পরিবেশ ডেস্ক | ক্রাইম ক্রনিকল
লিখেছেন নুরুন্নাহার হোসেন

জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়; এটি বাংলাদেশের প্রতিদিনের বাস্তবতা। একসময় মৌসুমি বৈচিত্র্যের জন্য পরিচিত এই ভূখণ্ডে এখন ঋতুচক্রের স্বাভাবিক ছন্দ ক্রমেই ভেঙে পড়ছে। কখনও দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ, কখনও অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত, আবার কখনও আকস্মিক বন্যা, ঘূর্ণিঝড় কিংবা নদীভাঙন দেশের অর্থনীতি, কৃষি, জনস্বাস্থ্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর বহুমাত্রিক চাপ সৃষ্টি করছে। ভৌগোলিক অবস্থান, ঘনবসতি এবং জলবায়ু-নির্ভর অর্থনীতির কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বিবেচিত হলেও, বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে দেশের অবদান অত্যন্ত সামান্য। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে কঠিন মূল্য দিতে হচ্ছে এই দেশকেই।

কৃষিতে জলবায়ুর অভিঘাত: খাদ্যনিরাপত্তার নতুন সংকট

বাংলাদেশের অর্থনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি কৃষি। দেশের বিপুল জনগোষ্ঠী প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু গত এক দশকে আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা কৃষিকে ক্রমেই ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

উপকূলীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং লবণাক্ততার বিস্তারের ফলে ধান, শাকসবজি ও ফলমূলের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাচ্ছে। একসময় যেখানে বছরে একাধিক ফসল উৎপাদন সম্ভব ছিল, সেখানে এখন অনেক জমি মৌসুমি পতিত থাকছে। অন্যদিকে উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী খরা, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া এবং সেচ ব্যয়ের বৃদ্ধি কৃষকদের উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে।

অস্বাভাবিক বর্ষণ ও আকস্মিক বন্যা ধান, ভুট্টা ও সবজি চাষে বড় ধরনের ক্ষতি করছে। মৌসুমের বাইরে অতিবৃষ্টি কিংবা ফুল ফোটার সময় তাপমাত্রার অস্বাভাবিক ওঠানামা ফসলের পরাগায়ন ব্যাহত করছে। ফলে শুধু উৎপাদনই কমছে না, কৃষকের আয়ও অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। এর প্রভাব জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তা এবং খাদ্যমূল্যের স্থিতিশীলতার ওপরও পড়ছে।

জনস্বাস্থ্যে নতুন হুমকি

জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে কম আলোচিত অথচ দ্রুত বিস্তৃত প্রভাবগুলোর একটি হলো জনস্বাস্থ্য। উচ্চ তাপমাত্রা ও দীর্ঘ তাপপ্রবাহ বৃদ্ধ, শিশু, গর্ভবতী নারী এবং শ্রমজীবী মানুষের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে। অতিরিক্ত তাপের কারণে হিট স্ট্রোক, পানিশূন্যতা, কিডনি-সংক্রান্ত জটিলতা এবং হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে।

অন্যদিকে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা মশাবাহিত রোগের বিস্তারে সহায়ক পরিবেশ তৈরি করছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডেঙ্গুর বিস্তার রাজধানী ঢাকা ছাড়িয়ে দেশের বিভিন্ন জেলা ও গ্রামীণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে নগরায়ন ও অপরিকল্পিত পানি ব্যবস্থাপনার সম্পর্ককে স্পষ্ট করেছে।

বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের পর নিরাপদ পানির সংকট সৃষ্টি হওয়ায় ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েড এবং বিভিন্ন চর্মরোগের প্রকোপও বেড়ে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ভবিষ্যতে সংক্রামক রোগের ভৌগোলিক বিস্তার আরও পরিবর্তিত হতে পারে।

জীববৈচিত্র্যের অবক্ষয়: নীরবে হারিয়ে যাচ্ছে প্রাকৃতিক সম্পদ

বাংলাদেশের বন, নদী, হাওর, বিল, চর ও জলাভূমি শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ নয়; এগুলো দেশের পরিবেশগত ভারসাম্যের মূল ভিত্তি। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এসব বাস্তুতন্ত্র দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে।

তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং জলপ্রবাহের পরিবর্তনের ফলে বহু দেশীয় মাছ, উভচর প্রাণী, পাখি ও উদ্ভিদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংকুচিত হচ্ছে। জলাভূমি শুকিয়ে যাওয়া কিংবা দীর্ঘ সময় পানিতে ডুবে থাকার কারণে অনেক প্রজাতির প্রজনন চক্র ব্যাহত হচ্ছে।

বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনও ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়ের কারণে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। রয়েল বেঙ্গল টাইগারসহ বহু বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল পরিবর্তিত হচ্ছে এবং বনজ উদ্ভিদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে। এই পরিবর্তন শুধু জীববৈচিত্র্যের জন্য নয়, উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে সুরক্ষার ক্ষেত্রেও বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।

অর্থনীতি ও অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি

জলবায়ু পরিবর্তনের অর্থনৈতিক প্রভাব দিন দিন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। প্রতি বছর বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন ও জলোচ্ছ্বাসের কারণে অবকাঠামো, কৃষিজমি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ব্যাপক ক্ষতি হয়। এসব ক্ষতি মোকাবিলায় সরকারকে পুনর্বাসন ও পুনর্গঠনে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়, যা উন্নয়নের অন্যান্য খাতে বিনিয়োগের সুযোগ সীমিত করে।

একই সঙ্গে জীবিকা হারিয়ে বহু মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহরে পাড়ি জমাচ্ছেন। জলবায়ুজনিত এই অভ্যন্তরীণ স্থানান্তর বড় শহরগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। বস্তির বিস্তার, কর্মসংস্থানের সংকট, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং সামাজিক বৈষম্য আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

অভিযোজনই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব নয়; তবে কার্যকর অভিযোজনের মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। এজন্য জলবায়ু-সহনশীল ধান ও অন্যান্য ফসলের জাত উদ্ভাবন, আধুনিক সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, বন ও জলাভূমি পুনরুদ্ধার, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার এবং বিজ্ঞানভিত্তিক দুর্যোগ পূর্বাভাস ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।

একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, গণমাধ্যম, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এবং সাধারণ মানুষের সমন্বিত অংশগ্রহণ ছাড়া টেকসই সমাধান সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন ও প্রযুক্তি সহায়তা নিশ্চিত করাও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।


জলবায়ু পরিবর্তন কেবল একটি পরিবেশগত সমস্যা নয়; এটি কৃষি, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি জাতীয় উন্নয়ন সংকট। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য বাংলাদেশের দায় সীমিত হলেও এর প্রভাব মোকাবিলায় দেশকে প্রতিনিয়ত বড় মূল্য দিতে হচ্ছে। তাই বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা, দীর্ঘমেয়াদি নীতি, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সমন্বয়েই একটি জলবায়ু-সহনশীল বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।