রাজনীতি ডেস্ক | ক্রাইম ক্রনিকল
বাংলাদেশের রাজনীতিতে যত দিন জামায়াতে ইসলামী নাম নিয়ে রাজনীতি চলবে, তত দিন আওয়ামী লীগও টিকে থাকবে বলে মন্তব্য করেছেন কবি, চিন্তক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ফরহাদ মজহার।
রোববার রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংলাপে সম্মানিত অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। '৩৬ জুলাইয়ের অবদান, বিতর্ক ও ব্যর্থতার দায় পর্যালোচনা' শীর্ষক এ আয়োজন করে আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি।
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কার, রাজনৈতিক ঐক্য এবং অর্জন-ব্যর্থতার মূল্যায়ন নিয়ে অনুষ্ঠিত হয় এ সংলাপ। সভাপতিত্ব করেন এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান।
বক্তব্যের শুরুতে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক তাৎপর্য তুলে ধরেন ফরহাদ মজহার। তিনি বলেন, ওই বছরই বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো একটি রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী হিসেবে বিশ্ব ইতিহাসে আত্মপ্রকাশ করে।
তাঁর ভাষ্য, এই জাতীয় অর্জনের সঙ্গে কোনোভাবেই আপস বা দর-কষাকষির সুযোগ নেই—এমনকি জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গেও নয়।
তিনি বলেন, 'আমি বারবার একটা কথা বলেছি, যদিও তাঁরা অনেকে রাগ করেছেন—আমি বলেছি, যত দিন জামায়াতে ইসলামী থাকবে, তত দিন বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ থাকবে।'
জামায়াতে ইসলামীর নাম নিয়ে রাজনীতি করার তিনি ঘোরবিরোধী বলে উল্লেখ করেন। এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, ইসলাম এ দেশের মানুষের ধর্ম এবং এর নীতিগত ও নৈতিক দিক নতুন রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সংবিধান বাতিল ও 'গঠনতন্ত্রের' দাবি
১৯৭২ সালের সংবিধানকে জনগণের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত ঔপনিবেশিক 'অস্ত্র' হিসেবে আখ্যায়িত করে তা সম্পূর্ণ বাতিলের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন ফরহাদ মজহার। এ বিষয়ে কোনো আপসের সুযোগ নেই বলে জানান তিনি।
সংবিধানের সপ্তম অনুচ্ছেদের সমালোচনা করে তিনি বলেন, সেখানে এক বাক্যে জনগণকে রাষ্ট্রক্ষমতার মালিক বলা হলেও পরের বাক্যেই আইনি দলিলকে জনগণের ওপরে বসিয়ে গণসার্বভৌমত্ব নাকচ করা হয়েছে।
'সংবিধান' ও 'গঠনতন্ত্রের' পার্থক্য ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, জনগণ সংবিধানের ঊর্ধ্বে, অধীন নয়; ইচ্ছা করলে জনগণ যেকোনো সময় নতুন গঠনতন্ত্র প্রণয়ন করতে পারে।
তাঁর মতে, গঠনতন্ত্রের মাধ্যমে জনগণ নিজেরাই ঠিক করবে সম্পদের মালিকানা, ব্যাংক, বিনিয়োগ, বৈদেশিক বাণিজ্য, চিকিৎসা ও শিক্ষাব্যবস্থা কীভাবে পরিচালিত হবে।
ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে অভিযোগ
২০২৫ সালের ৫ আগস্ট গণ–অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়ায় গুরুতর গলদ ছিল বলে মনে করেন এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক। জনগণের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী পূর্ণ ক্ষমতাসম্পন্ন অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করতে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি বলেন, অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে পূর্ণ ক্ষমতাসম্পন্ন সরকার চাওয়া হলেও তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও বিএনপি মিলে তা হতে দেয়নি।
পুরোনো সংবিধান ও রাষ্ট্রপতিকে বহাল রেখে ৮ আগস্ট গঠিত সরকারকে তিনি 'সাংবিধানিক প্রতিবিপ্লব' হিসেবে আখ্যায়িত করেন। সম্প্রতি প্রকাশিত রাষ্ট্রপতির সাক্ষাৎকারেই এর প্রমাণ মিলেছে বলে দাবি করেন তিনি।
গণমাধ্যমের সমালোচনা করে তিনি বলেন, হাসিনাহীন অথচ হাসিনা-ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা ওই সরকারকে সাংবাদিকেরা ভুলভাবে 'অন্তর্বর্তী সরকার' বলে প্রচার করেছেন।
তরুণদের প্রসঙ্গে সতর্কবার্তা
অভ্যুত্থানে তরুণ প্রজন্মের সাহসিকতার প্রশংসা করে বিএনপিসহ রাজনৈতিক দলগুলোকে সতর্ক করেন ফরহাদ মজহার। আন্দোলনে থাকা শিক্ষার্থীদের ওপর যেন পুলিশি নির্যাতন না চালানো হয়, সে আহ্বান জানান তিনি।
তারেক রহমান যেন তরুণদের সঙ্গে বেইমানি না করেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি। বেগম খালেদা জিয়াও কখনো তরুণদের সঙ্গে বেইমানি করতে চাননি বলে উল্লেখ করেন এই চিন্তক।
ধর্মের নামে তাণ্ডব ও মাজার ভাঙচুরের ঘটনার কঠোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, ধর্মকে যাঁরা ভয় দেখানো বা নিপীড়নের হাতিয়ার বানাচ্ছেন, তাঁদের সবাই চেনে। তাঁর ভাষায়, নির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা চাপিয়ে দিয়ে কেউ ইসলামের একক কর্তৃত্ব দাবি করতে পারেন না; ইসলামে এ ধরনের একচ্ছত্র কর্তৃত্বের সুযোগ নেই।
গণ–অভ্যুত্থানের অর্জনকে 'ব্যর্থতা' হিসেবে তুলে ধরার তীব্র বিরোধিতা করেন তিনি। ২০ বছর যেখানে কথা বলা যায়নি, সেখানে এখন কথা বলা যাচ্ছে—এটিকে ব্যর্থতা বলার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সংলাপে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা শারমিন এস মুরশিদ বলেন, ১৯৭১ ও ২০২৪—উভয় চেতনাকে ধারণ করেই সামনে এগোতে হবে। সরকার পতন ঘটানো আর রাষ্ট্র পুনর্গঠন সম্পূর্ণ ভিন্ন দক্ষতার বিষয় বলে উল্লেখ করেন তিনি।
আলোচনায় আরও অংশ নেন সাবেক উপদেষ্টা ও এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া, আইনজীবী আবু হেনা রাজ্জাকী, এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদসহ দলটির নেতারা।
জামায়াতের কড়া প্রতিবাদ
ফরহাদ মজহারের এ বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। সোমবার গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে এ প্রতিক্রিয়া জানান দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের।
বিবৃতিতে তিনি বলেন, দেশের প্রথিতযশা কলামিস্ট, কবি ও রাষ্ট্রচিন্তকের এ মন্তব্য অগ্রহণযোগ্য, বিভ্রান্তিকর, অনভিপ্রেত ও অনাকাঙ্ক্ষিত। ভবিষ্যতে এ ধরনের মন্তব্য থেকে বিরত থেকে গঠনমূলক সমালোচনার আহ্বান জানান তিনি।
তাঁর দাবি, আওয়ামী লীগ সাড়ে ১৬ বছর ধরে জামায়াতসহ দেশবাসীর ওপর জুলুম-নির্যাতন চালিয়েছে, আর জামায়াত সেই শাসনের বিরুদ্ধে নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন করেছে।
এর ফলে দলটির শীর্ষ নেতারা প্রাণ হারিয়েছেন এবং হাজার হাজার নেতা-কর্মী আহত, পঙ্গু ও কারানির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
জুলাই অভ্যুত্থানে জামায়াত রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে দাবি করে তিনি বলেন, অভ্যুত্থানের শক্তিকে আওয়ামী লীগের সঙ্গে মেলানোর চেষ্টা করলে জনগণ তাদের ফ্যাসিবাদের দোসর হিসেবে চিহ্নিত করবে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন হলে নতুন বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করার সুযোগ থাকবে না বলেই দলটি বিশ্বাস করে।