নিজস্ব প্রতিবেদক | ক্রাইম ক্রনিকল ডেস্ক
আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে সংঘটিত শতাধিক গুম, খুন ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এক চাঞ্চল্যকর সাক্ষ্যপ্রমাণ মিলেছে। ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর এডভোকেট আমিনুল ইসলাম দাবি করেছেন, জিয়াউল আহসানের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের জাল বা 'কিলিং নেটওয়ার্ক' কেবল বাংলাদেশেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা ভারত পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
রোববার (২১ জুন) দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে চিফ প্রসিকিউটর এই বিস্ফোরক দাবি করেন। তিনি জানান, ট্রাইব্যুনালে জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে চলমান মামলায় একজন প্রত্যক্ষদর্শী সেনা কর্মকর্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও লোমহর্ষক জবানবন্দি দিয়েছেন, যার বিবরণ এখনো চলমান রয়েছে।
সাক্ষী দেওয়া সেই সেনা কর্মকর্তার জবানবন্দির বরাত দিয়ে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম ট্রাইব্যুনালের সামনে ঘটে যাওয়া 'জাফলং অপারেশন'-এর এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেন। তিনি জানান, তৎকালীন সময়ে র্যাবের টিএফআই (টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন) সেল থেকে দু'জন আসামিকে নিয়ে জিয়াউল আহসানের নেতৃত্বে সাক্ষীসহ কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা সিলেটের জাফলং সীমান্তে যান। একই সময়ে ভারতের অভ্যন্তর থেকে সাদা পোশাকে আসা কিছু ব্যক্তি আরও দু'জন আসামিকে নিয়ে জাফলং সীমান্তে হাজির হন। সেখানে অত্যন্ত গোপনে দু'পক্ষের মধ্যে আসামিদের এক বিনিময় বা হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
চিফ প্রসিকিউটর জানান, জবানবন্দি অনুযায়ী ভারত থেকে আনা ওই দু'জন ব্যক্তিকে হস্তান্তরের পর জিয়াউল আহসান নিজেই রাস্তার মাথায় অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় গুলি চালিয়ে হত্যা করেন। ভারতের সীমান্ত পেরিয়ে আসা ওই সাদা পোশাকের ব্যক্তিরা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল নাকি কোনো আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ছিলেন, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে ভারতের ওই ব্যক্তিদের সাথে জিয়াউল আহসানের অনুসারীদের গভীর যোগাযোগ ছিল। এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই প্রসিকিউশন মনে করছে যে, ভারত ও বাংলাদেশ মিলিয়ে একটি শক্তিশালী কিলিং নেটওয়ার্ক পরিচালনা করতেন জিয়াউল আহসান। অবশ্য ভারত থেকে এনে হত্যা করা ওই দু'জন ব্যক্তি বাংলাদেশের নাকি ভারতের নাগরিক ছিলেন, তা এখনো যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ট্রাইব্যুনালে দেওয়া সাক্ষ্যের আরেকটি ভয়াবহ দিক উল্লেখ করে চিফ প্রসিকিউটর জানান, বিডিআর (বর্তমান বিজিবি) সদস্যদের ধরে এনে সুপরিকল্পিতভাবে দু'টি নির্মম পদ্ধতিতে হত্যা করতেন জিয়াউল আহসান। এর একটি পদ্ধতি ছিল শরীরে বিষাক্ত ইনজেকশন পুশ করা এবং অন্যটি ছিল মাথায় সরাসরি পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করা। এভাবে হত্যার পর লাশগুলো নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হতো। ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত হয়ে সাক্ষী জানিয়েছেন যে, এই দুই নির্মম প্রক্রিয়া ব্যবহার করে প্রায় ১০ থেকে ১২ জন বিডিআর সদস্যকে জিয়াউল আহসান নিজে হত্যা করেছেন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাবেক এই প্রভাবশালী সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আসা এসব লোমহর্ষক তথ্য ও সাক্ষ্যপ্রমাণ দেশের অপরাধ ইতিহাসে এক নতুন ও অন্ধকার অধ্যায়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ঘটনার গভীরতা এবং আন্তঃদেশীয় কিলিং নেটওয়ার্কের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি প্রসিকিউশন পক্ষ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখছে বলে ব্রিফিংয়ে জানানো হয়।