কিংবদন্তি ব্রিটিশ চিত্রশিল্পী ডেভিড হকনি গত সপ্তাহে ৮৮ বছর বয়সে পৃথিবীকে বিদায় জানিয়েছেন। বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ, প্রভাবশালী এবং স্বতন্ত্র শিল্পী হিসেবে তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
হকনির শিল্পজীবন বিস্তৃত ছিল সাত দশকেরও বেশি সময়জুড়ে। ১৯৬১ সালে বার্ষিক ইয়াং কনটেম্পোরারিজ প্রদর্শনীতে তাঁর কাজ স্থান পাওয়ার মধ্য দিয়ে যুক্তরাজ্যে নতুন পপ নান্দনিকতার এক গুরুত্বপূর্ণ সূচনা ঘটে। সে সময় বিমূর্ত অভিব্যক্তিবাদ (Abstract Expressionism) যখন শিল্পজগতে প্রবল প্রভাব বিস্তার করছে, তখন হকনির প্রতীকী চিত্রকলার (Figurative Painting) প্রতি দৃঢ় অনুরাগ ছিল এক সাহসী ও তাৎপর্যপূর্ণ অবস্থান, যা সমকালীন শিল্পভাবনায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।
১৯৬৪ সালে তিনি লস অ্যাঞ্জেলেসে পাড়ি জমান। সেখানে দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার জীবনযাপন, ঢেউখেলানো পাহাড়, সুইমিং পুল এবং আধুনিক স্থাপত্য তার শিল্পকর্মের প্রধান বিষয় হয়ে ওঠে। এসব চিত্রকর্ম ১৯৬০ এর দশকের সবচেয়ে স্বীকৃত ও স্মরণীয় শিল্পসৃষ্টির মর্যাদা লাভ করে। উদাহরণস্বরূপ, ‘স্প্ল্যাশ’ চিত্রমালার তিন পর্বের ধারাক্রম ক্যালিফোর্নীয় জীবনধারার এক আদর্শ প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। যা আজও সাংস্কৃতিক কল্পনায় অমলিন।

ডেভিড হকনির আইকনিক মাস্টারপিস দ্য স্প্ল্যাশ, ১৯৬৭
জীবনভর নতুনত্বের সন্ধানে ছিলেন হকনি। ২০১১ সালে তিনি ‘আইপ্যাড ড্রইং’-এর ধারাবাহিক কাজ শুরু করেন, যেখানে তিনি উপলব্ধি, স্থান ও প্রযুক্তির পারস্পরিক সম্পর্ককে নতুনভাবে অনুসন্ধান করেন।
ডেভিড হকনির শিল্পশৈলী ও উল্লেখযোগ্য চিত্রকর্ম
ডেভিড হকনির ক্যানভাসে অ্যাক্রিলিক রঙের ধারাবাহিক ও সৃজনশীল ব্যবহার বিশেষভাবে লক্ষণীয়। সমতল রং, তীক্ষ্ণ রেখা এবং সুশৃঙ্খল বিন্যাসের মাধ্যমে তিনি ঘরোয়া ও সামাজিক জীবনের নানা মুহূর্তকে প্রাণবন্ত করে তুলতেন। তাঁর বহু চিত্রে বন্ধু, পরিবারের সদস্য এবং সমসাময়িক শিল্পীরা স্থান পেয়েছে। এধরনের বিষয়বস্তু নির্ধারণ প্রতিকৃতি শিল্পের প্রতি তাঁর দীর্ঘস্থায়ী আগ্রহ এবং মানবসম্পর্কের সূক্ষ্মতা ধারণ করার অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় বহন করে।
পপ আর্টের কিংবদন্তি ডেভিড হকনি: রং, প্রযুক্তি ও সুইমিংপুলের জাদুকর
পপ আর্ট আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব হকনি রয়্যাল কলেজ অব আর্টে অধ্যয়নকালেই খ্যাতি অর্জন করেন। পরবর্তী কয়েক দশকজুড়ে রঙের অভূতপূর্ব ব্যবহার, নিরন্তর পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং নতুন প্রযুক্তিকে সাদরে গ্রহণ করার মধ্য দিয়ে তিনি চারুকলা ও নকশাশিল্পে এক দূরদর্শী স্রষ্টা হিসেবে নিজস্ব উত্তরাধিকার নির্মাণ করেন। পোলারয়েড ক্যামেরা থেকে আইপ্যাড—প্রযুক্তির প্রতিটি নতুন সম্ভাবনাকে তিনি শিল্পসৃষ্টির উপাদানে রূপান্তরিত করেছিলেন।
১৯৬০ এর দশকের উদ্বেগহীন ক্যালিফোর্নীয় চেতনা তাঁর বিখ্যাত সুইমিং পুলভিত্তিক চিত্রকর্মগুলোতে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। এসব চিত্রকর্মে তখনকার দিনে বাড়ীর অন্দরমহলে থাকা সুইমিংপুলে উদযাপিত আধুনিক জীবনযাপন, অবসর এবং যুদ্ধোত্তর সমৃদ্ধির এক শক্তিশালী প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

ডিজাইন মিউজিয়ামের সংগ্রহে সংরক্ষিত একটি উল্লেখযোগ্য পোস্টার ১৯৮৪ সালের লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিক উপলক্ষে নির্মিত হয়েছিল। পোস্টারের নিচে টাইল-বিন্যস্ত নকশাটি হকনির লস অ্যাঞ্জেলেসের বাসার সুইমিংপুলের তলদেশে আঁকা চঞ্চল ঢেউ-প্যাটার্নের অনুপ্রেরণায় তৈরি। এটি সর্বশেষ ২০২৫ সালের প্রদর্শনী ‘Splash! A Century of Swimming and Style’-এ প্রদর্শিত হয়েছিল।
ডেভিড হকনির বিখ্যাত উক্তি
পৃথিবীটা খুব, খুব সুন্দর যদি তুমি সত্যিই দেখে থাকো। বেশিরভাগ লোক খুব বেশি দেখে না। দেখতে চায় না। তারা শুধু তাদের সামনের মাটিটুকু স্ক্যান করে যাতে হাঁটতে পারে কিন্তু তারা জিনিসগুলোকে সত্যিই অত্যন্ত তীক্ষ্মভাবে, গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখে না। আমি দেখি আর এই কথাটা আমি সবসময় জানতাম।
বর্তমান মুহূর্তের পক্ষে সোচ্চার ছিলেন ডেভিড হকনি
হকনি বর্তমান মুহূর্তের এক অনুরাগী রক্ষক ছিলেন। দ্য টেলিগ্রাফকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “এটা সময়ের প্রতি এক ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি। আমার কাছে সেই দৃষ্টিভঙ্গিটাই আছে। আমরা সবাই একটি জীবনকাল পাই। সেগুলো ভিন্নরকমের আলাদা রঙের কিন্তু আমরা সবাই একটি করে জীবন পাই।”
দীর্ঘায়ুতে obsessed এমন একটি সংস্কৃতি সম্পর্কে তিনি সন্দেহপ্রকাশ করেছিলেন। একজন ব্যক্তিস্বাধীনতার সমর্থক হকনি প্রশ্ন তোলেন, “কেন এখন সবকিছু দীর্ঘায়ুর দিকে ধাবিত হচ্ছে? সবকিছু যদি দীর্ঘায়ুর দিকেই পরিচালিত হয়, তাহলে তুমি জীবনকে অস্বীকার করছ। কেবল ‘বর্তমান’-ই আছে।”
হকনির শিল্পসাধনা
সত্যিকারের একজন উদ্ভাবক হিসেবে হকনি রং, আকার ও রেখা নিয়ে বিভিন্ন মাধ্যম এবং নতুন প্রযুক্তিতে নিরন্তর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে গেছেন। এভাবেই নিজের দৃষ্টিভঙ্গিকে ক্রমাগত প্রসারিত করেছেন এবং শিল্পের প্রচলিত সীমারেখাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। তাঁর শিল্পকর্ম মূলত ‘দেখার প্রক্রিয়া’ এবং সেই দেখার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বিস্ময়, আনন্দ ও মানবিক সংবেদনশীলতারই এক অনন্য উদ্যাপন। তাঁর তুলির আঁচড়ে পৃথিবী যেন নতুন করে দৃশ্যমান হয়ে উঠত, আর সেই কারণেই ডেভিড হকনি কেবল একজন শিল্পী নন, তিনি ছিলেন দেখার এক নতুন ভাষার নির্মাতা।
তার উল্লেখযোগ্য কিছু চিত্রকর্ম:
১. মি. অ্যান্ড মিসেস ক্লার্ক অ্যান্ড পার্সি (১৯৭০–১৯৭১)

২. পোর্ট্রেট অব অ্যান আর্টিস্ট (১৯৭২)

৩. জর্জ লসন অ্যান্ড ওয়েইন স্লিপ (১৯৭২–১৯৭৫)

৪. আমেরিকান কালেক্টরস (ফ্রেড অ্যান্ড মার্সিয়া ওয়েইসম্যান) [১৯৬৮]

৫. হেনরি গেল্ডজাহলার অ্যান্ড ক্রিস্টোফার স্কট (১৯৬৯)

৬. মডেল উইথ আনফিনিশড সেলফ পোর্ট্রেট (১৯৭৭)

৭. বেভারলি হিলস হাউজওয়াইফ (১৯৬৬-১৯৬৭)

৮. দ্য রুম, তারজানা (১৯৬৭)

৯. মাই পেরেন্টস (১৯৭৭)

১০. লে পার্ক দে সোর্স, ভিচি (১৯৭০)
