আন্তর্জাতিক ডেস্ক ।  ক্রাইম ক্রনিকল 


বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে চীনের তৈরি ২০টি জে-১০সিই (J-10CE) মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান কেনার উদ্যোগ দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক সমীকরণে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রায় ২ দশমিক ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের এই প্রতিরক্ষা চুক্তিকে ভারত কেবল একটি সামরিক ক্রয় হিসেবে নয়, বরং অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের অংশ হিসেবেও দেখছে বলে আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মত।


প্রতিরক্ষা বিষয়ক সাময়িকী ডিফেন্স সিকিউরিটি এশিয়া–এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর দীর্ঘমেয়াদি আধুনিকায়ন পরিকল্পনা ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’-এর আওতায় এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পুরোনো এফ-৭ এবং সীমিত সংখ্যক মিগ-২৯ যুদ্ধবিমানের পরিবর্তে আধুনিক যুদ্ধক্ষমতা সম্পন্ন প্ল্যাটফর্ম যুক্ত করাই এর মূল লক্ষ্য।


সূত্রগুলো বলছে, চুক্তির আওতায় শুধু যুদ্ধবিমান নয়, পাইলট ও গ্রাউন্ড ক্রু প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা, লজিস্টিক সহায়তা এবং আধুনিক অস্ত্র ব্যবস্থাও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। আগামী ১০ বছরের কিস্তিতে অর্থ পরিশোধের সুযোগ থাকায় জাতীয় অর্থনীতির ওপর তাৎক্ষণিক চাপ তুলনামূলকভাবে কম থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।


কেন উদ্বিগ্ন ভারত?


বাংলাদেশের সম্ভাব্য এই যুদ্ধবিমান সংগ্রহ ভারতের প্রতিরক্ষা মহলে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের বিমানঘাঁটিতে জে-১০সিই মোতায়েন করা হলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সংযুক্ত করা শিলিগুড়ি করিডোর বা ‘চিকেনস নেক’-এর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন হিসাব-নিকাশ তৈরি হতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।


ভারতের সামরিক পরিকল্পনাবিদদের মতে, আধুনিক রাডার ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র বহনে সক্ষম এই যুদ্ধবিমান আঞ্চলিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যোগ করবে। ফলে পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তে ভারতের নজরদারি ও প্রতিরক্ষা কৌশল পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজন দেখা দিতে পারে।


জে-১০সিই কেন আলোচনায়?


জে-১০সিইকে চীনের অন্যতম আধুনিক ৪.৫ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এতে রয়েছে অ্যাক্টিভ ইলেকট্রনিক্যালি স্ক্যানড অ্যারে (AESA) রাডার, উন্নত ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার ব্যবস্থা এবং দূরপাল্লার পিএল-১৫ এয়ার-টু-এয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের সক্ষমতা।


বিশ্লেষকদের মতে, একাধিক লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত ও আঘাত করার সক্ষমতা এবং নেটওয়ার্ক-কেন্দ্রিক যুদ্ধ পরিচালনার সুবিধা এই বিমানকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী যুদ্ধবিমান প্ল্যাটফর্মে পরিণত করেছে।


ঢাকা-বেইজিং সম্পর্কের নতুন মাত্রা


বর্তমানে বাংলাদেশের সামরিক সরঞ্জামের বড় অংশই চীনা উৎস থেকে আসে। সাবমেরিন, যুদ্ধজাহাজ, সাঁজোয়া যান ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার পর এবার উন্নত যুদ্ধবিমান যুক্ত হলে দুই দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও গভীর হবে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।


তবে বাংলাদেশের অবস্থান হলো, এটি দেশের নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির অংশ এবং কোনো দেশের বিরুদ্ধে সামরিক জোট গঠনের উদ্দেশ্যে নেওয়া সিদ্ধান্ত নয়। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, আকাশসীমা সুরক্ষা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রের চাহিদা পূরণে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই নতুন প্রজন্মের যুদ্ধবিমান সংগ্রহের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করে আসছে।


দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নতুন সমীকরণ


বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ ও ভারতের অর্থনৈতিক ও সীমান্ত সহযোগিতা অব্যাহত থাকলেও এই চুক্তি দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা রাজনীতিতে নতুন প্রতিযোগিতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। জে-১০সিই সংগ্রহের মাধ্যমে বাংলাদেশ যেমন বিমান বাহিনীর সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াবে, তেমনি বঙ্গোপসাগর ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে চীনের উপস্থিতিও আরও দৃশ্যমান হবে।


ফলে দক্ষিণ এশিয়ার আকাশে নতুন শক্তির ভারসাম্য গড়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, যেখানে প্রতিটি দেশের প্রতিরক্ষা সিদ্ধান্ত আঞ্চলিক নিরাপত্তা সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে।