আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ক্রাইম ক্রনিকল


ইউরোপীয় ইউনিয়নের যৌথ সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় না থেকে একের পর এক দেশ নিজ উদ্যোগে নিষিদ্ধ করছে পিএফএএস বা 'ফরএভার কেমিক্যালস'। সবশেষ গত ২৪ জুলাই সুইডেন ঘোষণা দিয়েছে, ফ্রান্স ও ডেনমার্কের পথ ধরে তারাও এই তালিকায় নাম লেখাচ্ছে। এদিকে ইইউয়ের নিজস্ব কিছু নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ ইতিমধ্যে কার্যকর হতে শুরু করলেও ব্যাপক প্রবিধান আসতে এখনো বছরখানেক লাগবে।



সুইডেনের পরিবেশ মন্ত্রী রোমিনা পুরমোখতারি সরকারের গ্রীষ্মকালীন চা-চক্রে (ফিকা) পিএফএএস যুক্ত দৈনন্দিন ব্যবহারের সাধারণ কিছু জিনিসপত্র প্রদর্শন করছেন। ছবি: আন্না হ্যালামস


সুইডেন: 'বড় বিজয়' বলছেন মন্ত্রী

সুইডেনের জলবায়ু ও পরিবেশমন্ত্রী রোমিনা পুরমোখতারি জানান, ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে দেশটিতে পোশাক, জুতা, জলরোধী উপকরণ, রান্নাঘরের তৈজসপত্র, প্রসাধনী ও স্কি-ওয়াক্সে পিএফএএস নিষিদ্ধ হবে। কার্যকর বিকল্প থাকা সত্ত্বেও দৈনন্দিন পণ্যে এই রাসায়নিক ব্যবহারের কোনো যৌক্তিকতা নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।


ঘরবাড়ি, প্রকৃতি ও মানবশরীরে এই রাসায়নিকের বিস্তার চলতে থাকা অবস্থায় বসে থাকতে চায় না সুইডেন। মন্ত্রণালয়ের ভাষ্যে, জাতীয় পর্যায়ে আগেভাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ইইউয়ের চেয়ে এগিয়ে থাকতে চায় সুইডেন সরকার।



২০ আগস্ট ২০২৫: মুন্ডোলসহাইমের এক সুপারমার্কেটে প্রতিবাদ চলাকালে তাক থেকে কীটনাশক ‘অ্যাসিটামিপ্রিড’ যুক্ত পণ্য সরাচ্ছেন কৃষি ইউনিয়ন 'এফডিএসইএ ৭২' এবং 'জ্যন অ্যাগ্রিকালচার্স' এর সদস্যরা। ছবি: এএফপি


ফ্রান্স: প্রথম কার্যকর আইন, কিছু ছাড়সহ

ফ্রান্সে ২০২৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি পাস হওয়া আইন অনুযায়ী ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হয়েছে পিএফএএসবিরোধী নিষেধাজ্ঞা। প্রসাধনী, স্কি-ওয়াক্স এবং যেসব পোশাক-জুতায় বিকল্প ইতিমধ্যে বাজারে আছে, সেসবে পিএফএএস ব্যবহার, উৎপাদন, আমদানি ও রপ্তানি নিষিদ্ধ।


"অপরিহার্য ব্যবহার" বা জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কিছু বস্ত্র পণ্যে ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে, আর নিরাপত্তারক্ষী ও দমকলকর্মীদের সুরক্ষামূলক পোশাক এই আইনের আওতার বাইরে। আগে থেকে উৎপাদিত পণ্য বিক্রির জন্য ১২ মাসের রূপান্তর-সময়ও দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক খসড়ায় থাকা রান্নাঘরের তৈজসপত্র বাদ দেওয়া হয় ফরাসি উৎপাদকদের কর্মসংস্থান হারানোর আশঙ্কার পর। ২০৩০ সালের মধ্যে আরও বিস্তৃত টেক্সটাইল পণ্যেও নিষেধাজ্ঞা সম্প্রসারিত হওয়ার কথা।



৫ মার্চ ২০২৬: মারাত্মক পিএফএএস দূষণের শিকার ২৬ জন বাসিন্দা ও পরিবেশবাদীদের ব্রাসেলসে ইউরোপীয় কমিশনের সামনে বিক্ষোভ। ছবি: ল্যে মন্ডে


ডেনমার্ক: ইউরোপের পথিকৃৎ

ইউরোপে সবার আগে পিএফএএস নিয়ন্ত্রণে হাত দেয় ডেনমার্ক। ২০২০ সালের জুলাইয়ে খাদ্যের সংস্পর্শে আসা কাগজ ও বোর্ডে এই রাসায়নিক নিষিদ্ধ করে দেশটি, আর ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে সেই নিষেধাজ্ঞা সম্প্রসারিত হয়েছে পোশাক, জুতা ও জলরোধী উপকরণেও।


ইউরোপের বাইরে: নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্র

২০২৬ সালের শেষ নাগাদ প্রসাধনীতে পিএফএএস নিষিদ্ধকারী প্রথম কয়েকটি দেশের একটি হতে যাচ্ছে নিউজিল্যান্ড। যুক্তরাষ্ট্রে ফেডারেল কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই, তবে মেইন, মিনেসোটা ও ক্যালিফোর্নিয়াসহ কয়েকটি অঙ্গরাজ্য নিজ উদ্যোগে কিছু ভোগ্যপণ্যে পিএফএএস নিষিদ্ধ করেছে।


উল্টো দিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সরকার পানীয় জলে পিএফএএস সুরক্ষাসংক্রান্ত পূর্বের কিছু মানদণ্ড শিথিল করার দিকে যাচ্ছে বলে জানা গেছে, আর চলতি জুলাইয়েই পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা (ইপিএ) কৃষিক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য তিনটি নতুন পিএফএএস-কীটনাশক অনুমোদন করেছে।



বেলজিয়ামের ওয়ালোনিয়ার মাটিতে পিএফএএস রাসায়নিক ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় যুক্ত মার্কিন প্রতিষ্ঠান থ্রিএম; ঝুঁকিতে হাজারো মানুষের স্বাস্থ্য। সূত্র: pfascentral.org


পিএফএএস কেন এত আলোচিত

দশ হাজারেরও বেশি সিন্থেটিক রাসায়নিকের এই গোষ্ঠী প্রকৃতিতে ভেঙে যেতে হাজার হাজার বছর সময় নেয়, তাই এদের নাম 'চিরস্থায়ী রাসায়নিক'। কার্বন-ফ্লোরিন বন্ধন—জৈব রসায়নের সবচেয়ে শক্তিশালী বন্ধনগুলোর একটি—এদের এই স্থায়িত্ব দেয়।


১৯৪০-এর দশক থেকে ননস্টিক তৈজসপত্র, পোশাক ও শিল্প উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়ে আসা এই রাসায়নিক এভারেস্ট শৃঙ্গ থেকে মানুষের রক্ত পর্যন্ত সর্বত্র মিলেছে। দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শ যকৃতের ক্ষতি, উচ্চ কোলেস্টেরল, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা হ্রাস, জন্মকালীন কম ওজন এবং বিভিন্ন ক্যানসারের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।



পিএফএএস -এর স্বাস্থ্যঝুঁকি ও নানাবিধ সমস্যার ইনফোগ্রাফিক। ক্রেডিট: কেমট্রাস্ট


ইইউয়ের এখন পর্যন্ত অবস্থান

ইউরোপীয় কমিশন ব্যাপক পিএফএএস প্রবিধানের প্রস্তাব ২০২৭ সালে উপস্থাপনের কথা থাকলেও, তার আগেই বেশ কিছু নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ কার্যকর হয়ে গেছে বা হতে যাচ্ছে—২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে পানীয় জলে পিএফএএসের সর্বোচ্চ সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে, আগস্ট থেকে খাদ্যের প্যাকেজিং উপকরণে নির্দিষ্ট মাত্রার ওপরে পিএফএএস নিষিদ্ধ হচ্ছে, আর অক্টোবর থেকে পিএফএইচএক্সএ নামে একটি উপগোষ্ঠীর ওপর টেক্সটাইল, জুতা, খাদ্য প্যাকেজিং ও প্রসাধনীতে বিধিনিষেধ কার্যকর হবে।


২০২৫ সালের অক্টোবরে দমকল কাজে ব্যবহৃত ফোমে পিএফএএস নিষিদ্ধ করে ইউনিয়নব্যাপী একটি প্রবিধানও অনুমোদিত হয়েছে, যা ভূগর্ভস্থ পানি দূষণের বড় একটি উৎস কমাতে সহায়ক হবে বলে মনে করা হচ্ছে।


মার্চের শেষে প্রকাশিত একটি প্রাথমিক বৈজ্ঞানিক মতামতে ফরএভার কেমিক্যালসের ওপর ব্যাপক বিধিনিষেধের সুপারিশ করা হয়েছিল। এখন ইউরোপিয়ান কেমিক্যালস এজেন্সি (ইসিএইচএ) এ বছরের শেষ নাগাদ পিএফএএসবিরোধী পদক্ষেপের আর্থসামাজিক প্রভাব নিয়ে দ্বিতীয় একটি মতামত দেবে, যা চূড়ান্ত প্রবিধানের পরিধি নির্ধারণে প্রভাব ফেলবে। গত আগস্টে ইসিএইচএ জানায়, মুদ্রণ, সিলিং, যন্ত্রপাতি, চিকিৎসা, সামরিক ব্যবহার, বিস্ফোরক ও কারিগরি টেক্সটাইলসহ আটটি শিল্পখাতের জন্য বিশেষ বিবেচনা রাখা হতে পারে।


দূষণের মাত্রা ও ভবিষ্যৎ

ইউরোপে আনুমানিক এক কোটি ২৫ লাখ মানুষ এমন জনবসতিতে বাস করেন যেখানকার পানীয় জল পিএফএএসে দূষিত। পরিবেশবাদী সংগঠন এ প্লাস্টিক প্ল্যানেটের সহপ্রতিষ্ঠাতা সিয়ান সাদারল্যান্ডের মতে, রাসায়নিক দূষণের প্রতি সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন গর্ভবতী নারী ও নবজাতক, যাদের জীবনের প্রথম হাজার দিনে এই সংস্পর্শ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে প্রভাব ফেলতে পারে। তাঁর মতে, নিরাপদ বিকল্প ইতিমধ্যে বাজারে থাকায় এখন শুধু প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছার, আর শিল্পখাত রক্ষার চেয়ে মানুষ রক্ষাকেই সব সময় অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।



সুইডিশ জলবায়ু মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি, ইউরোনিউজ (অ্যাঞ্জেলা সাইমন্স), ফ্রান্স২৪, ফিজ.অর্গ, ইন্টেলিজেন্ট লিভিং, ডব্লিউডব্লিউডি ও সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন অবলম্বনে সংকলিত।