নিজস্ব প্রতিবেদক | ক্রাইম ক্রনিকল


ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির প্রধান কার্যালয়ের সামনে আজ সোমবার সকাল থেকে ব্যাপক উত্তেজনা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। নতুন চেয়ারম্যান মো. খুরশীদ আলমের যোগদান বাধাগ্রস্ত করতে ‘কনশাস কাস্টমারস ফোরাম’ নামে একটি ভুয়া সংগঠন সাজিয়ে দলীয় লোকজন বিক্ষোভ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিক্ষোভ ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ জলকামান, লাঠিচার্জ ও টিয়ারশেল ব্যবহার করেছে।


দুপুর ১২:৪৫ পর্যন্ত পুরো এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। নতুন চেয়ারম্যান এখনো ব্যাংকে প্রবেশ করতে পারেননি। তার যোগদান আটকে দিতে সংঘবদ্ধ একটি পক্ষ ব্যাংকের প্রধান ফটক ঘেরাও করে রেখেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে।



কনশাস কাস্টমারস ফোরামের বিক্ষোভ | সংগৃহীত ছবি।


‘গ্রাহক নয়, দলীয় কর্মীরা নিয়ন্ত্রণ করছে পরিস্থিতি’


ব্যাংকের নিরাপত্তা বিভাগ ও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা ক্রাইম ক্রনিকলকে জানিয়েছেন, সকাল সাড়ে ৮টার দিকে প্রায় ২০০-২৫০ জন মানুষ ‘কনশাস কাস্টমারস ফোরাম’ ব্যানারে জড়ো হতে শুরু করে। কিন্তু তাদের অধিকাংশের কাছেই কোনো গ্রাহক পরিচয়পত্র বা ব্যাংক হিসাব ছিল না।


ব্যাংকের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, “ওদের মধ্যে অনেককে আমরা চিনি - এরা স্থানীয় একটি রাজনৈতিক দলের কর্মী। গ্রাহক সেজে তারা ব্যাংকের সামনে অবস্থান নিয়েছে। মূল উদ্দেশ্য হলো - নতুন চেয়ারম্যানকে আজ যেকোনো মূল্যে অফিসে উঠতে না দেওয়া।”


আরেক নিরাপত্তা কর্মকর্তার বরাতে জানা যায়, সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বিক্ষোভকারীরা ব্যাংকের ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করলে পুলিশ প্রথমে লাঠিচার্জ, পরে জলকামান ও সাউন্ড গ্রেনেড (টিয়ারশেল) ব্যবহার করে। এ সময় চেয়ারম্যানের গাড়ি আসার কথা ছিল - কিন্তু পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়ায় তার যোগদান স্থগিত রাখা হয়েছে।


পুলিশ যা বলছে


ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মুখপাত্র উপ-কমিশনার (মিডিয়া) এনএম নাসিরউদ্দিন ক্রাইম ক্রনিকলকে বলেন, “গ্রাহকরা ব্যাংকের অফিসের সামনে অবস্থান নেয়। পুলিশ বারবার এলাকা ছাড়ার অনুরোধ করে। তারা না সরায় আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে জলকামান ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করা হয়।”


বিক্ষোভকারীরা আসলে প্রকৃত গ্রাহক কি না - এ প্রসঙ্গে ডিএমপির এই মুখপাত্র জানান, “এটি তদন্ত সাপেক্ষ। তবে ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকায় স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় ওই ব্যবস্থা নেওয়া হয়। বর্তমানে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক রয়েছে, তবে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।”



পুলিশের জলকামান ব্যবহার | সংগৃহীত ছবি।


‘প্রতিপক্ষকে হেয় করতে এই নাটক’


নতুন চেয়ারম্যান খুরশীদ আলমের সমর্থক ও ব্যাংকটির কিছু পরিচালকের অভিযোগ, পূর্ববর্তী চেয়ারম্যানের অনুগত একটি গোষ্ঠী তাদের অবস্থান হারানোর ক্ষোভ থেকে এই ‘ভুয়া ফোরাম’ তৈরি করেছে। তাদের দাবি, ব্যাংক ঘুরে দাঁড়ানোর পথে বাধা সৃষ্টি করাই মূল উদ্দেশ্য।


সংযুক্ত আরেক সূত্র জানিয়েছে, গত কয়েকদিন ধরেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে গুজব ও অপপ্রচার চালাচ্ছিল একটি চক্র। আজকের বিক্ষোভ তারই ধারাবাহিকতা।


অন্যদিকে বিক্ষোভকারীদের দাবি


এদিকে ‘কনশাস কাস্টমারস ফোরামের’ ব্যানারে থাকা এক ব্যক্তি দাবি করেন, “আমরা প্রকৃত গ্রাহক। খুরশীদ আলমের বিতর্কিত ভূমিকা - বিশেষ করে এস আলমের শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোতে ঋণ অনিয়মের ঘটনা - সে জন্য তার চেয়ারম্যান পদ চাই না। পুলিশ নির্বিচারে গুলি ছুড়েছে, আমাদের কয়েকজন আহত হয়েছে।”


প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, লাঠিচার্জ ও টিয়ারশেলের সময় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনায় কমপক্ষে ১০-১৫ জন আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে কয়েকজন পুলিশ সদস্যও রয়েছেন।


নতুন চেয়ারম্যান কে?


উল্লেখ্য, গত ২৪ মে রাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আগের চেয়ারম্যান পদত্যাগের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ঈদের আগের দিন এই নিয়োগ দেওয়া হয়।


খুরশীদ আলম ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট বিক্ষোভের মুখে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। তার বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী এস আলমের একাধিক শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক নিয়ন্ত্রণে নেওয়া ও ঋণ অনিয়মের বিষয়টি মাথায় রেখেই অনেকের আপত্তি থাকলেও, আইনজীবীদের মতে, কোনো চূড়ান্ত দোষী সাব্যস্ত ছাড়া তাকে চাকরিতে বাধা দেওয়া অবৈধ।