নিজস্ব প্রতিবেদক | ক্রাইম ক্রনিকল
বাংলাদেশের রাজনীতিতে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে ঘিরে আলোচনা সাধারণত আবর্তিত হয় মুক্তিযুদ্ধ, রাষ্ট্র পরিচালনা ও রাজনৈতিক দর্শনকে কেন্দ্র করে। তবে সংস্কৃতি ও চলচ্চিত্রাঙ্গনে তাঁর ভূমিকা নিয়ে তুলনামূলকভাবে কম আলোচনা হয়। অথচ দেশের চলচ্চিত্রশিল্পের আধুনিকায়ন, সরকারি অনুদান প্রথার সূচনা এবং মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণে তাঁর আগ্রহের নানা উদাহরণ রয়েছে।
সেই উদাহরণগুলোর মধ্যে অন্যতম মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘কলমীলতা’। চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, ছবিটির মূল ভাবনা এসেছিল জিয়াউর রহমানের কাছ থেকেই। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও স্বাধীনতার চেতনাকে চলচ্চিত্রের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
চলচ্চিত্রপ্রেমী জিয়া
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক ও সামরিক পরিচয় যতটা পরিচিত, তাঁর চলচ্চিত্রপ্রেম ততটা আলোচিত নয়। ঘনিষ্ঠজনদের বর্ণনায় জানা যায়, তরুণ বয়সে তিনি ভারতীয় কিংবদন্তি অভিনেতা দিলীপ কুমারের অভিনয়ের ভক্ত ছিলেন। অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ থেকে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বিভিন্ন অভিব্যক্তি অনুশীলনও করতেন বলে প্রচলিত রয়েছে।
এই আগ্রহেরই প্রতিফলন দেখা যায় ‘কলমীলতা’ চলচ্চিত্র নির্মাণের সময়। ছবিতে মেজর জিয়ার চরিত্রে কাকে নেওয়া হবে, সেই আলোচনা চলাকালে তিনি একটি নির্দিষ্ট অভিনেতার নাম প্রস্তাব করেছিলেন। ‘বেদ্বীন’ চলচ্চিত্রে অভিনয় দেখে মুগ্ধ হয়ে তিনি অভিনেতা সোহেল রানা–কে নিজের চরিত্রে অভিনয়ের জন্য পছন্দ করেছিলেন।
তবে দুঃখজনকভাবে, ‘কলমীলতা’ চলচ্চিত্রের পূর্ণাঙ্গ সাফল্য ও নিজের চরিত্রে অভিনয় তিনি দেখে যেতে পারেননি।

"কলমীলতা"য় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের চরিত্রে চিত্রনায়ক সোহেল রানা
‘কলমীলতা’ নির্মাণে রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা
পরিচালক শহিদুল হক খান নির্মিত ‘কলমীলতা’য় অভিনয় করেন ইলিয়াস কাঞ্চন, আরিফুল হক, বুলবুল আহমেদ, কবরী সারোয়ার, সুচরিতাসহ আরও অনেকে।
চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ছবিটির নির্মাণে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান আর্থিক অনুদান ও নীতিগত সহযোগিতা দিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গল্পকে বড় পর্দায় তুলে ধরার বিষয়ে তিনি বিশেষ আগ্রহ দেখিয়েছিলেন।

ছবি: বাংলাদেশের দুষ্প্রাপ্য ছবিসমগ্র
চলচ্চিত্রশিল্পের আধুনিকায়নে উদ্যোগ
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্পকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার স্বপ্ন ছিল জিয়াউর রহমানের। সে সময় দেশের জনপ্রিয় অভিনেতা উজ্জ্বল–কে বঙ্গভবনে ডেকে চলচ্চিত্রশিল্পের নানা সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেছিলেন বলে সংশ্লিষ্টরা উল্লেখ করেছেন।
দেশীয় চলচ্চিত্র কীভাবে বিদেশি বাণিজ্যিক সিনেমার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারে, কীভাবে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ঘটানো যায়—এসব বিষয় নিয়ে তিনি মতবিনিময় করেন। চলচ্চিত্র নির্মাণে উৎসাহ দিতে আর্থিক সহায়তাও প্রদান করেছিলেন বলে জানা যায়।
চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্টদের মতে, জিয়ার আমলে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন (এফডিসি)-তে আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন করা হয়। আধুনিক ক্যামেরা কেনা, স্টুডিও উন্নয়ন এবং রঙিন চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়।
‘জহির রায়হান কালার ল্যাব’ ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতি
বাংলাদেশে রঙিন চলচ্চিত্র নির্মাণকে সহজ করতে এফডিসিতে ‘জহির রায়হান কালার ল্যাব’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এর ফলে বিদেশে নির্ভরতা কমে আসে এবং দেশেই রঙিন চলচ্চিত্র নির্মাণের সুযোগ বাড়ে।
একই সঙ্গে এফডিসির বেঙ্গল স্টুডিও আধুনিকায়নের মাধ্যমে চলচ্চিত্র নির্মাতাদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়। পরবর্তী দুই দশকে এসব অবকাঠামো দেশের চলচ্চিত্রশিল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
শিশুতোষ চলচ্চিত্রে নতুন যুগ
১৯৮০ সালে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে সরকারি অনুদান প্রথা চালু হয়। সেই অনুদানে নির্মিত প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ছিল 'এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী'।
পরিচালক বাদল রহমান নির্মিত এ চলচ্চিত্রটি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ শিশুতোষ চলচ্চিত্র হিসেবে বিবেচিত হয়। পরবর্তীতে এটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের স্বীকৃতিও লাভ করে।
একই সময়ে 'ডানপিটে ছেলে' নির্মাণেও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ছিল বলে চলচ্চিত্র গবেষকদের দাবি। পরিচালক খান আতাউর রহমান নির্মিত এ চলচ্চিত্রটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের একাধিক বিভাগে সম্মাননা লাভ করে।
চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের মতে, এসব উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় পরবর্তীকালে ‘ছুটির ঘণ্টা’, ‘পুরস্কার’, ‘এতিম’, ‘মাসুম’ ও ‘রামের সুমতি’র মতো জনপ্রিয় শিশু ও পারিবারিক চলচ্চিত্র নির্মাণের পথ সুগম হয়।
রাজনীতির আড়ালে সংস্কৃতির এক অধ্যায়
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জিয়াউর রহমানকে নিয়ে বিতর্ক ও মতপার্থক্য থাকলেও সংস্কৃতি ও চলচ্চিত্রশিল্পের বিকাশে তাঁর ভূমিকা নিয়ে নতুন করে গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
‘কলমীলতা’ শুধু একটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র নয়; এটি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রাঙ্গনে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণ এবং সংস্কৃতিচর্চায় রাজনৈতিক নেতৃত্বের সম্পৃক্ততার একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
চলচ্চিত্রপ্রেমী রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে জিয়াউর রহমানের এই অধ্যায় আজও অনেকের কাছে অনালোচিত। তবে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসের পাতায় ‘কলমীলতা’ এবং এর পেছনের গল্প একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে।