স্টাফ রিপোর্টার | ক্রাইম ক্রনিকল


যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্টিফিক আমেরিকান তাদের প্রথমবারের মতো প্রকাশিত 'ইয়াং আমেরিকান সায়েন্টিস্টস' তালিকায় জায়গা দিয়েছে ২৮ জন অনূর্ধ্ব-৪০ তরুণ গবেষককে, যাঁদের কাজ ভবিষ্যতে বিজ্ঞান ও সমাজের গতিপথ বদলে দিতে পারে বলে মনে করছে সাময়িকীটি। এই তালিকায় আছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত জ্যোতির্বিজ্ঞানী তনিমা তাসনিম আনান্না, যিনি সুপারম্যাসিভ বা অতিমহাকায় কৃষ্ণগহ্বর নিয়ে গবেষণা করেন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েন স্টেট ইউনিভার্সিটিতে।


সায়েন্টিফিক আমেরিকানের জুলাই/আগস্ট সংখ্যার প্রচ্ছদ-আয়োজন এই 'ইয়াং আমেরিকান সায়েন্টিস্টস, ক্লাস অব ২০২৬'। প্রথম থেকেই নির্দিষ্টসংখ্যক ফাইনালিস্ট ঠিক করে রাখা হয়নি; বরং বিশ্বজুড়ে শত শত খ্যাতনামা গবেষক ও বিশেষজ্ঞের মনোনয়ন এবং সম্পাদকীয় দলের গভীর পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে শেষ পর্যন্ত এই ২৮ জনে এসে থামে তালিকা। যাঁরা এখনো পূর্ণাঙ্গ অধ্যাপক পদে পৌঁছাননি—স্নাতকোত্তর গবেষক, সহকারী অধ্যাপক পর্যায়ের শিক্ষক বা শিল্প-প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বিজ্ঞানী—এমন প্রার্থীরাই বিবেচিত হয়েছেন এতে। সবার বয়স ৪০-এর নিচে, সর্বকনিষ্ঠ সদস্যের বয়স মাত্র ২৪ বছর। চিকিৎসাবিজ্ঞান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জ্যোতির্বিজ্ঞান থেকে শুরু করে উদ্ভিদবিজ্ঞান পর্যন্ত বিচিত্র ক্ষেত্র থেকে এসেছেন তাঁরা।



সায়েন্টিফিক আমেরিকানের 'ইয়াং আমেরিকান সায়েন্টিস্টস' তালিকায় স্থান পাওয়া বাংলাদেশি জ্যোতির্বিজ্ঞানী তনিমা তাসনিম। ছবি: সায়েন্টিফিক আমেরিকান


সায়েন্টিফিক আমেরিকানের নির্বাহী সম্পাদক জিনা ব্রাইনার এই তালিকা প্রসঙ্গে বলেন, এই আয়োজন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যকে নয়, বরং একটি নতুন প্রজন্মের সম্মিলিত অগ্রযাত্রাকেই তুলে ধরছে। তাঁর ভাষায়, "এই বিজ্ঞানীরাই সম্ভাবনার প্রতীক, বিজ্ঞান যা অর্জন করতে পারে তার এক শক্তিশালী প্রমাণ।" সাময়িকীর সম্পাদক ডেভিড ইওয়াল্টের মতে, মাসের পর মাস বিশ্বব্যাপী অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণের ফসল এই তালিকা, যার লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রের অসাধারণ প্রতিভাবান গবেষকদের সামনে নিয়ে আসা।


জুলাই/আগস্ট সংখ্যার এই বিশেষ আয়োজনে তালিকার বাইরেও আছে জিনোম বিজ্ঞানের অগ্রপথিক ক্রেইগ ভেন্টারের একটি বিরল সাক্ষাৎকার, মার্কিন বিজ্ঞান খাতে সম্ভাব্য মেধা-পলায়ন নিয়ে বিশ্লেষণ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-চালিত ভবিষ্যতের গবেষণাগার নিয়ে একটি প্রতিবেদনও। ভবিষ্যতে প্রতিবছরই এই তালিকা প্রকাশের পরিকল্পনা করছে সায়েন্টিফিক আমেরিকান।


বিগ ব্যাংয়ের পর কীভাবে রহস্যময় কৃষ্ণগহ্বর আকারে ও ভরে এত বিশাল হয়ে উঠল, আর কীভাবে তা পুরো গ্যালাক্সিকে প্রভাবিত করে—এই প্রশ্নগুলো নিয়েই তনিমার গবেষণা। সায়েন্টিফিক আমেরিকানের এই স্বীকৃতির আগেও ২০২০ সালে বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী সায়েন্সনিউজের 'উল্লেখযোগ্য ১০ বিজ্ঞানী'র (এসএন১০) তালিকাতেও উঠে এসেছিল তাঁর নাম। দ্য অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নালের বার্ষিক পর্যালোচনায় তাঁর একটি গবেষণাপত্র সবচেয়ে বেশি ডাউনলোড হওয়া ও জনপ্রিয় কাজগুলোর একটি হিসেবেও স্বীকৃতি পায়।


আগ্রহের বিষয়, এবারের তালিকায় তনিমার মতোই কৃষ্ণগহ্বর নিয়ে কাজ করা আরেকজন গবেষকও আছেন—নাসার গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারের জ্যোতিঃপদার্থবিদ এরিনি ল্যামব্রাইডিস, যিনি অতিমহাকায় কৃষ্ণগহ্বরের গঠন ও বিবর্তন নিয়ে গবেষণা করেন। তালিকায় থাকা আরেক নাসা বিজ্ঞানী অ্যাম্বার ইয়াং কাজ করেন গ্রহের বায়ুমণ্ডলে প্রাণের সম্ভাব্য চিহ্ন খোঁজার গবেষণায়।


ঢাকার বাড্ডায় বেড়ে ওঠা তনিমার তারা দেখার নেশা শুরু হয়েছিল ছোটবেলাতেই, লোডশেডিংয়ের সময়গুলোতে। তখন এখনকার মতো এত উঁচু দালানকোঠা ছিল না, আর বিদ্যুৎ চলে গেলে চারপাশ অন্ধকার হয়ে আকাশটা হয়ে উঠত পরিষ্কার। সেই আকাশের দিকে তাকিয়ে, আর মায়ের কাছে গ্রহ-নক্ষত্রের গল্প শুনে নভোচারী হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন তিনি। সেই স্বপ্ন এখনো পুরোপুরি পূরণ হয়নি, তবে বিজ্ঞানের পথ ধরে তিনি সেই স্বপ্নের অনেকটা কাছাকাছি পৌঁছাতে পেরেছেন।


যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাষ্ট্রের হ্যাভারফোর্ড কলেজ ও ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো নামী প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেছেন তনিমা। পিএইচডি করেছেন আমেরিকান অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির সভাপতি ও ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান ক্লডিয়া মেগান উরির তত্ত্বাবধানে। এ ছাড়া নাসা ও সার্নেও ইন্টার্নশিপ করেছেন তিনি।


বর্তমানে ওয়েন স্টেট ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতা ও গবেষণা—দুটোই করেন তনিমা। এই দুইয়ের মধ্যে কোনটা তাঁর বেশি প্রিয়, জানতে চাইলে বলেন, তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ে দুটোকেই সমান গুরুত্ব দিয়ে করতে হয়, তবে যে কাজে মানুষের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ থাকে—শিক্ষকতা হোক বা গবেষণা—সেটাই তাঁর বেশি ভালো লাগে।


বিদেশে থেকেও দেশের জন্য কিছু করার চেষ্টা সব সময় করেন বলে জানান তনিমা। তাঁর প্রথম পিএইচডি শিক্ষার্থী ছিলেন একজন বাংলাদেশি। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক সংগঠন ওয়াই-স্টেমের (বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিতে নারী) মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের সঙ্গেও কাজ করছেন তিনি।


ঢাকার মানারাত ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে পড়াশোনা করা তনিমা ছোটবেলা থেকেই ছিলেন প্রচণ্ড বইপ্রেমী। নন্টে-ফন্টে, চাচা চৌধুরীর কমিকস থেকে শুরু করে প্রথম আলোর আলপিন, সুকুমার রায়-সত্যজিৎ রায়-হুমায়ূন আহমেদের লেখা, এমনকি হ্যারি পটার বা লর্ড অব দ্য রিংস—কিছুই বাদ যায়নি তাঁর পড়ার তালিকা থেকে। বাসায়, আত্মীয়ের বাড়িতে বা যেকোনো দাওয়াতে গিয়ে কোনো বই চোখে পড়লেই তা পড়ে ফেলতেন বলে জানান তিনি, আর এখনো প্রতি রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে কিছু না কিছু পড়েন। বই পড়ার পাশাপাশি ছবি আঁকা ও গান শেখাও চলত সমানতালে—হয়তো এসবের মিলিত প্রভাবেই ছোটবেলাতেই তাঁর কল্পনায় জায়গা করে নিয়েছিল আস্ত এক মহাকাশ।

নভোচারী হওয়ার সেই ছোটবেলার স্বপ্ন কি এখনো আছে? প্রশ্ন শুনে হেসে তনিমা বলেন, "এখনো আশা ছাড়িনি।"

 

বিজনেস ওয়্যারে প্রকাশিত স্প্রিঙ্গার নেচারের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি এবং নাসা সায়েন্সের প্রতিবেদন অবলম্বনে প্রস্তুত।