নিজস্ব প্রতিবেদক | ক্রাইম ক্রনিকল
কয়েক দিনের টানা বর্ষণ ও জোয়ারের পানিতে বরিশালসহ দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তীর্ণ জনপদে কৃষি ও মৎস্য খাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ডুবে গেছে শত শত একর ফসলি জমি, প্লাবিত হয়েছে হাজারো মাছের ঘের ও পুকুর। এতে কৃষি ও মৎস্য বিভাগের প্রাথমিক হিসাবে এখন পর্যন্ত দুই খাতে মোট ক্ষতির পরিমাণ ৩৮ কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে কৃষি খাতে প্রায় ১৮ কোটি এবং মৎস্য খাতে ২০ কোটি টাকারও বেশি ক্ষতি হয়েছে। একই সঙ্গে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় নদী ও সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন পাঁচ জেলে, আহত হয়েছেন আরও ২৫ জন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বরিশাল খামারবাড়ির হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, গত ৯ জুলাই থেকে শুরু হওয়া টানা বৃষ্টিপাত ও নদ-নদীর পানি বৃদ্ধির কারণে বরিশাল বিভাগের পাঁচ জেলায় অন্তত ৪১ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এখন পর্যন্ত প্রায় ২৯ হাজার ৯১৯ মেট্রিক টন ফসল নষ্ট হয়েছে, যার আনুমানিক বাজারমূল্য ১৭ কোটি ৮৮ লাখ টাকার বেশি।
কৃষি বিভাগের তথ্যে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি ফসলের ক্ষতি হয়েছে বরগুনা জেলায়। সেখানে প্রায় ৬ হাজার ৭০৯ হেক্টর জমির ফসল পানির নিচে তলিয়ে গেছে। অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি পিরোজপুরে। ছোট ছোট খামার বেশি থাকায় এ জেলায় প্রায় ২৫ হাজার ৮০০ কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
নদীতীরবর্তী ও নিম্নাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় পাকা ধান, শাকসবজি, রোপা আমনের বীজতলা এবং বিভিন্ন উদ্যান ফসল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক স্থানে নিচু জমিতে দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকায় সদ্য রোপণ করা ধানের চারা পচে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পানির নিচে তলিয়ে গেছে সবজিক্ষেত, যার প্রভাব ইতোমধ্যে স্থানীয় বাজারেও পড়তে শুরু করেছে।
বরিশাল সদর উপজেলার চাঁদপুরা ইউনিয়নের কৃষক রিয়াজ বলেন, “ধান কাটার সময়ের আগেই ক্ষেত ডুবে গেছে। বাধ্য হয়ে আধাপাকা ধান কাটতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন যেমন কমবে, তেমনি চালের মানও খারাপ হবে।”
পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার সোনাতলা গ্রামের মাছচাষি আব্দুর রহিম বলেন, “মাছচাষিদের বছরের স্বপ্ন কয়েক দিনের বৃষ্টির পানিতে ভেসে গেছে।”
কৃষির পাশাপাশি বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে মৎস্য খাতও। বরিশাল আঞ্চলিক মৎস্য দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বিভাগের ছয় জেলায় এখন পর্যন্ত মৎস্য খাতে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২০ কোটি ৩০ লাখ ২৪ হাজার টাকা। ১৪৪টি ইউনিয়নের ৬ হাজার ৪৬৯টি পুকুর, ঘের ও মাছের খামার প্লাবিত হয়েছে। এতে প্রায় ৪৫৫ হেক্টর জলাশয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ভেসে গেছে ৭৪৭ মেট্রিক টন মাছ, ৯৩ লাখ মাছের পোনা ও ৪৫ মেট্রিক টন চিংড়ি।
মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, অতিরিক্ত বৃষ্টি ও জোয়ারের পানিতে রুই, কাতলা, মৃগেল, কই, মাগুরসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ঘের ও পুকুর থেকে বেরিয়ে গেছে। অনেক চাষি নেট দিয়ে মাছ রক্ষার চেষ্টা করলেও পানির প্রবল স্রোতের কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা সম্ভব হয়নি।
এদিকে বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে নদী ও সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়ে পটুয়াখালী জেলার পাঁচজন জেলে প্রাণ হারিয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও ২৫ জন। তাদের সবাই দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যেও জীবিকার তাগিদে মাছ ধরতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন।
বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই এমন ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতিতে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন দক্ষিণাঞ্চলের কৃষক, মৎস্যচাষি ও উদ্যোক্তারা। উৎপাদনের আশা ছেড়ে এখন অনেকেই ঋণ পরিশোধ এবং নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর চিন্তায় উদ্বিগ্ন।
বরিশাল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক রফিকুল ইসলাম বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে। সরকারের পক্ষ থেকে প্রণোদনা দেওয়ার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। অন্যদিকে মৎস্য খাতে ক্ষতিগ্রস্ত চাষি ও উদ্যোক্তাদের প্রাথমিক তালিকা ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় বরাদ্দ পাওয়া গেলে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।