স্টাফ রিপোর্টার, ক্রাইম ক্রনিকল 


ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয়ভাবে সবচেয়ে বেশি ব্যয় করেছে সংসদে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী। তারা গত নির্বাচনে প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকা ব্যয় দেখিয়েছে। অন্যদিকে দুই–তৃতীয়াংশ আসন জিতে ক্ষমতায় আসা বিএনপি খরচ দেখিয়েছে প্রায় ৩ কোটি ৮১ লাখ টাকা। আর ২৭টি দল কোনো টাকা খরচ করেনি বলে নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) জানিয়েছে।


ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ৫০টি দল অংশ নেয়। ইসি গত ২৬ জুলাই ৪৯টি দলের নির্বাচনী ব্যয়ের তথ্য তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে। তবে দলগুলো কোন খাতে কত টাকা খরচ করেছে, তার বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি, শুধু দলভিত্তিক মোট ব্যয়ের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।


সংসদ নির্বাচনে দুই ধরনের নির্বাচনী ব্যয় রয়েছে—একটি প্রার্থীর নিজস্ব ব্যয়, অন্যটি দলের। একজন প্রার্থী কত টাকা খরচ করতে পারবেন, তার সীমা ওই আসনের ভোটার সংখ্যার ওপর নির্ধারিত হয় এবং প্রার্থী তা রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে জমা দেন। অন্যদিকে রাজনৈতিক দল তাদের মনোনীত একজন প্রার্থীকে সর্বোচ্চ দেড় লাখ টাকা অনুদান দিতে পারে এবং প্রচারসহ অন্যান্য খাতেও ব্যয় করতে পারে। দলের প্রার্থী সংখ্যার ওপর দলীয় মোট ব্যয়সীমা নির্ভর করে। দল তাদের ব্যয়ের হিসাব জমা দেয় নির্বাচন কমিশনে।


বিশ্লেষকদের মতে, দলগুলোর দেওয়া নির্বাচনী ব্যয়ের হিসাব কতটা সঠিক বা বাস্তবের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে এটি অনেকটা ‘ওপেন সিক্রেট’ যে জাতীয় নির্বাচনের আগে বড় দল ও তাদের গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থীদের ব্যবসায়ীরা মোটা অঙ্কের ‘ডোনেশন’ দেন। এছাড়া ইসি কখনো প্রার্থী ও দলের ব্যয়ের হিসাব সঠিক কি না তা খতিয়ে দেখে না, ফলে প্রকৃত ব্যয় প্রদত্ত হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি।


জাতীয় নির্বাচনসংক্রান্ত আইন ‘গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ’-এর অধীনে, কোনো দলের প্রার্থী ২০০ জনের বেশি হলে তারা সাড়ে চার কোটি টাকা খরচ করতে পারবে। প্রার্থী সংখ্যা ১০০ থেকে ২০০ জনের মধ্যে হলে তিন কোটি টাকা, ৫১-১০০ জনের মধ্যে হলে দেড় কোটি টাকা এবং ৫০ জনের কম প্রার্থী হলে ৭৫ লাখ টাকা ব্যয় করতে পারে।


নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য আব্দুল আলীম মনে করেন, রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর ব্যয় পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা তৈরি করা দরকার। পাশাপাশি ইসিতে জমা দেওয়া হিসাব যাচাই করা প্রয়োজন, অন্তত দৈবচয়নের ভিত্তিতে কিছু কিছু যাচাই করে দেখা উচিত।


আইন অনুযায়ী, ভোটের ফলাফল গেজেট আকারে প্রকাশের ৯০ দিনের মধ্যে দলকে ব্যয় বিবরণী জমা দিতে হয়। হিসাব জমা দিতে ব্যর্থ হলে ইসি সতর্কতামূলক নোটিশ জারি করে ৩০ দিনের মধ্যে ব্যয় বিবরণী জমা দেওয়ার নির্দেশ দিতে পারে। এর মধ্যে জমা দিতে ব্যর্থ হলে ১০ হাজার টাকা জরিমানা সাপেক্ষে আরও ১৫ দিন সময় বাড়াতে পারে ইসি। এরপরও হিসাব জমা না দিলে নির্দিষ্ট দলের নিবন্ধন বাতিল করতে পারে।


গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং পরদিন ফলাফলের গেজেট প্রকাশিত হয়। আইন অনুযায়ী, ১৩ মে ছিল দলীয় ব্যয় বিবরণী জমা দেওয়ার শেষ সময়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীসহ ২৭টি দল ব্যয়ের হিসাব জমা দেয়। বাকি দলগুলোর জন্য ইসি ১৪ জুন পর্যন্ত বাড়তি সময় দেয়। বর্ধিত সময়ে বিএনপিসহ ১৬টি দল হিসাব জমা দেয়। জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বাকি সাতটি দল ব্যয় বিবরণী জমা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় ২৬ জুন তাদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়।


কোন দলের কত ব্যয়:


গত নির্বাচনে সর্বোচ্চ ২৯১ আসনে প্রার্থী দিয়েছিল ক্ষমতাসীন বিএনপি, তাদের সাড়ে চার কোটি টাকা খরচের সুযোগ থাকলেও তারা ব্যয় দেখিয়েছে ৩ কোটি ৮০ লাখ ৮৯ হাজার ১৩৭ টাকা।


২২৭ আসনে প্রার্থী দেওয়া জামায়াতে ইসলামী তাদের দলীয় ব্যয় দেখিয়েছে ৪ কোটি ৪৯ লাখ ৪৭ হাজার ৯৭২ টাকা।


এনসিপি প্রথমবার অংশ নিয়ে ৩২ জন প্রার্থী দিয়েছিল, খরচ দেখিয়েছে ১২ লাখ ৮৪ হাজার ৪০০ টাকা।


ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ২৫৮ জন প্রার্থী দিয়ে খরচ দেখিয়েছে ৩৩ লাখ ৬৫ হাজার ৯৭১ টাকা।


বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) দলীয়ভাবে খরচ করেছে ২০ লাখ ৯৬ হাজার ২৬৩ টাকা।


অন্যান্য দলের মধ্যে বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি ২০ লাখ ১৬ হাজার ৬০০ টাকা, এবি পার্টি ১৭ লাখ ৮১ হাজার ৭১০ টাকা, গণ অধিকার পরিষদ ৮ লাখ ১০ হাজার টাকা, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ৭ লাখ ৩০ হাজার টাকা এবং জাতীয় পার্টি ৫ লাখ ৫ হাজার টাকা খরচ দেখিয়েছে।


পাঁচ লাখ টাকার কম খরচ দেখানো দলগুলো হলো: জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ, সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট, বাংলাদেশ জাসদ, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্ক্সবাদী), বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট, খেলাফত মজলিস ও গণতন্ত্রী পার্টি। এক লাখের কম খরচ দেখিয়েছে আম জনতার দল ও জাতীয় পার্টি (জেপি)। সবচেয়ে কম তিন হাজার টাকা খরচ করেছে বাংলাদেশ মুসলিম লীগ (বিএমএল)।


ভোটে কোনো খরচ নেই যাদের:


দলীয়ভাবে কোনো টাকাই খরচ করেনি এমন ২৭টি দল হলো: লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), জাকের পার্টি, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি), জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, গণফোরাম, গণফ্রন্ট, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (বাংলাদেশ ন্যাপ), বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি, কল্যাণ পার্টি, ইসলামী ঐক্যজোট, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা), বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট (বিএনএফ), জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন (এনডিএম), বাংলাদেশ কংগ্রেস, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি (বিএসপি), নাগরিক ঐক্য, গণসংহতি আন্দোলন, ডেভেলপমেন্ট পার্টি, বিএমজেপি, লেবার পার্টি, বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টি, জনতার দল ও বাংলাদেশ সম অধিকার পার্টি।


উল্লেখ্য, গণসংহতি আন্দোলনের প্রার্থী জোনায়েদ সাকি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন (তিনি বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থী ছিলেন)। অন্যদিকে এনডিএম নেতা ববি হাজ্জাজ নির্বাচনের আগে বিএনপিতে যোগ দিয়ে ধানের শীষ প্রতীকে ভোট করেন এবং বর্তমানে তিনি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী।


জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ প্রথম আলোকে বলেন, রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ব্যয় বিবরণী নিরীক্ষার বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। বিশেষ প্রয়োজন হলে তা করা হবে।


ব্যয়ের হিসাব কতটা সঠিক:


জাতীয় নির্বাচনে নির্ধারিত সীমার চেয়ে অনেক বেশি ব্যয় হয়—এমন তথ্য গবেষণায়ও উঠে এসেছে। ২০২৪ সালের দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের পর ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এক গবেষণায় বলেছিল, তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা প্রচারে গড়ে প্রায় দেড় কোটি টাকা করে খরচ করেছিলেন, যা ইসি নির্ধারিত সীমার ছয় গুণ বেশি।


সাবেক নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ আব্দুল আলীম প্রথম আলোকে বলেন, রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর ব্যয় পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা তৈরি করা দরকার। পাশাপাশি ইসিতে জমা দেওয়া হিসাব যাচাই করা প্রয়োজন, অন্তত দৈবচয়নের ভিত্তিতে কিছু কিছু যাচাই করে দেখা উচিত। এভাবে যাচাই করে ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ করলে তা জনগণের কাছে স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য হবে।