পরিবেশ ডেস্ক | ক্রাইম ক্রনিকল
বাংলাদেশে বনভূমি সংকোচনের প্রবণতা থামছে না। গত এক দশকে দেশে বনভূমি কমেছে প্রায় ১ লাখ ১ হাজার হেক্টর, যা আয়তনে ঢাকা শহরের প্রায় সাড়ে তিন গুণ। একই সময়ে হারিয়ে গেছে ৬৪ প্রজাতির বৃক্ষ এবং কমেছে প্রায় ১২ কোটি গাছ। বন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত নগরায়ণ, অবকাঠামো নির্মাণ, বনভূমি দখল, একমুখী বাণিজ্যিক চাষাবাদ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাবে দেশের প্রাকৃতিক বনভূমি ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।
সম্প্রতি বন অধিদপ্তরের জাতীয় বন জরিপ, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস), জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং পরিবেশবিষয়ক বিভিন্ন গবেষণা ও সেমিনারে প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণে এ চিত্র উঠে এসেছে।
জাতীয় বন জরিপ অনুযায়ী, ২০১৫ সালে দেশে বন আচ্ছাদনের হার ছিল ১২ দশমিক ৭৬ শতাংশ। ২০২৪ সালের সর্বশেষ জরিপে তা কমে দাড়িয়েছে ১২ দশমিক ১১ শতাংশে। বনভূমির পরিমাণও ১৮ লাখ ৮৪ হাজার হেক্টর থেকে কমে হয়েছে ১৭ লাখ ৮৪ হাজার হেক্টর। অর্থাৎ এক দশকে হারিয়েছে প্রায় ১ লাখ ১ হাজার হেক্টর বনভূমি।
জরিপে আরও দেখা গেছে, ২০১৫ সালে দেশে মোট গাছের সংখ্যা ছিল ১৬৯ কোটি। বর্তমানে তা কমে হয়েছে ১৫৭ কোটি। একই সময়ে ৩৯০টি গাছের প্রজাতির মধ্যে ৬৪টি প্রজাতি আর শনাক্ত হয়নি। বর্তমানে দেশে বিদ্যমান গাছের প্রজাতির সংখ্যা ৩২৬টি।
বিবিএসের ‘পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগ পরিসংখ্যান শক্তিশালীকরণ’ প্রকল্পের আওতায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৫ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে দেশের বনভূমি ৫ দশমিক ৪১ শতাংশ কমেছে। বনাঞ্চলের আয়তন ১৮ হাজার ৪৯৯ বর্গকিলোমিটার থেকে কমে হয়েছে ১৭ হাজার ৪৯৮ বর্গকিলোমিটার। একই সময়ে কৃষিজমিও কমেছে প্রায় ১ হাজার ৪৭১ বর্গকিলোমিটার বা ১ দশমিক ৯৮ শতাংশ।
তবে এই সময়ে সামাজিক বনায়নের আওতায় কৃত্রিমভাবে সৃজিত বন ২৭ দশমিক ৩৬ শতাংশ বেড়েছে। ২০১৫ সালে এর পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৩৪১ বর্গকিলোমিটার, যা ২০২৩ সালে বেড়ে হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৭০৮ বর্গকিলোমিটার। বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক বনায়ন বাড়লেও তা প্রাকৃতিক বনভূমির বিকল্প হতে পারে না, কারণ প্রাকৃতিক বনের জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশগত সেবা অনেক বেশি।
এফএওর তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশে বনভূমি কমেছে প্রায় ৬৫ হাজার হেক্টর। একই সময়ে কৃষিজমিও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। বিশ্বের যে ১৭টি দেশে বনভূমি ও কৃষিজমি—উভয়ই কমেছে, বাংলাদেশ তাদের মধ্যে অন্যতম। বৈশ্বিকভাবে বন উজাড় হওয়া ভূমির বড় অংশ কৃষিজমিতে রূপান্তরিত হলেও বাংলাদেশে বন ও কৃষিজমি—দুটোই কমছে।
ছবি সূত্র: বনবিভাগ
পরিবেশবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের মতে, বনভূমি সংকোচনের সবচেয়ে বড় চাপ এখন পার্বত্যাঞ্চলে। জাতীয় বন জরিপে দেখা গেছে, দেশের মোট বনভূমির বড় অংশ থাকা এই অঞ্চলে দ্রুত বাড়ছে রাবার, কাজু, ড্রাগন ফলসহ একমুখী বাণিজ্যিক চাষাবাদ। পাশাপাশি সড়ক সম্প্রসারণ, রিসোর্ট নির্মাণ এবং অবৈধ দখলের কারণে প্রাকৃতিক বন দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে।
বন অধিদপ্তরের সাবেক বিভাগীয় বন কর্মকর্তা জহির ইকবাল বলেন, পার্বত্যাঞ্চলে একদিকে বন উজাড় হচ্ছে, অন্যদিকে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের কারণে পুনর্বনায়নও করা যাচ্ছে না। ফলে সেখানে বনভূমি হ্রাসের হার সবচেয়ে বেশি।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সের অধ্যাপক কামাল হোসাইন বলেন, পার্বত্য অঞ্চলে প্রাকৃতিক বন ধ্বংস করে রাবার, কাজু ও বিভিন্ন অর্থকরী ফসলের চাষ দ্রুত বাড়ছে। পাশাপাশি সড়ক নির্মাণ ও পর্যটনকেন্দ্র সম্প্রসারণও বন ধ্বংসে ভূমিকা রাখছে।
পরিবেশ অধিদপ্তর, সেন্টার ফর ন্যাচারাল রিসোর্স স্টাডিজ (সিএনআরএস) এবং বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) এক সেমিনারে জানানো হয়, বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে ২ দশমিক ৬ শতাংশ হারে বনভূমি কমছে, যা বৈশ্বিক গড়ের প্রায় দ্বিগুণ। বর্তমানে দেশের মোট ভূমির প্রায় ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ বনাঞ্চল থাকলেও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় অন্তত ২৫ শতাংশ বনভূমি প্রয়োজন বলে মত দেন বিশেষজ্ঞরা।
সেমিনারে আরও জানানো হয়, দেশের প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বনসম্পদের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু বনভূমি দখল, চিংড়ি ও লবণচাষের সম্প্রসারণ, অবকাঠামো নির্মাণ, শিল্পায়ন এবং অপরিকল্পিত ভূমি ব্যবহারের কারণে বন ও জীববৈচিত্র্য ক্রমেই হুমকির মুখে পড়ছে। সুন্দরবনও জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, শিল্পায়ন এবং ‘টপ ডাইং’ রোগসহ নানা সংকটে রয়েছে।
বন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বন সংরক্ষণে আইন ও নীতিমালা থাকলেও বাস্তবায়নের ঘাটতি রয়েছে। সংরক্ষিত বনাঞ্চলে অবৈধ দখল, অননুমোদিত স্থাপনা নির্মাণ এবং প্রাকৃতিক বনকে বাণিজ্যিক বাগানে রূপান্তরের প্রবণতা বন্ধ না হলে আগামী বছরগুলোতে বনভূমি ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষয় আরও ত্বরান্বিত হবে। তাদের মতে, প্রাকৃতিক বন পুনরুদ্ধার, বন দখল বন্ধ, পার্বত্যাঞ্চলে টেকসই ভূমি ব্যবস্থাপনা এবং বননির্ভর জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ কার্যক্রম গ্রহণের বিকল্প নেই।