আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ক্রাইম ক্রনিকল


মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৌদি আরবের নেতৃত্বে গঠিত বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। জ্বালানি নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, শ্রমবাজার এবং আঞ্চলিক কূটনৈতিক ভারসাম্যের দিক থেকে সিদ্ধান্তটিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। তবে একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক এবং বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।


সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, লোহিত সাগর, বাব আল-মান্দেব প্রণালি ও এডেন উপসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৌদি আরবসহ ১৪টি দেশ নিয়ে এই জোট গঠন করা হয়েছে। জোটের সদস্য দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ, তুরস্ক, পাকিস্তান, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, জর্ডান, মিসর, জিবুতি, সোমালিয়া, ইয়েমেন, সুদান ও নাইজেরিয়া।


বাংলাদেশ সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি সূত্রও সৌদি নেতৃত্বাধীন এই জোটে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।


কেন গুরুত্বপূর্ণ এই জোট


ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের পর হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের জ্বালানি এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। বিকল্প হিসেবে লোহিত সাগরের ওপর নির্ভরতা বাড়লেও সেখানে ইরান-সমর্থিত হুতি গোষ্ঠীর হামলা ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে অবরোধের কারণে নতুন সংকট তৈরি হয়েছে।


বিশ্বের প্রায় ১০ থেকে ১২ শতাংশ সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং প্রতিদিন প্রায় ৪ থেকে ৫ মিলিয়ন ব্যারেল তেল বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে এই রুটে অস্থিরতা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং আমদানিনির্ভর দেশগুলোর অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।


বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের জন্যও এই রুট নিরাপদ থাকা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হলে দেশের আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ বাড়তে পারে।


কেন যুক্ত হলো বাংলাদেশ


সামরিক ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের সিদ্ধান্তের পেছনে একাধিক কৌশলগত কারণ রয়েছে। সৌদি আরব বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শ্রমবাজার। সেখানে ২৫ লাখের বেশি বাংলাদেশি কর্মরত। পাশাপাশি দুই দেশের অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে।


১৯৯০ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধেও সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সেনা পাঠিয়েছিল। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে কুয়েত পুনর্গঠনেও অংশ নিয়েছিল বাংলাদেশ।


অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা ড. নাসির উদ্দিন আহমেদের মতে, এই জোটে অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ নৌবাহিনী আধুনিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা, যৌথ মহড়া, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং বহুজাতিক সমন্বয়ের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পাবে। একই সঙ্গে আফ্রিকার পূর্ব উপকূলে নতুন বাণিজ্য ও জনশক্তি রপ্তানির সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।


ঝুঁকির দিকও দেখছেন বিশ্লেষকেরা


সুযোগের পাশাপাশি সম্ভাব্য ঝুঁকির কথাও তুলে ধরছেন বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দেওয়ায় ইরানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। কারণ সৌদি আরব ও ইরান দীর্ঘদিন ধরে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছে।


নৌবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা জে ইউ ভুঁইয়ার মতে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত আরও জটিল হলে এই জোটের সদস্য দেশগুলোও নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। তিনি মনে করেন, ইরান ও সৌদি—উভয় দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক যোগাযোগ সক্রিয় রাখা প্রয়োজন।


ড. নাসির উদ্দিন আহমেদও মনে করেন, বাংলাদেশকে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে যে, এই জোটে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নয়; বরং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্যপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।


ভারসাম্য রক্ষাই বড় চ্যালেঞ্জ


ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের শুরু থেকেই বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে সংযম ও আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের আহ্বান জানিয়ে আসছে। এমন অবস্থায় সৌদি নেতৃত্বাধীন সামুদ্রিক জোটে যোগ দেওয়ার পরও সেই কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা এখন বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।


তাঁদের মতে, বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তায় ভূমিকা রাখার পাশাপাশি দেশের পররাষ্ট্রনীতি, আঞ্চলিক সম্পর্ক এবং জাতীয় স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই হবে বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশল।