আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ক্রাইম ক্রনিকল
তুরস্কে ন্যাটো সম্মেলন শেষে দেশে ফেরার সময় ইরানি হুমকি এড়াতে গোপনে বিমান পরিবর্তন করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ সময় সাংবাদিকদের বহনকারী এয়ার ফোর্স ওয়ানকে ব্যবহার করা হয় ছদ্মবেশী বিমান হিসেবে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে এই দাবি করা হয়েছে। পরে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, সিবিএস নিউজ ও সিএনএনও একই তথ্য জানিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘটনাটি ঘটে গত ৮ জুলাই আঙ্কারা বিমানবন্দরে। এর আগে গ্রীষ্মে ইরানি লক্ষ্যবস্তুতে মার্কিন হামলার পর গোয়েন্দা কর্মকর্তারা প্রেসিডেন্টের চলাচল ঘিরে সুনির্দিষ্ট একটি হুমকি শনাক্ত করেন বলে জানা গেছে।

তুরস্কের বিমানঘাঁটিতে ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’ বিমানের পাশে দুটি ক্যাটারিং কন্টেইনার (খাবারের পাত্র) দেখা যাচ্ছে। ছবি: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস
যেভাবে সাজানো হয় পরিকল্পনা
ন্যাটো সম্মেলনে যোগ দিতে ট্রাম্প আঙ্কারায় গিয়েছিলেন কাতারের উপহার দেওয়া নতুন বোয়িং ৭৪৭-৮ উড়োজাহাজে। সংস্কারের পর সেটির প্রথম আন্তর্জাতিক সফর ছিল এটি।
ফেরার সময় হোয়াইট হাউস জানায়, যাত্রার প্রথম ধাপে অর্থাৎ আঙ্কারা থেকে যুক্তরাজ্য পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ানে যাবেন। ট্রাম্প নিজে তখন কারণ হিসেবে বলেছিলেন, পুরোনো দিনের স্মৃতির টানেই এই সিদ্ধান্ত এবং যুক্তরাজ্যের ঘাঁটিতে থাকা সেনাসদস্যরা নতুন উড়োজাহাজটি ঘুরে দেখার সুযোগ পাবেন।
তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিরাপত্তাজনিত কারণেই সিক্রেট সার্ভিস পুরোনো উড়োজাহাজটি ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছিল।
সাংবাদিকদের ধারণ করা ফুটেজে দেখা যায়, প্রেসিডেন্ট সিঁড়ি বেয়ে পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ানে ওঠেন। ওই সময় উড়োজাহাজটির অন্য পাশে দাঁড়িয়ে ছিল একটি খাবারবাহী গাড়ি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওঠার কয়েক মিনিট পর কয়েকজন সহযোগীসহ ট্রাম্প উড়োজাহাজের বিপরীত পাশের একটি দরজা দিয়ে ওই গাড়িতে নেমে যান। গাড়িটি নিচে নামিয়ে ট্যাক্সিওয়ে পেরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় কাছাকাছি দাঁড়ানো একটি সি-৩২এ উড়োজাহাজের কাছে।
মার্কিন বিমানবাহিনীর এই সি-৩২এ আসলে বোয়িং ৭৫৭-এর সামরিক সংস্করণ, যা সাধারণত ভাইস প্রেসিডেন্ট ও জ্যেষ্ঠ মন্ত্রিসভা সদস্যদের চলাচলে ব্যবহৃত হয়।
অন্ধকারে ছিলেন সাংবাদিক ও কর্মীরা
এদিকে গণমাধ্যমকর্মী ও হোয়াইট হাউসের কর্মীরা পুরোনো ৭৪৭ উড়োজাহাজেই ওঠেন। তাঁরা ধরে নিয়েছিলেন, প্রেসিডেন্ট ভেতরেই আছেন।

তুরস্কে অনুষ্ঠিত ন্যাটো সম্মেলন শেষে ওয়াশিংটনে ফিরে ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’ হিসেবে ব্যবহৃত কাতারের উপহার দেওয়া বিমানটি থেকে নামছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ছবি: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস
উড্ডয়নের আগে সাংবাদিকদের জানালার পর্দা নামিয়ে রাখতে বলা হয়। কেন এই নির্দেশ, জানতে চাইলে ট্রাম্প পরে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, যাদের সঙ্গে তাঁদের কারবার করতে হয় তাদের কারণে ফ্লাইটটি সম্ভবত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল।
সি-৩২এ উড়োজাহাজে করে ট্রাম্প যুক্তরাজ্যে পৌঁছান স্থানীয় সময় রাত ১০টা ২০ মিনিটে। কয়েক মিনিট পরই সাংবাদিকদের বহনকারী পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ান অবতরণ করে।
সেখান থেকেই কাতারের দেওয়া নতুন উড়োজাহাজে উঠে ওয়াশিংটনের পথে রওনা হন তিনি। রাত ১০টা ৫৬ মিনিটে তাঁকে উড়োজাহাজ থেকে নামতে দেখা যায় বলে সফরসঙ্গী সাংবাদিকরা জানিয়েছেন।
তবে পুরোনো এয়ার ফোর্স ওয়ান থেকে তিনি কীভাবে সি-৩২এ-তে ফিরলেন বা যুক্তরাজ্যে কীভাবে বিমান বদল করলেন, সেই বিস্তারিত এখনো স্পষ্ট নয়।
প্রশ্ন উঠছে স্বচ্ছতা নিয়ে
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সাংবাদিক বারবারা স্টার প্রশ্ন তুলেছেন, ইরান যদি প্রেসিডেন্টকে ওই উড়োজাহাজে আছেন বলে মনে করত, তাহলে ছদ্মবেশী উড়োজাহাজের যাত্রীরাও কি একই ঝুঁকিতে ছিলেন না।
প্রতিবেদনে ইরানি হুমকিটির ধরন সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু বলা হয়নি। তবে গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে জানা গেছে, হুমকিটি কেবল কাতারের দেওয়া নতুন উড়োজাহাজকে ঘিরে ছিল না; ট্রাম্প কোন উড়োজাহাজে চড়ছেন তা নির্বিশেষে তাঁকেই লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছিল বলে ধারণা করা হয়।
এ ধরনের কৌশল অবশ্য নজিরবিহীন নয়। ২০০০ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনও একবার নিরাপত্তাজনিত কারণে চিহ্নহীন একটি নির্বাহী উড়োজাহাজ ব্যবহার করেছিলেন।