আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ক্রাইম ক্রনিকল
জাপানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় কিউশু দ্বীপে মঙ্গলবার স্থানীয় সময় বিকেল ৪টা ২৭ মিনিটে ৭ দশমিক ১ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। জাপান আবহাওয়া সংস্থার তথ্যমতে, ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল ছিল কুমামোতো শহর থেকে প্রায় ১২ মাইল দক্ষিণে উকি শহরে, মাত্র ১০ কিলোমিটার গভীরতায়—যে কারণে এর কম্পন ছিল ব্যাপক তীব্র এবং কয়েকটি এলাকায় জাপানের ভূকম্পন মাত্রার সর্বোচ্চ রিডিং রেকর্ড করা হয়।
ভূমিকম্পের পরপরই কুমামোতোর ইয়াতসুশিরো শহরের একটি শপিং মলে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছে রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম এনএইচকে। বিস্ফোরণে মলের দ্বিতীয় তলা ধসে পড়ে এবং বহু মানুষ ভেতরে আটকা পড়েন।

নিপ্পন পেপার ইন্ডাস্ট্রিজের ইয়াতসুশিরো কারখানায় একটি চিমনি ধসে পড়ার পর বেশ কয়েকজন নিখোঁজ রয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ছবি: রয়টার্স
স্থানীয় পুলিশের বরাত দিয়ে বেসরকারি সম্প্রচার মাধ্যম টিবিএস জানিয়েছে, বিস্ফোরণের ফলে "বেশ কয়েকজন" নিহত হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে, যদিও প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি সাংবাদিকদের বলেন, প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা ও ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ চিত্র এখনো নিরূপণ করা যায়নি। মলের ২০ থেকে ৩০ জন কর্মীর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছে এনএইচকে।
এনএইচকের তথ্যমতে, শুধু এই শপিং মলই নয়, ইয়াতসুশিরো শহরে অন্তত ১২টি ভবন ধসে পড়েছে, যার মধ্যে চারটি ক্ষেত্রে মানুষ এখনো ভেতরে আটকা রয়েছে বলে জানা গেছে। এছাড়া প্রদেশজুড়ে অন্তত সাতটি স্থানে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে।
প্রাথমিক তথ্যমতে অন্তত ৫০ জন আহত হয়েছেন। ভূমিকম্পের পর কুইউশু ইলেকট্রিক পাওয়ারের তথ্য অনুযায়ী প্রায় ৪৬ হাজার পরিবার বিদ্যুৎবিহীন হয়ে পড়ে, যদিও ধীরে ধীরে সরবরাহ পুনরায় চালু হচ্ছে।

ভূমিকম্পের ঝাঁকুনিতে ১৭ শতকের ঐতিহাসিক কুমামোতো দুর্গের দেয়ালগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ছবি: রয়টার্স
ভূমিকম্পে একটি মহাসড়কের সেতু বেঁকে যায়, রেললাইনের একটি মালবাহী ট্রেন লাইনচ্যুত হয় এবং ঐতিহাসিক কুমামোতো দুর্গের একাংশের পাথরের দেয়াল ধসে পড়ে। ১৬০৭ সালে নির্মিত এই দুর্গটি জাপানের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র।
নিরাপত্তাজনিত কারণে কিউশু অঞ্চলে শিনকানসেন বুলেট ট্রেনসহ স্থানীয় ট্রেন সার্ভিস সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে এবং আসো কুমামোতো বিমানবন্দরের রানওয়ে বন্ধ রাখা হয়েছে, যা শিগগির চালুর কোনো সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
ভূমিকম্পের পরপরই আরিয়াকে ও ইয়াতসুশিরো সাগর উপকূলে সুনামি সতর্কতা জারি করা হলেও প্রায় এক ঘণ্টার মধ্যেই তা প্রত্যাহার করা হয়। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থার তথ্যমতে, প্রায় তিন লাখ মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। উদ্ধার তৎপরতায় শত শত সেনা মোতায়েন করা হয়েছে, পাশাপাশি দমকল বাহিনী ও কোস্ট গার্ডও কাজ করছে।
প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ এক বার্তায় ভূমিকম্প-কবলিত এলাকার বাসিন্দাদের একই মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্পের সম্ভাবনা সম্পর্কে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান এবং জানান, সরকার দ্রুততম সময়ে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র নিরূপণে কাজ করছে।
কুমামোতোতে কারখানা রয়েছে এমন বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সনি ও বিশ্বের বৃহত্তম চিপ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান টিএসএমসি অন্যতম। টিএসএমসি জানিয়েছে, তাদের কুমামোতো কেন্দ্রের সব কর্মী নিরাপদ আছেন এবং ভূমিকম্প-পরবর্তী কাঠামোগত পরিদর্শন সম্পন্ন হয়েছে। সনি ও ফুজিফিল্মও তাদের কর্মীদের কারখানা থেকে সরিয়ে নিয়েছে বলে জানিয়েছে নিক্কেই।
জাপান বিশ্বের সবচেয়ে ভূমিকম্পপ্রবণ দেশগুলোর একটি, যেখানে "রিং অব ফায়ার"-এ অবস্থানের কারণে একাধিক টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে প্রায় প্রতিনিয়ত কম্পন অনুভূত হয়। উল্লেখ্য, ২০১৬ সালে কুমামোতো অঞ্চলে সংঘটিত একাধিক ভূমিকম্পে প্রায় ৩০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল এবং ২ লক্ষাধিক বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।