স্টাফ রিপোর্টার | ক্রাইম ক্রনিকল


পশ্চিম আফ্রিকার ছোট্ট, স্থলবেষ্টিত দেশ বুরকিনা ফাসো। বছরের পর বছর ধরে জিহাদি সংগঠনগুলোর সহিংসতায় বিপর্যস্ত এই দেশটি এখন এক নতুন ধরনের সংঘাতের মুখোমুখিতবে এবার লড়াইটা কোনো সশস্ত্র জঙ্গি গোষ্ঠীর সঙ্গে নয়, বরং দেশটির নিজস্ব মুসলিম ধর্মীয় নেতাদের একটি অংশের সঙ্গে। আর এই লড়াই ঘোষণা করেছেন খোদ দেশটির সামরিক শাসক নিজেই।


২০২২ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেন ক্যাপ্টেন ইব্রাহিম ত্রাওরে। তখন তাঁর বয়স মাত্র ৩৪আফ্রিকার সবচেয়ে কমবয়সী রাষ্ট্রপ্রধানদের একজন হিসেবে তাঁর উত্থান আন্তর্জাতিক মহলে বেশ আলোচিত হয়েছিল। ক্ষমতায় আসার পর থেকে তিনি নিজেকে দেখিয়েছেন একজন জাতীয়তাবাদী, পশ্চিমা-বিরোধী নেতা হিসেবে, যিনি ফ্রান্সের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে রাশিয়ার দিকে ঝুঁকেছেন এবং দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে নিজের হাতে সামলানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।


শুরুর দিকে তাঁর এই উত্থানের পেছনে দেশের প্রভাবশালী সুন্নি ধর্মীয় নেতাদের একটা বড় ভূমিকা ছিল। এই আলেমরা তাঁর সামরিক সরকারকে বৈধতা দিতে সাহায্য করেছিলেন, জনগণের কাছে তাঁকে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে সহায়ক হয়েছিলেন। কিন্তু আজ, প্রায় চার বছর পর, সেই সম্পর্কে দেখা দিয়েছে গভীর ফাটল। থিঙ্কট্যাংক টিমবুকটু ইনস্টিটিউটের ভাষায়, সরকার আর ধর্মীয় নেতাদের মধ্যে যে "নীরব বোঝাপড়া" ছিল, সেটি এখন কার্যত ভেঙে পড়েছে।


বছরের এপ্রিল মাসে বোবো-দিউলাসো শহরে গ্রেপ্তার করা হয় ইমাম মাহমুদ বারোকে। এরপর মে মাসের শেষ দিকে গ্রেপ্তার করা হয় দেশের এক অত্যন্ত প্রভাবশালী শ্রদ্ধেয় সুন্নি আলেম, ইমাম মোহাম্মদ ইসহাক কিন্দোকে। তাঁর "অপরাধ" ছিলসরকারের প্রস্তাবিত একটি নতুন ধর্মীয় আইনের খসড়ার সমালোচনা করা।


ইমাম কিন্দোর গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়তেই তাঁর অনুসারীরা রাস্তায় নেমে আসেন, দাবি তোলেন তাঁর মুক্তির। কিন্তু সরকার এতে নরম হওয়ার বদলে আরও কঠোর পথে হাঁটে। রাজধানী উয়াগাদুগুর সবচেয়ে বড় সুন্নি মসজিদটি "নিরাপত্তাজনিত কারণ" দেখিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়। প্রায় শখানেক বিক্ষোভকারীকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় সেনা ক্যাম্পে, যেখানে তাদের দেওয়া হয় তথাকথিত "নাগরিক প্রশিক্ষণ" প্রতিবাদ দমনের পর থেকে ইমাম কিন্দো ঠিক কোথায় আছেন, তা নিয়েও স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।


এই উত্তেজনার মধ্যেই গত ২০ জুন বুরকিনা ফাসোর ক্রান্তিকালীন পার্লামেন্ট সর্বসম্মতিক্রমে পাস করে একটি নতুন আইন– "ধর্মীয় স্বাধীনতা আইন" সরকারের ভাষ্যমতে, এই আইনের লক্ষ্য দেশের সাংবিধানিক ধর্মনিরপেক্ষতা রক্ষা করা। আইনে এমন কিছু বিষয়কে "ধর্মীয় অপব্যবহার" হিসেবে চিহ্নিত করে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে– যেমন শিশুদের দিয়ে জোরপূর্বক ভিক্ষা করানো, এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতার অভাব। এসবের জন্য রয়েছে জরিমানা কারাদণ্ডের বিধান।


সরকারের দাবি, এই আইন প্রয়োজন ছিল কারণ কিছু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান আর্থিক অস্বচ্ছতা এবং শিশু নির্যাতনের মতো অপরাধে জড়িত। কিন্তু সমালোচকদের চোখে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্নতাঁরা বলছেন, এই আইনের আড়ালে আসলে রাষ্ট্র ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করতে চাইছে।


জুন মাসের শেষ দিকে সরকার আরেকটি সিদ্ধান্ত নেয়যাঁরা বিদেশে গিয়ে ইসলামি শিক্ষা নিতে চান, তাঁদের এখন থেকে মন্ত্রণালয়ের পূর্বানুমতি নিতে হবে। ত্রাওরে এমনও ঘোষণা দিয়েছেন যে বিদেশে ইসলামি আইন (শরিয়া) নিয়ে অধ্যয়নরত প্রায় আট লাখ শিক্ষার্থীকে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে, আর যাঁরা ফিরতে অস্বীকার করবেন, তাঁদের নাগরিকত্ব হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে হতে পারে।


এই পুরো ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে ত্রাওরের নিজের একটি বক্তব্য। তিনি সরাসরি বলেছেন

"যদি এটাই তোমাদের ইসলাম হয়, তাহলে আমরা এর বিরুদ্ধে লড়ব। উগ্রপন্থীদের বদলাতে হবে। যদি তারা না বদলায়, তাহলে জেনে রাখুন, লড়াই ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে।"


তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, যেসব ইমাম উগ্র মতাদর্শ প্রচার করবেন, তাঁদের বহিষ্কার করা হবে বা তাঁদের কার্যক্রম স্থগিত করা হবে। একই সঙ্গে তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যেসব ধর্মীয় নেতা শান্তির বার্তা প্রচার করেন, তাঁদের পাশে সরকার থাকবে। যাঁরা এই আইন পদক্ষেপের বিরোধিতা করছেন, তাঁদেরও তিনি নিছক "একটি ক্ষুদ্র উগ্রপন্থী অংশ" বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। পাশাপাশি তিনি এমন অভিযোগও তুলেছেন যে, বিদেশি শক্তিগুলো ধর্মকে ব্যবহার করে তাঁর দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে।


বুরকিনা ফাসো বছরের পর বছর ধরে জিহাদি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে প্রকৃত রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জড়িয়ে আছে। আল-কায়েদা সংশ্লিষ্ট জেএনআইএম (জামাত নুসরাত আল-ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন) এবং ইসলামিক স্টেট-সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলো দেশটির বিস্তীর্ণ অঞ্চল কার্যত নিয়ন্ত্রণ করছে, বহু শহর গ্রাম অবরুদ্ধ অবস্থায় আছে।
সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোতে এমনও অভিযোগ উঠেছে যে, জিহাদিদের দ্বারা অবরুদ্ধ শহরগুলো থেকে বেসামরিক মানুষদের বের হতে বাধা দিচ্ছে খোদ সেনাবাহিনীই।


এমন এক বাস্তবতায়, দেশটির প্রভাবশালী শান্তিপ্রিয় ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে সংঘাতে জড়ানো ত্রাওরের সরকারের জন্য এক ধরনের রাজনৈতিক ঝুঁকিও বটে। বিশ্লেষকদের মতে, যে আলেমদের সমর্থন একসময় তাঁর শাসনকে বৈধতা দিয়েছিল, তাঁদের সঙ্গেই এখন সংঘাতে জড়িয়ে পড়া তাঁর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দিতে পারে। আর সবচেয়ে বড় প্রশ্নটা থেকেই যাচ্ছেপ্রকৃত জিহাদি হুমকি মোকাবিলায়, যা দেশের সাধারণ মানুষের জীবনকে প্রতিদিন বিপর্যস্ত করছে, এই নতুন ধর্মীয়-রাজনৈতিক সংঘাত আদৌ কোনো সহায়ক ভূমিকা রাখবে কি না।


মধ্য এপ্রিল থেকে জুলাইএই কয়েক মাসের মধ্যে বুরকিনা ফাসোতে একের পর এক ঘটনা ঘটে গেছে: দুই প্রভাবশালী ইমামের গ্রেপ্তার, রাজধানীর সবচেয়ে বড় মসজিদ বন্ধ, শতাধিক বিক্ষোভকারীর সেনা হেফাজতে "প্রশিক্ষণ", একটি বিতর্কিত ধর্মীয় আইন পাস, বিদেশে ইসলামি শিক্ষারত শিক্ষার্থীদের ফিরিয়ে আনার ঘোষণা, এবং সবশেষে সামরিক শাসকের নিজের মুখে "উগ্র ইসলামের" বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা। প্রতিটি পদক্ষেপই সরকার তুলে ধরছে ধর্মনিরপেক্ষতা রক্ষার প্রয়াস হিসেবে, অথচ সমালোচকদের চোখে এটি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর আরেকটি ধাপ।


আপাতত এটুকু নিশ্চিত যে, ইব্রাহিম ত্রাওরে যে সমর্থনের ভিত্তিতে ক্ষমতায় টিকে ছিলেন, সেই ভিত্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের সঙ্গেই এখন তাঁর প্রকাশ্য সংঘাত চলছে। আর এই সংঘাতের পরিণতি শুধু ধর্মীয় বৃত্তেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি দেশটির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকেও প্রভাবিত করবেসেটাই এখন দেখার বিষয়।