিটন পুলিশ, কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়, আরডে পরিবারের বিবৃতি, বিবিসি, এপি।
মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সংকটে থাকলে বা কঠিন সময় পার করলে একজন চিকিৎসক, মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ কিংবা বিশ্বস্ত কারও সঙ্গে কথা বলা জরুরি।