স্বাস্থ্য ডেস্ক | ক্রাইম ক্রনিকল
নূরুন্নাহার সামিয়া

ঢাকা আজ শুধু বাংলাদেশের রাজধানী নয়; এটি একই সঙ্গে স্বপ্ন, সংগ্রাম ও টিকে থাকার প্রতীক। কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও উন্নত জীবনের প্রত্যাশায় প্রতিদিন হাজারো মানুষ এই শহরে পাড়ি জমান। কিন্তু সেই স্বপ্নের শহরই ক্রমশ অনেকের কাছে হয়ে উঠছে ক্লান্তিকর, ব্যয়বহুল এবং মানসিকভাবে চাপপূর্ণ। যানজট, বায়ু ও শব্দদূষণ, অতিরিক্ত জনঘনত্ব, অস্থিতিশীল আবাসন এবং সীমিত নাগরিক সেবার কারণে নগরজীবনের চাপ প্রতিনিয়ত বাড়ছে।

এই চাপ কেবল দৈনন্দিন ভোগান্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ছে মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যে। প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকা, কর্মস্থলের বাড়তি চাপ, নিরাপত্তাহীনতা এবং ব্যক্তিগত সময়ের সংকট মানুষের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগ ও মানসিক অবসাদ তৈরি করছে। অনেকেই বুঝতে পারেন না যে তাদের অবিরাম ক্লান্তি কেবল শারীরিক নয়; এটি বিষণ্ণতারও লক্ষণ হতে পারে। ফলে বিষণ্ণতা ঢাকার নগরজীবনের এক নীরব কিন্তু ক্রমবর্ধমান সংকটে পরিণত হয়েছে।

অপরিকল্পিত নগরায়ণ এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। শহর দ্রুত বিস্তৃত হলেও সেই অনুপাতে উন্নত গণপরিবহন, পর্যাপ্ত সবুজ এলাকা, উন্মুক্ত স্থান এবং প্রয়োজনীয় নাগরিক অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। গাছপালা ও খোলা জায়গা কমে যাওয়া, বায়ুর মানের অবনতি এবং শব্দদূষণের মতো পরিবেশগত সমস্যাগুলো মানুষের মানসিক চাপকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, সবুজ পরিবেশ ও উন্মুক্ত স্থান মানুষের মানসিক সুস্থতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

এই সংকট নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ক্ষেত্রে সবচেয়ে তীব্র। বাসাভাড়া, যাতায়াত, খাদ্য, চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যয় ক্রমাগত বাড়লেও অনেকের আয় সেই হারে বাড়ছে না। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা তাদের মধ্যে স্থায়ী উদ্বেগ তৈরি করছে। অন্যদিকে শিক্ষিত তরুণ ও কর্মজীবী মানুষের জন্য প্রতিযোগিতামূলক চাকরির বাজার, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা মানসিক চাপকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। ফলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান ভিন্ন হলেও নগরজীবনের মানসিক চাপ থেকে প্রায় কেউই মুক্ত নন।

সমস্যাটিকে আরও জটিল করে তুলেছে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সামাজিক কুসংস্কার ও সচেতনতার অভাব। এখনো অনেকেই বিষণ্ণতাকে ব্যক্তিগত দুর্বলতা বা মানসিক শক্তির ঘাটতি হিসেবে দেখেন। এই ভুল ধারণা মানুষকে প্রয়োজনীয় সহায়তা নেওয়া থেকে বিরত রাখে। ফলে অনেকে দীর্ঘদিন নীরবে মানসিক কষ্ট বহন করেন, যা শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিগত জীবন, কর্মক্ষমতা এবং পারিবারিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

এই বাস্তবতা মোকাবিলায় প্রয়োজন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। ঢাকাকে সত্যিকারের বাসযোগ্য করতে হলে কেবল সড়ক ও উড়ালসেতু নির্মাণ নয়, মানুষের জীবনমানকে কেন্দ্র করে নগর পরিকল্পনা করতে হবে। উন্নত গণপরিবহন, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, সবুজ এলাকা বৃদ্ধি, জলাবদ্ধতা নিরসন, নিরাপদ আবাসন এবং মানসম্মত নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে সহজলভ্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গড়ে তোলা জরুরি। একই সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং পরামর্শসেবার বিস্তারও সময়ের দাবি।

ঢাকার জীবনমান ও বিষণ্ণতা—এই দুটি বিষয় আলাদা নয়; বরং একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। যে শহর প্রতিদিন তার বাসিন্দাদের শারীরিক ও মানসিকভাবে অবসন্ন করে তোলে, সে শহরের উন্নয়ন কেবল অবকাঠামো দিয়ে মূল্যায়ন করা যায় না। তাই ঢাকাকে সত্যিকার অর্থে আধুনিক, মানবিক ও বাসযোগ্য নগরীতে রূপ দিতে হলে মানসিক স্বাস্থ্যকে নগর উন্নয়ন নীতির অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতেই হবে।