নিজস্ব প্রতিবেদক | ক্রাইম ক্রনিকল


ফরিদপুরের পথে-প্রান্তরে খালি পায়ে গান গেয়ে বেড়ানো লায়লা বাউল, যার প্রকৃত নাম লায়লা বেগম, এবার পেলেন রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর থেকেই যার নাম ছড়িয়ে পড়েছিল সারা দেশে, সেই শিল্পীকে এবার আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ বেতারের তালিকাভুক্ত সংগীতশিল্পী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।


গত বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) সকালে বাংলাদেশ বেতারের সদর দপ্তরে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বেতারের মহাপরিচালক এ এস এম জাহীদ লায়লা বেগমের হাতে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির সনদ তুলে দেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ বেতার ঢাকা কেন্দ্রের পরিচালক মো. বশির উদ্দিনসহ প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। বাংলাদেশ বেতারের সংগীত বিভাগের সহকারী পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান জানিয়েছেন, গত সপ্তাহে প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার পরই তাকে এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।


একই দিন বেতারের স্টুডিও থেকে সরাসরি সম্প্রচারিত একক সংগীতানুষ্ঠান 'ইউফোনি'-তে গান পরিবেশন করেন লায়লা বেগম, যা বেতারের ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেলেও প্রচার করা হয়। এদিন সচিবালয়ে আয়োজিত এক পৃথক অনুষ্ঠানে সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী তার হাতে তিন লাখ টাকার সরকারি অনুদানের চেকও তুলে দেন।


স্বীকৃতি পেয়ে আবেগাপ্লুত লায়লা বেগম বলেন, বাংলাদেশ বেতারকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি আমাকে তালিকাভুক্ত সংগীতশিল্পীর মর্যাদা দেওয়ার জন্য। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিল্পীদের সম্মান জানাতে বাংলাদেশ বেতারের এমন উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। মহাপরিচালক এ এস এম জাহীদ বলেন, বাংলাদেশ বেতার সবসময় প্রতিভার মূল্যায়ন করে এসেছে এবং লায়লা বেগমের মতো একজন শিল্পীকে তালিকাভুক্ত করতে পেরে তারা আনন্দিত।


লায়লা বেগমের উত্থানের গল্পটি কেবল সংগীতের নয়, এটি একটি সংগ্রামী জীবনের গল্পও। শৈশবেই মা-বাবাকে হারান তিনি। ফরিদপুর শহরের গোয়ালচামট এলাকায় এক পালিত মায়ের কাছে বেড়ে ওঠেন এবং সেই মায়ের দেওয়া একটি হারমোনিয়াম থেকেই শুরু হয় তার সংগীতচর্চার যাত্রা। দীর্ঘ প্রায় দুই দশক ধরে খালি পায়ে শহরের অলিগলি, রেলস্টেশন, বাসস্ট্যান্ড, হাটবাজার কিংবা শ্মশানঘাটে ঘুরে ঘুরে গান গেয়ে বেড়িয়েছেন তিনি।


গত ২৪ মে ফরিদপুরে নজরুলজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের 'নয়ন ভরা জল গো তোমার আঁচল ভরা ফুল' গানটি খালি গলায় পরিবেশন করেন লায়লা বেগম। সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে রাতারাতি সারা দেশে আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসেন তিনি। সাদামাটা জীবনযাপন আর অসাধারণ কণ্ঠের অধিকারী এই শিল্পীকে স্থানীয়রা আগে থেকেই চিনতেন, কিন্তু ভাইরাল হওয়ার পর তার প্রতিভা পৌঁছে যায় সারা দেশের মানুষের কাছে।


স্থানীয় সাংস্কৃতিক মহলের মতে, সংগ্রামমুখর জীবনের এই শিল্পীর সামনে এখন খুলে গেছে সম্ভাবনার নতুন দুয়ার। সরকারি স্বীকৃতি ও আর্থিক অনুদান তার সংগীতজীবনকে আরও সমৃদ্ধ করবে বলেই আশা করছেন সকলে।