বিশ্লেষণ | নাসির আহমেদ
গতকাল ১০ আগস্ট সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে আধা ঘণ্টার এক বৈঠক করেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। জুন মাসে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই ছিল সরকারপ্রধানের সঙ্গে তাঁর প্রথম সাক্ষাৎ, আর কূটনৈতিক ভাষায় এর পরিচয় ‘সৌজন্য সাক্ষাৎ’।
বৈঠকটি ঘিরে সরকারের ভাষ্য ছিল সংযত। জানানো হয়, হাইকমিশনার ঢাকায় দুই মাসের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন এবং দ্বিপাক্ষিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর আরও জানায়, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া ভারত ত্বরান্বিত করবে বলে বাংলাদেশ আশা করে।

নাহিদ ইসলামের ফেসবুক পেজ থেকে সংগৃহীত ছবি
কিন্তু এই সংযত ভাষ্যই এখন রাজনৈতিক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এনসিপির আহ্বায়ক এবং ঢাকা-১১ আসনের সংসদ সদস্য নাহিদ ইসলাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে প্রশ্ন তুলেছেন, মাত্র পাঁচ দিন আগে যে ঘটনায় ঢাকা আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানিয়েছিল, এত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে সেটির উল্লেখ প্রকাশ্যে এলো না কেন।
যে ঘটনা থেকে টানাপোড়েনের শুরু
গত ৫ আগস্ট, জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীর দিনে, দিল্লিতে বিদেশি সাংবাদিকদের একটি ফোরামের অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
সেদিন সন্ধ্যায়ই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিবৃতি দিয়ে তীব্র অসন্তোষ জানায়। বিবৃতিতে বলা হয়, জুলাই অভ্যুত্থানের বার্ষিকীর দিনে ভারতের মাটিতে তাঁকে এমন সুযোগ দেওয়া বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি অসম্মানজনক। ২০১৩ সালের প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় একাধিকবার অনুরোধ জানানো হলেও ইতিবাচক সাড়া মেলেনি বলেও উল্লেখ করা হয়।
দিল্লির জবাব ছিল দূরত্ব রাখার। অনুষ্ঠানের আগের দিন ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানান, আয়োজনটি বেসরকারি এবং এতে সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। ৭ আগস্ট তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে ওই সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্য ভারত সরকার সমর্থন করে না।
কূটনৈতিকভাবে এই অবস্থানকে বলা যায় দায় এড়ানোর সবচেয়ে নিরাপদ পথ। ঘটনাটি ঘটতে দেওয়া হলো, অথচ দায়িত্ব নেওয়া হলো না।
নাহিদের বক্তব্যের কেন্দ্রবিন্দু
নাহিদ ইসলামের অভিযোগ, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি বিবৃতি দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেছে এবং ভারতের কাছ থেকে কার্যকর জবাবদিহি আদায় করতে পারেনি।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দুই বছর ধরে ভারত নিজের ভূখণ্ড ব্যবহার করে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশবিরোধী কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ দিয়ে আসছে, যা দেশের সার্বভৌমত্ব ও বিচারব্যবস্থার প্রতি সরাসরি অবমাননা।
সবচেয়ে তীক্ষ্ণ প্রশ্নটি তিনি তুলেছেন হাইকমিশনারের ব্যবহৃত একটি শব্দবন্ধ নিয়ে। ‘shared dream’ বা অভিন্ন স্বপ্নের কথা বলা হলে বাংলাদেশের মানুষ কোনো সম্প্রসারণবাদী স্বপ্নের অংশীদার নয় বলে তিনি জানান। দিল্লি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার দাবি করে, এমন কোনো সম্পর্ক গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তবে তিনি সম্পর্ক ছিন্ন করার কথা বলেননি। তাঁর দাবি চারটি — ৫ আগস্টের ঘটনায় ভারতের স্পষ্ট ব্যাখ্যা ও দুঃখ প্রকাশ, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, ওসমান হাদি হত্যায় অভিযুক্তদের ফেরত পাঠানো এবং ভারতের মাটি থেকে বাংলাদেশবিরোধী রাজনৈতিক তৎপরতা বন্ধের নিশ্চয়তা।
হাদি প্রসঙ্গ কেন যুক্ত হলো
প্রত্যর্পণ প্রশ্নে দ্বিতীয় নামটি সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ক্রমেই বড় হয়ে উঠেছে।
ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান বিন হাদি গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর পুরানা পল্টনে গুলিবিদ্ধ হন এবং সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর মারা যান। মামলার প্রধান আসামি ও তাঁর সহযোগী সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে চলে যান, পরে মার্চ মাসে পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁ থেকে তাঁরা গ্রেপ্তার হন।
এরপর কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও তাঁদের দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। জুন মাসে ইনকিলাব মঞ্চ এ নিয়ে রাজপথে বিক্ষোভও করেছে।
ফলে প্রত্যর্পণ এখন আর কেবল শেখ হাসিনাকেন্দ্রিক একক দাবি নয়। দুটি আলাদা মামলা মিলে এটি একটি বৃহত্তর পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে — দ্বিপাক্ষিক চুক্তি আদৌ কাজ করে কি না, সেই পরীক্ষায়।
সরকারের সামনে দ্বৈত চাপ
ঢাকার অবস্থান এই মুহূর্তে দুই দিক থেকে চাপে।
একদিকে অর্থনীতি ও ভূগোলের বাস্তবতা। বাণিজ্য, ট্রানজিট, পানি ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলোতে দুই দেশের পারস্পরিক নির্ভরশীলতা এড়ানোর উপায় নেই। হাইকমিশনার নিজেও সম্পর্ক উন্নয়নের সুযোগ রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন, আর আজ দুই পক্ষ থেকেই ‘নতুন সূচনা’র আগ্রহ প্রকাশ পেয়েছে।
অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে গঠিত এই সরকারের বৈধতার একটি বড় অংশ দাঁড়িয়ে আছে বিচার ও জবাবদিহির প্রতিশ্রুতির ওপর। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার যেকোনো পদক্ষেপ তাই ঘরোয়া রাজনীতিতে দ্রুত প্রশ্নের মুখে পড়ে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সম্প্রতি ‘হাসিনা কার্ড’ প্রসঙ্গে যে মন্তব্য করেছিলেন, তাতেও একই টানাপোড়েন স্পষ্ট। সরকারের ভেতর থেকেও বার্তা যাচ্ছে যে সম্পর্ক চাই, তবে শর্তসাপেক্ষে।
কূটনীতির যে সীমাবদ্ধতা
প্রত্যর্পণ চুক্তি থাকা আর তা কার্যকর হওয়া এক বিষয় নয়। আন্তর্জাতিক অনুশীলনে রাজনৈতিক আশ্রয়প্রাপ্ত ব্যক্তিদের ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে আশ্রয়দাতা রাষ্ট্রের বিবেচনার সুযোগ থাকে যথেষ্ট। ফলে চুক্তির ধারা উদ্ধৃত করে চাপ তৈরি করা গেলেও বাধ্য করা যায় না।
বাংলাদেশের হাতে যে উপায়গুলো আছে, সেগুলোও সীমিত। আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ, আন্তর্জাতিক ফোরামে বিষয়টি তোলা, কিংবা দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় শর্ত যুক্ত করা — এর বাইরে কঠোর পদক্ষেপের সুযোগ কম, আর তার অর্থনৈতিক মূল্যও চড়া।
নাহিদ ইসলাম যে ‘দৃশ্যমান অবস্থানের’ কথা বলছেন, তার বাস্তব রূপ কী হতে পারে — সেই প্রশ্নের উত্তর তাঁর পোস্টে নেই। এখানেই বিরোধী রাজনীতির সুবিধা, আর সরকারের অসুবিধা।
যা নজরে রাখতে হবে
আগামী সপ্তাহগুলোতে তিনটি বিষয় এই সম্পর্কের গতিপথ নির্ধারণ করবে।
প্রথমত, ৫ আগস্টের ঘটনায় ভারতের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যাখ্যা আসে কি না। এখন পর্যন্ত যা এসেছে, তা দায় অস্বীকারের বিবৃতি, দুঃখ প্রকাশ নয়।
দ্বিতীয়ত, ওসমান হাদি হত্যা মামলার অভিযুক্তদের প্রত্যর্পণে অগ্রগতি হয় কি না। এটি তুলনামূলক সহজ মামলা, কারণ এখানে রাজনৈতিক আশ্রয়ের প্রশ্ন নেই। ফলে এই মামলাটিই হয়ে উঠতে পারে দিল্লির সদিচ্ছার সবচেয়ে বাস্তব মাপকাঠি।
তৃতীয়ত, সরকারপ্রধানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে আলোচনা কোন দিকে গড়ায়। নাহিদ ইসলাম স্পষ্ট করেই বলেছেন, বাংলাদেশবিরোধী তৎপরতা চলতে থাকা অবস্থায় এমন সফর অর্থহীন হবে।
সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষ হয়েছে আধা ঘণ্টায়। কিন্তু বৈঠকের ঘরে যা বলা হয়েছে আর বাইরে যা জানানো হয়েছে, তার মাঝখানের ফাঁকটুকুই আপাতত রাজনৈতিক বিতর্কের জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তথ্যসূত্র: নাহিদ ইসলামের ফেসবুক পোস্ট, বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্রিফিং এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তথ্য।
লেখকের মন্তব্য: এই লেখায় উপস্থাপিত বিশ্লেষণ, মতামত ও মূল্যায়ন সম্পূর্ণ লেখকের নিজস্ব। এতে ব্যবহৃত তথ্য সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হয়েছে।