নিজস্ব প্রতিবেদক | ক্রাইম ক্রনিকল


ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের জন্য নতুন আচরণবিধি চূড়ান্ত করার পথে এগোচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। খসড়া আচরণবিধিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তুলনায় বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো, সংসদ নির্বাচনের আচরণবিধিতে অতিগুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি (ভিভিআইপি) হিসেবে অন্তর্ভুক্ত থাকা উপদেষ্টাদের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের খসড়ায় রাখা হয়নি। একই সঙ্গে নির্বাচনি প্রচারণায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার, পোস্টার ব্যবহার, শোডাউন, মিছিল, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে প্রচারণা এবং সরকারি সুযোগ-সুবিধার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড, ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ডের পাশাপাশি প্রার্থিতা বাতিলের সুযোগও রাখা হয়েছে।


নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, গত মঙ্গলবার কমিশন সভায় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের আচরণবিধির খসড়া উপস্থাপনের কথা থাকলেও সময়ের অভাবে তা উপস্থাপন করা সম্ভব হয়নি। পরে নথি আকারে এটি অনুমোদনের পরিকল্পনা রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ জানিয়েছেন, বিদ্যমান আইনের আলোকে আচরণবিধিমালা সংশোধন করা হবে।


খসড়া আচরণবিধিতে অতিগুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় সংসদের স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী, চিফ হুইপ, হুইপ, বিরোধীদলীয় নেতা, বিরোধীদলীয় উপনেতা, সংসদ উপনেতা, সংসদ সদস্য এবং সিটি করপোরেশনের মেয়র বা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের রাখা হয়েছে। তবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আচরণবিধিতে থাকা উপদেষ্টাদের এই তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। বিধিমালায় আরও বলা হয়েছে, অতিগুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এবং সরকারি বা সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নির্বাচন-পূর্ব সময়ে নির্বাচনি প্রচারণা বা নির্বাচনি কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবেন না। সরকারি কর্মসূচির সঙ্গে নির্বাচনি কর্মসূচি যুক্ত করা যাবে না এবং সরকারি যানবাহন, সরকারি প্রচারযন্ত্র বা অন্য কোনো সরকারি সুবিধাও নির্বাচনি কাজে ব্যবহার করা যাবে না।


খসড়ায় ডিজিটাল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্বাচনি প্রচারণার জন্য নতুন বিধান যুক্ত করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, কোনো প্রার্থী বা তার নির্বাচনি এজেন্ট প্রচারণা শুরুর আগে ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট, ই-মেইল ও অন্যান্য শনাক্তকারী তথ্য রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে জমা না দিয়ে প্রচারণা চালাতে পারবেন না। একই সঙ্গে নির্বাচনি প্রচারণায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে ভুয়া, বিভ্রান্তিকর, বিদ্বেষমূলক, অশ্লীল, কুরুচিপূর্ণ বা মানহানিকর কনটেন্ট তৈরি ও প্রচার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ঘৃণাত্মক বক্তব্য, ধর্মীয় বা জাতিগত বিদ্বেষ ছড়ানো, কারও চেহারা বিকৃত করা, চরিত্রহনন কিংবা ভোটারদের বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে তথ্য বিকৃত করাও নিষিদ্ধ থাকবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণার জন্য ব্যয় করা অর্থ প্রার্থীর নির্বাচনি ব্যয়ের হিসাবের অন্তর্ভুক্ত হবে।


নতুন আচরণবিধি অনুযায়ী, প্রতীক বরাদ্দের আগে কোনো ধরনের নির্বাচনি প্রচারণা চালানো যাবে না। নির্বাচন-পূর্ব সময়ে কোনো প্রার্থী বা তার পক্ষে কোনো ব্যক্তি, রাজনৈতিক দল, সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নে কোনো প্রতিষ্ঠানকে প্রকাশ্যে বা গোপনে চাঁদা বা অনুদান দিতে কিংবা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিতে পারবে না।


নির্বাচনি প্রচারণায় পরিবেশবান্ধব উপকরণ ব্যবহারে গুরুত্ব দিয়ে পোস্টার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পলিথিন, প্লাস্টিক, রেক্সিন বা অন্য কোনো অপচনশীল উপাদানে তৈরি ব্যানার, ফেস্টুন বা লিফলেট ব্যবহার করা যাবে না। প্রচারণার ব্যানার, লিফলেট ও ফেস্টুন সাদা-কালো হতে হবে এবং তাতে প্রার্থীর প্রতীক ও নিজের ছবি ছাড়া অন্য কারও ছবি বা প্রতীক ব্যবহার করা যাবে না। সরকারি স্থাপনা, দেয়াল, গাছ, বিদ্যুতের খুঁটি, টেলিফোনের খুঁটি কিংবা বাস, ট্রাক, রিকশা বা অন্য কোনো যানবাহনে প্রচারসামগ্রী লাগানোও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।


মনোনয়নপত্র সংগ্রহ বা জমা দেওয়ার সময় কোনো ধরনের শোডাউন বা মিছিল করা যাবে না এবং একজন প্রার্থী পাঁচজনের বেশি সমর্থক নিয়ে যেতে পারবেন না। নির্বাচনি প্রচারণায় ট্রাক, বাস, মোটরসাইকেল, নৌযান, ট্রেন বা অন্য যান্ত্রিক যানবাহন ব্যবহার করে মিছিল কিংবা শোভাযাত্রা করা যাবে না। হেলিকপ্টার বা অন্য কোনো আকাশযান ব্যবহারও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে নির্বাচনকে উৎসবমুখর করতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পরিবেশবান্ধব ক্যারাভ্যান বা ভ্রাম্যমাণ প্রচারণার সুযোগ রাখা হয়েছে, তবে তা যেন জনদুর্ভোগ সৃষ্টি না করে।


খসড়ায় আরও বলা হয়েছে, মসজিদ, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডাসহ কোনো ধর্মীয় উপাসনালয়, সরকারি অফিস কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নির্বাচনি প্রচারণা চালানো যাবে না। সরকারি সার্কিট হাউস, ডাকবাংলো, রেস্ট হাউস বা সরকারি কার্যালয়ও নির্বাচনি প্রচারণার জন্য ব্যবহার করা যাবে না। চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী সর্বোচ্চ তিনটি এবং সদস্য পদপ্রার্থী একটি নির্বাচনি ক্যাম্প স্থাপন করতে পারবেন। নির্বাচনি ক্যাম্পে টেলিভিশন, ভিসিডি বা ডিভিডি ব্যবহারের অনুমতি থাকবে না। পথসভা বা ঘরোয়া সভা করতে হলে অন্তত ২৪ ঘণ্টা আগে স্থানীয় পুলিশকে জানাতে হবে এবং জনসাধারণের চলাচলে বিঘ্ন ঘটে এমন স্থানে সভা করা যাবে না।


নির্বাচন-পূর্ব সময়ে কোনো সরকারি, আধাসরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে নতুন উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন, ঘোষণা, ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন বা ফলক উন্মোচন করা যাবে না। একইভাবে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, সদস্য বা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা নতুন উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন কিংবা প্রকল্পে অর্থ ছাড় করতে পারবেন না। কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পসংক্রান্ত সভায় অংশ নিতে পারবেন না এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য বা সভাপতি হলেও নির্বাচন-পূর্ব সময়ে ওই দায়িত্ব পালন থেকে বিরত থাকতে হবে।


খসড়া আচরণবিধিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, বিধিমালা লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড, ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড দেওয়া যাবে। গুরুতর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর প্রার্থিতাও বাতিল করা হতে পারে।


এদিকে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে প্রার্থীর ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক নির্ধারণের বিষয়ে হাইকোর্টের রুল প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেছেন, বিদ্যমান আইন, আদালতের পর্যবেক্ষণ এবং অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করে কমিশন প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবে। তবে এ কারণে স্থানীয় সরকার নির্বাচন পিছিয়ে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। তিনি জানান, কমিশন স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন করেছে এবং আগামী আগস্টের মধ্যে তফসিল ঘোষণা করে অক্টোবর মাসে প্রথম ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। যেসব ইউনিয়নে জনপ্রতিনিধির মেয়াদ শেষ হয়েছে বা পদ শূন্য রয়েছে, সেসব এলাকায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।