স্পোর্টস ডেস্ক | ক্রাইম ক্রনিকল


ফুটবল ইতিহাসে এমন অনেক দল আছে, যারা শিরোপা জিতেছে; আবার এমন দলও আছে, যারা শিরোপা না জিতেও নিজেদের ফুটবল দর্শন, ধারাবাহিকতা ও লড়াকু মানসিকতার কারণে কিংবদন্তির মর্যাদা পেয়েছে। নেদারল্যান্ডস ঠিক তেমনই একটি দল। বিশ্বকাপের ট্রফি আজও তাদের অধরা, কিন্তু একটি অনন্য রেকর্ডে তারা ফুটবল বিশ্বকে বিস্মিত করে চলেছে।


২০০৬ বিশ্বকাপের পর থেকে আজ পর্যন্ত বিশ্বকাপের মূল পর্বে (ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনাল টুর্নামেন্ট) নির্ধারিত ৯০ মিনিটের খেলায় কোনো দলের কাছে হারেনি ডাচরা।


ডাচদের সর্বশেষ ৯০ মিনিটের পরাজয় এসেছিল ২০০৬ সালের ২৫ জুন জার্মানির নুরেমবার্গে। বিশ্বকাপের রাউন্ড অব সিক্সটিনে পর্তুগালের কাছে ১-০ গোলে হেরেছিল নেদারল্যান্ডস। সেই ম্যাচটি ইতিহাসে “ব্যাটল অব নুরেমবার্গ” নামে পরিচিত। ম্যাচে রেফারি দেখিয়েছিলেন ১৬টি হলুদ ও ৪টি লাল কার্ড, যা বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত ম্যাচ হিসেবে বিবেচিত।


সেই পরাজয়ের পর কেটে গেছে দুই দশক। কিন্তু বিশ্বকাপের মঞ্চে নির্ধারিত সময়ে ডাচদের হারাতে পারেনি কোনো দল।


২০১০: শিরোপার এত কাছে, তবুও নয়


দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে দুর্দান্ত ফুটবল খেলে ফাইনালে ওঠে নেদারল্যান্ডস। শিরোপা জয়ের স্বপ্ন তখন হাতছানি দিচ্ছিল। কিন্তু ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে ৯০ মিনিট গোলশূন্য থাকার পর অতিরিক্ত সময়ে ১১৬ মিনিটে গোল করেন আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা। তাতেই ভেঙে যায় ডাচদের বিশ্বকাপ স্বপ্ন।


ফিফার পরিসংখ্যান অনুযায়ী ম্যাচটির ৯০ মিনিটের ফলাফল ছিল ড্র। অর্থাৎ নির্ধারিত সময়ে নেদারল্যান্ডস অপরাজিতই ছিল।




২০১৪: আর্জেন্টিনার কাছে টাইব্রেকারের বেদনা


ব্রাজিল বিশ্বকাপে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখিয়ে সেমিফাইনালে পৌঁছে যায় ডাচরা। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে সেমিফাইনালে ৯০ মিনিট এবং অতিরিক্ত সময় শেষেও কোনো দল গোল করতে পারেনি। ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে, যেখানে জয় পায় আর্জেন্টিনা।


পরিসংখ্যানের খাতায় ম্যাচটি ড্র হিসেবেই গণ্য হয়। পরে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ব্রাজিলকে হারিয়ে বিশ্বকাপ শেষ করে নেদারল্যান্ডস।


২০১৮: বিশ্বকাপে জায়গাই হয়নি


রাশিয়া বিশ্বকাপে খেলতে পারেনি নেদারল্যান্ডস। ইউরোপিয়ান বাছাইপর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয়েছিল তাদের।


২০২২: আবারও আর্জেন্টিনা, আবারও টাইব্রেকার


কাতার বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে নাটকীয় এক ম্যাচে আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হয় ডাচরা। ম্যাচের শেষ দিকে দুই গোল করে ২-২ সমতায় ফেরে তারা। নির্ধারিত সময় শেষ হয় ড্র অবস্থায়।


অতিরিক্ত সময়েও কোনো গোল না হওয়ায় ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। সেখানে হেরে বিদায় নিতে হয় নেদারল্যান্ডসকে। কিন্তু ৯০ মিনিটের হিসাব অনুযায়ী তাদের অপরাজিত ধারাবাহিকতা অটুট থাকে।




ট্রফি নেই, তবু শ্রেষ্ঠদের কাতারে


ফুটবল বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী দর্শন ‘টোটাল ফুটবল’-এর জনক নেদারল্যান্ডস। ডাচ ফুটবলকে বিশ্বদরবারে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন কিংবদন্তি জোহান ক্রুইফ। তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে ডাচ ফুটবলকে সমৃদ্ধ করেছেন রুদ গুলিত, ডেনিস বার্গক্যাম্প, রোনাল্ড কোম্যান, ওয়েসলি স্নাইডার, রবিন ফন পার্সি এবং আরিয়েন রবেনদের মতো তারকারা।


তবুও বিশ্বকাপের ট্রফি আজও অধরা। ১৯৭৪, ১৯৭৮ ও ২০১০—তিনবার ফাইনাল খেলেও শিরোপা জিততে পারেনি ডাচরা।


২০২৬-এ কি বদলাবে ইতিহাস?


বিশ্বকাপে ২০ বছর ধরে নির্ধারিত সময়ে অপরাজিত থাকা নিঃসন্দেহে বিরল এক অর্জন। তবে ইতিহাস শেষ পর্যন্ত বিজয়ীদেরই মনে রাখে। তাই প্রশ্ন উঠছে—২০২৬ বিশ্বকাপে কি অবশেষে শিরোপার আক্ষেপ ঘুচবে নেদারল্যান্ডসের? নাকি আবারও ভাগ্য, অতিরিক্ত সময় কিংবা টাইব্রেকারের কাছে থেমে যাবে তাদের স্বপ্ন?


একটি বিষয় অবশ্য নিশ্চিত—বিশ্বকাপের মঞ্চে ৯০ মিনিটের লড়াইয়ে ডাচদের হারানো গত দুই দশক ধরে প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। আর সেই কারণেই বিশ্বকাপের ট্রফি না জিতেও নেদারল্যান্ডস আজও ফুটবল বিশ্বের অন্যতম সম্মানিত শক্তি।