আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ক্রাইম ক্রনিকল 


কলম্বিয়ার পশ্চিমাঞ্চলে ৭ দশমিক ৪ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে একাধিক শহরে ভবন ধসে পড়েছে। ধ্বংসস্তূপে এখনো বহু মানুষ আটকা রয়েছেন বলে জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।


সোমবার (১০ আগস্ট) স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ৩৪ মিনিটে ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। এরপর দেশটিতে জাতীয় দুর্যোগ ঘোষণা করা হয়।


হতাহতের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থাগুলো অন্তত ৮২ জনের মৃত্যুর কথা জানিয়েছে।



ছবি: রয়টার্স


তবে গভর্নর ও মেয়রদের ঘোষণা আলাদাভাবে যাচাই করে একটি মার্কিন সংবাদমাধ্যম এখন পর্যন্ত ২৯ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করতে পেরেছে। উদ্ধারকাজ চলমান থাকায় সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।


সবচেয়ে বেশি ক্ষতি পেরেইরায়

কফি উৎপাদন অঞ্চলের শহর পেরেইরায় সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। শহরটির মেয়র মাউরিসিও সালাসার জানিয়েছেন, সেখানে অন্তত ১৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন।

ধসে পড়া ভবনগুলোর ভেতরে আরও অনেকে আটকা পড়েছেন বলে তিনি জানান।


শহরটির মাতেকানিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের যাত্রী টার্মিনালের একাংশ ধসে পড়েছে। প্রকাশিত ছবি ও ভিডিওতে দেখা যায়, ছাদের অংশ ভেঙে পড়ছে এবং যাত্রীরা চিৎকার করে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করছেন।


পেরেইরা যে রিসারালদা বিভাগে অবস্থিত, সেখানে সব মিলিয়ে অন্তত ৪০ জনের মৃত্যুর কথা জানিয়েছেন স্থানীয় কর্মকর্তারা।


অন্যান্য শহরের চিত্র

দেশটির তৃতীয় বৃহত্তম শহর কালিতে দুই ডজনেরও বেশি স্থাপনা ধসে পড়েছে। মেয়র আলেহান্দ্রো জানিয়েছেন, সেখানে এখনো মানুষ আটকা রয়েছেন।


উদ্ধারকাজে সহায়তার জন্য তিনি বোগোতা ও মেদেয়িনের কাছে দুর্যোগ দল পাঠানোর অনুরোধ জানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ধ্বংসস্তূপ থেকে এক বৃদ্ধা ও এক কিশোরীকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।


ভালে দেল কাউকা বিভাগে অন্তত ২৭ জনের মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।


মানিসালেস শহরে মেয়র হোর্হে এদুয়ার্দো রোহাসের ভাষ্য অনুযায়ী তিনজন নিহত হয়েছেন। শহরটির নিও-গথিক স্থাপত্যরীতির ক্যাথেড্রালের একটি টাওয়ার ধসে পড়েছে।


উৎপত্তিস্থলসংলগ্ন চোকো বিভাগের গভর্নর নুবিয়া কারোলিনা কর্দোবা-কুরি জানিয়েছেন, তাঁর বিভাগে অন্তত নয়জন নিহত ও ৮০ জন আহত হয়েছেন।


প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলের প্রধান বন্দর বুয়েনাভেন্তুরায় একটি ভবন ধসে একজনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন মেয়র লিহিয়া দেল কারমেন কর্দোবা। আন্তিওকিয়ার তামেসিস ও ভালে দেল কাউকার সারসালেও প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে।


আর্মেনিয়া শহরে কাঠামোগত ঝুঁকির আশঙ্কায় বহু মানুষকে বাড়িঘর থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।


ফ্লাইট স্থগিত, ৩২ বিভাগীয় শহরেই কম্পন

কাঠামোগত পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত পেরেইরা, মানিসালেস, কিবদো, আর্মেনিয়া, কার্তাগো ও বুয়েনাভেন্তুরা বিমানবন্দরে ফ্লাইট স্থগিত রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ।


দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা জানিয়েছে, নয়টি বিভাগে এবং ৩২টি বিভাগীয় রাজধানীর সবকটিতেই কম্পন অনুভূত হয়েছে।


রাজধানী বোগোতায় গুরুতর কাঠামোগত ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। মেয়র কার্লোস ফার্নান্দো গালান জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত শহরগুলোতে পাঠানোর জন্য ১০০ জন উদ্ধারকর্মী প্রস্তুত রাখা হয়েছে।


কারিগরি তথ্য

কলম্বিয়ার ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ভূমিকম্পের মাত্রা ৭ দশমিক ৪ এবং গভীরতা ৯৬ কিলোমিটার বলে জানিয়েছে। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (ইউএসজিএস) হিসাবে গভীরতা ১০৭ কিলোমিটার।


উৎপত্তিস্থল চোকো বিভাগের সান হোসে দেল পালমারের কাছে, রাজধানী বোগোতা থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার পশ্চিমে।


ইউএসজিএস ‘অরেঞ্জ অ্যালার্ট’ জারি করেছে, যা সংস্থাটির দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সতর্কতা স্তর। এর অর্থ, উল্লেখযোগ্য প্রাণহানি ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।


কম্পনের আওতায় পড়েছেন প্রায় সাড়ে তিন কোটি মানুষ। ইকুয়েডর, পানামা ও ভেনেজুয়েলাতেও কম্পন অনুভূত হয়েছে। মার্কিন সুনামি সতর্কতা ব্যবস্থা জানিয়েছে, সুনামির কোনো ঝুঁকি নেই।


প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এস্প্রিয়েইয়া জানিয়েছেন, তিনি নিজে জরুরি সাড়াদান কার্যক্রম তদারকি করছেন এবং শিগগিরই দুর্গত এলাকায় যাবেন।


জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ আমেরিকা, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশ উদ্ধারকাজে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে।


সাত সপ্তাহে দ্বিতীয় বিপর্যয়

লাতিন আমেরিকার জন্য সাত সপ্তাহের ব্যবধানে এটি দ্বিতীয় বড় ভূমিকম্প। গত ২৪ জুন ভেনেজুয়েলায় ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার জোড়া ভূমিকম্পে ছয় হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারান।


ওই দুর্যোগের পর ১৪০০-র বেশি পরাঘাত রেকর্ড করা হয় এবং সেখানে এখনো উদ্ধারকাজ চলছে।