নিজস্ব প্রতিবেদক | ক্রাইম ক্রনিকল


বাংলা সাহিত্য ও সঙ্গীতের ইতিহাসে এমন কিছু নাম রয়েছে, যাদের সৃষ্টি সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে। কান্তকবি রজনীকান্ত সেন সেই বিরল কৃতিমানদের একজন। ভক্তিমূলক গান, দেশাত্মবোধক সঙ্গীত, নীতিকবিতা ও ব্যঙ্গরসের মাধ্যমে তিনি বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছেন এক অনন্য উচ্চতায়। মাত্র ৪৫ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনে তিনি যে সৃষ্টিসম্ভার রেখে গেছেন, তা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ও হৃদয়স্পর্শী।


১৮৬৫ সালের ২৬ জুলাই তৎকালীন পাবনা জেলার (বর্তমান সিরাজগঞ্জ) ভাঙ্গাবাড়ী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন রজনীকান্ত সেন। তাঁর বাবা গুরুপ্রসাদ সেন ছিলেন সাহিত্য ও সঙ্গীতপ্রেমী, আর মা মনোমোহিনী দেবীও ছিলেন বাংলা সাহিত্যের অনুরাগী। পরিবার থেকেই তিনি সাহিত্য, সঙ্গীত ও সংস্কৃতির প্রতি গভীর অনুরাগ লাভ করেন।


শৈশব থেকেই তাঁর মেধা ও সৃজনশীলতার পরিচয় প্রকাশ পেতে শুরু করে। রাজশাহী কলেজ থেকে এফএ এবং পরে কলকাতার সিটি কলেজ থেকে বিএ ও বিএল ডিগ্রি অর্জনের পর আইন পেশায় যুক্ত হলেও তাঁর মন পড়ে থাকত সাহিত্য ও সঙ্গীতের জগতে। শেষ পর্যন্ত আইনজীবী হিসেবে নয়, বরং কবি, গীতিকার ও সুরস্রষ্টা হিসেবেই তিনি বাঙালির হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নেন।


রজনীকান্ত সেনের সাহিত্য ও সঙ্গীতের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল সহজ-সরল ভাষা, গভীর মানবিকতা এবং আধ্যাত্মিক অনুভব। তাঁর গান মূলত ভক্তিমূলক, দেশাত্মবোধক, প্রীতিমূলক ও হাস্যরসাত্মক—এই চার ধারায় বিভক্ত। তবে ভক্তিমূলক ও দেশাত্মবোধক গানই তাঁকে সর্বাধিক জনপ্রিয়তা এনে দেয়।


বাংলার স্বদেশী আন্দোলনের সময় তাঁর লেখা ‘মায়ের দেওয়া মোটা কাপড় মাথায় তুলে নেরে ভাই’ গানটি আন্দোলনকারীদের অনুপ্রেরণার অন্যতম উৎসে পরিণত হয়। দেশীয় পণ্যের ব্যবহার এবং আত্মনির্ভরতার আহ্বান জানিয়ে গানটি মানুষের মধ্যে দেশপ্রেম ও আত্মমর্যাদাবোধ জাগিয়ে তোলে। একইভাবে ‘আমরা নেহাত গরীব, আমরা নেহাত ছোট’ গানেও তিনি জাতীয় ঐক্য ও আত্মবিশ্বাসের বার্তা তুলে ধরেন।


অন্যদিকে তাঁর ভক্তিমূলক গান বাংলা সঙ্গীতের এক অমূল্য সম্পদ। ‘তুমি নির্মল কর মঙ্গল করে’, ‘তোমারি দেওয়া প্রাণে’, ‘আমায় সকল রকমে কাঙাল করেছে’—এসব গান কেবল ধর্মীয় আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং মানুষের আত্মসমর্পণ, বিনয়, দুঃখবোধ ও সৃষ্টিকর্তার প্রতি গভীর বিশ্বাসের শিল্পিত প্রকাশ।


কবিতায়ও তিনি ছিলেন সমান শক্তিশালী। সমাজের কুসংস্কার, ভণ্ডামি ও অসংগতিকে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন দক্ষতার সঙ্গে। আবার শিশুদের জন্য সহজ ভাষায় নীতিকবিতাও রচনা করেছেন, যা দীর্ঘদিন পাঠকপ্রিয় ছিল।


তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘বাণী’ (১৯০২), ‘কল্যাণী’ (১৯০৫) এবং ‘অমৃত’ (১৯১০)। মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয় ‘অভয়া’, ‘আনন্দময়ী’, ‘বিশ্রাম’, ‘সদ্ভাবকুসুম’ ও ‘শেষদান’। তাঁর গানের সংকলন ‘কান্তগীতি’ আজও বাংলা সঙ্গীতের অন্যতম মূল্যবান সম্পদ হিসেবে বিবেচিত।


জীবনের শেষ অধ্যায় ছিল বেদনাময়। ১৯০৯ সালে তিনি কণ্ঠনালীর ক্যানসারে আক্রান্ত হন। চিকিৎসার জন্য কলকাতায় ভর্তি হলেও অস্ত্রোপচারের পর বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেন। কিন্তু শারীরিক দুর্বলতা তাঁর সৃজনশীলতাকে থামিয়ে দিতে পারেনি। অসহনীয় যন্ত্রণা সহ্য করেও তিনি লিখে গেছেন অসংখ্য কালজয়ী গান ও কবিতা, যা আজও মানুষের হৃদয়ে সমান আবেদন নিয়ে বেঁচে আছে।


তাঁর সাহিত্যপ্রতিভার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রকাশ করেছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে গিয়ে তাঁকে দেখে আসেন রবীন্দ্রনাথ এবং তাঁর সৃষ্টিশীলতার ভূয়সী প্রশংসা করেন।


১৯১০ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর মাত্র ৪৫ বছর বয়সে রজনীকান্ত সেন মৃত্যুবরণ করেন। তবে তাঁর প্রস্থান বাংলা সাহিত্য ও সঙ্গীতকে শূন্য করেনি; বরং তাঁর সৃষ্টি আজও বাঙালির চেতনায়, দেশপ্রেমে, ভক্তিতে এবং মানবিক মূল্যবোধে নতুন করে প্রাণ সঞ্চার করে।


রজনীকান্ত সেনের জন্মবার্ষিকীতে ক্রাইম ক্রনিকলের পক্ষ থেকে এই কালজয়ী কবি, গীতিকার ও সুরস্রষ্টার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।