স্পোর্টস ডেস্ক। ক্রাইম ক্রনিকল 


বিশ্বকাপসহ ফিফার প্রধান টুর্নামেন্টগুলোর বাণিজ্যিক মালিকানার একটি অংশ বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে দেওয়ার প্রস্তাব ঘিরে বিশ্ব ফুটবোলে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ইউরোপীয় ফুটবল সংস্থা উয়েফা ও উত্তর-মধ্য আমেরিকার ফুটবল সংস্থা কনকাকাফের কঠোর বিরোধিতার মুখে বিষয়টি নিয়ে এখন ব্যাখ্যা দিতে হচ্ছে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফাকে।


শুক্রবার এক বিবৃতিতে ফিফা জানিয়েছে, ফুটবল বা বিশ্বকাপ ‘বিক্রি’ করার কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই। সংস্থাটির দাবি, গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভ্রান্তিকর তথ্যের কারণে বিষয়টি নিয়ে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছে। তবে সব সদস্যদেশের মতামত বিবেচনায় নিয়ে আলোচনা অব্যাহত থাকবে।


ফিফার বিবৃতিতে বলা হয়, সদস্যদেশগুলো যেন সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারে, সে জন্য উন্মুক্ত ও গণতান্ত্রিক পরামর্শ প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়া হবে। একই সঙ্গে সংস্থাটি জোর দিয়ে বলেছে, ‘কেউ ফুটবল বিক্রি করছে না। ফিফা এমন কোনো বিষয় কখনোই বিবেচনা করবে না।’


বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর প্রস্তাবিত ‘ফিফা ফরওয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ (এফএফই)’। পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিশ্বকাপসহ ফিফার বড় টুর্নামেন্টগুলোর বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একটি পৃথক প্রতিষ্ঠান গঠন করা হবে। সেই প্রতিষ্ঠানে সংখ্যালঘু অংশীদার হিসেবে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হবে।


ফিফার দাবি, এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য সদস্যদেশগুলোর জন্য নতুন বাণিজ্যিক সুযোগ সৃষ্টি করা এবং ভবিষ্যতে ফুটবল থেকে আয় বাড়িয়ে সদস্য ফেডারেশনগুলোর মধ্যে আরও বেশি অর্থ বণ্টন করা। তবে সংস্থাটি বলছে, এতে ফুটবলের পরিচালনা বা মূল চেতনায় কোনো পরিবর্তন আসবে না।


তবে এ পরিকল্পনার বিরুদ্ধে সবচেয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে উয়েফা। সংস্থাটির ৫৫ সদস্যদেশ প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতের ফিফা বিশ্বকাপ বর্জনের হুঁশিয়ারি দিয়েছে। উয়েফার বক্তব্য, বিশ্বকাপ কোনো বিনিয়োগপণ্য নয়; এটি বিশ্ব ফুটবলের ঐতিহ্য, যা কখনোই বেসরকারি মালিকানার হাতে তুলে দেওয়া উচিত নয়।


একই অবস্থান নিয়েছে কনকাকাফও। সংস্থাটির ৪১ সদস্যদেশ প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের অভিযোগ, বিষয়টি নিয়ে প্রয়োজনীয় আলোচনা ছাড়াই অস্বাভাবিক কম সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। ইতিহাসের সবচেয়ে লাভজনক বিশ্বকাপ আয়োজনের দাবি করার পরও কেন বেসরকারি বিনিয়োগ প্রয়োজন—সে প্রশ্নও তুলেছে কনকাকাফ।


এদিকে এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি) জানিয়েছে, ফিফার একতরফা পদক্ষেপ মহাদেশীয় ফুটবলের ভিত্তিকেই দুর্বল করতে পারে। প্রস্তাব প্রকাশের আগে তাদের সঙ্গে কোনো পরামর্শ না করা এবং বিস্তারিত আর্থিক, আইনি ও প্রশাসনিক বিশ্লেষণ না দেওয়াকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলেও মন্তব্য করেছে সংস্থাটি।


ফিফার ২১১ সদস্যদেশের মধ্যে প্রস্তাবটি অনুমোদনের জন্য অন্তত ১০৬টি ভোট প্রয়োজন। কিন্তু উয়েফা ও কনকাকাফের সদস্যসংখ্যাই ৯৬। ফলে শুরু থেকেই প্রয়োজনীয় সমর্থন পাওয়া নিয়ে চাপে রয়েছে ইনফান্তিনো প্রশাসন।


এর আগে সদস্যদেশগুলোর কাছে পাঠানো এক চিঠিতে ইনফান্তিনো জানান, প্রস্তাব সমর্থন করলে প্রতিটি সদস্য ফেডারেশন ৪ কোটি মার্কিন ডলার পর্যন্ত আর্থিক সুবিধা পেতে পারে। প্রাথমিকভাবে ২ কোটি ডলার পেতে হলে আগামী ১৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে পরিকল্পনায় সম্মতি দিতে হবে।


এদিকে দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবল সংস্থা কনমেবল এখনো আনুষ্ঠানিক অবস্থান জানায়নি। আফ্রিকার সিএএফ এবং ওশেনিয়ার ওএফসি জানিয়েছে, তারা আগস্টে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করবে।


বিশ্বকাপজয়ী সাবেক ফুটবলার ও বর্তমানে চেলসির কোচ জাবি আলোনসোও এই বিতর্কে মত দিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, ‘ফুটবল মানুষের জন্য, ব্যক্তিমালিকানার জন্য নয়। ফুটবলের স্বকীয়তা ও আবেগ রক্ষা করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’


এ অবস্থায় প্রস্তাবটি শেষ পর্যন্ত অনুমোদন পাবে নাকি ব্যাপক বিরোধিতার মুখে ফিফাকে পিছু হটতে হবে—সেটিই এখন বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্ন।