নিজস্ব প্রতিবেদক | ক্রাইম ক্রনিকল
বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি প্রকল্পে ধারাবাহিক ব্যর্থতার কারণে চুক্তি বাতিল ও কালো তালিকাভুক্ত হওয়ার পরও একই প্রতিষ্ঠানকে আবার আন্তর্জাতিক দরপত্রে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি (পাওয়ার গ্রিড) বিরুদ্ধে। বিষয়টি নিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ দিয়েছে আন্তর্জাতিক দরপত্রে অংশ নেওয়া চীনা প্রতিষ্ঠান চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশন (সিএমসি)।
অভিযোগে বলা হয়েছে, পরিচালনা পর্ষদের নীতিগত সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে যৌথ উদ্যোগের (জয়েন্ট ভেঞ্চার) মাধ্যমে এনার্জিপ্যাক ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডকে পুনরায় দরপত্রে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, একাধিক প্রকল্পে ব্যর্থতার কারণে কার্যাদেশ বাতিল হওয়া কোনো প্রতিষ্ঠানকে আবার একই ধরনের প্রকল্পে কাজ দেওয়ার উদ্যোগ নজিরবিহীন।
নথিপত্র অনুযায়ী, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন পাওয়ার ট্রান্সমিশন স্ট্রেংদেনিং অ্যান্ড ইন্টিগ্রেশন অব রিনিউয়েবল এনার্জি প্রজেক্ট (পিটিএসআইআরইপি)-এর দুটি বড় প্যাকেজের সম্মিলিত মূল্য ৮০০ কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে প্যাকেজ-২-এর মূল্য প্রায় ৬১২ কোটি টাকা এবং প্যাকেজ-৩-এর মূল্য ২০০ কোটির বেশি। অভিযোগ রয়েছে, এই দুই প্যাকেজের কার্যাদেশও এনার্জিপ্যাককে দেওয়ার প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে।
প্রাপ্ত নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হওয়া, প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘ বিলম্ব এবং চুক্তির বিভিন্ন শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগে ২০২৫ সালে এনার্জিপ্যাকের তিনটি চুক্তি বাতিল করা হয়। একই প্রতিষ্ঠানের অধীনে থাকা আরও চারটি প্রকল্প দীর্ঘদিন ধরে বিলম্বিত বা আংশিক বাস্তবায়িত অবস্থায় রয়েছে।
চুক্তি বাতিলসংক্রান্ত পাওয়ার গ্রিডের এক চিঠিতে বলা হয়, ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানটি সময়মতো অগ্রিম অর্থ প্রদানের গ্যারান্টি জমা দেয়নি, বৈদেশিক মুদ্রার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে, প্রয়োজনীয় বীমা সম্পন্ন করেনি এবং একাধিক সাব-স্টেশনের কাজ দীর্ঘদিন বন্ধ রেখেছে। একাধিক নোটিশের পরও কাজ পুনরায় শুরু না করায় জেনারেল কন্ডিশন অব কন্ট্রাক্টের সংশ্লিষ্ট ধারায় চুক্তি বাতিল করা হয়।
এদিকে পাওয়ার গ্রিডের পরিচালনা পর্ষদের কার্যবিবরণীতে উল্লেখ রয়েছে, কোনো ঠিকাদারের ব্যর্থতার কারণে চুক্তি বাতিল হলে তাকে পরবর্তী তিন বছর প্রতিষ্ঠানের কোনো দরপত্রে অংশগ্রহণের অযোগ্য ঘোষণা করার নীতিগত সিদ্ধান্ত রয়েছে। সেই হিসেবে এনার্জিপ্যাকের ২০২৮ সাল পর্যন্ত দরপত্রে অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকার কথা নয়।
তবে অভিযোগ অনুযায়ী, পরবর্তীতে একই প্রকল্পগুলো পুনরায় দরপত্রে আহ্বান করা হলে যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে এনার্জিপ্যাক আবারও অংশ নেয়। শুধু অংশগ্রহণই নয়, কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়নেও প্রতিষ্ঠানটিকে গ্রহণযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে এবং অন্তত দুটি প্রকল্পে কার্যাদেশ দেওয়ার প্রক্রিয়াও এগিয়ে চলছে।
পিটিএসআইআরইপি প্রকল্পের আওতায় মাধবপুর ও মনোহরদীতে নতুন ২৩০/১৩২/৩৩ কেভি সাব-স্টেশন নির্মাণ, বৈজুপুর সাব-স্টেশনের সম্প্রসারণ এবং সংশ্লিষ্ট সঞ্চালন লাইন নির্মাণের কাজ রয়েছে। টার্নকি ভিত্তিতে বাস্তবায়িত এই প্রকল্পে নকশা প্রণয়ন, যন্ত্রপাতি সরবরাহ, স্থাপন, পরীক্ষা ও কমিশনিংয়ের পূর্ণ দায়িত্ব ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের ওপর ন্যস্ত থাকবে।
চীনা প্রতিষ্ঠান সিএমসির অভিযোগে বলা হয়েছে, পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য ছিল ব্যর্থ ঠিকাদারদের ভবিষ্যৎ প্রকল্পে অংশগ্রহণ ঠেকানো। কিন্তু যৌথ উদ্যোগের কাঠামো ব্যবহার করে সেই নীতিকে কার্যত অকার্যকর করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, প্রকল্পগুলো এডিবির পাশাপাশি বিশ্বব্যাংক, এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) এবং জার্মান উন্নয়ন সংস্থা কেএফডব্লিউসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীর অর্থায়নে বাস্তবায়িত হচ্ছে। ফলে ক্রয়প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন বা প্রকল্প বাস্তবায়নে অস্বাভাবিক বিলম্ব আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশীদারদের আস্থার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুর রশিদ খান বলেন, দাতা সংস্থার অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পে সংশ্লিষ্ট সংস্থার ক্রয় নির্দেশিকা অনুসরণ করতে হয়। তিনি বলেন, “যারা আগে টার্মিনেট হয়েছে তাদের বাদ দেওয়ার কোনো বিধান রাখা যায় কি না, সে বিষয়ে আমরা দাতা সংস্থাকে অনুরোধ করেছিলাম। তারা জানিয়েছে, তাদের গাইডলাইনে এমন কোনো বিধান নেই।”
তবে অভিযোগের বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।