লিখেছেন নূরুন্নাহার হোসেন

বাংলাদেশে নারীর কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যাংকিং, তথ্যপ্রযুক্তি, প্রশাসন এবং তৈরি পোশাকশিল্পসহ বিভিন্ন খাতে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে কর্মক্ষেত্রে এই অগ্রগতির পরও অধিকাংশ পরিবারে গৃহস্থালির কাজ ও পরিচর্যার প্রধান দায়িত্ব এখনো নারীর কাঁধেই রয়ে গেছে।

অফিসের দীর্ঘ কর্মদিবস শেষে একজন চাকরিজীবী নারীর জন্য শুরু হয় আরেকটি কর্মদিবস। রান্না, সন্তানের যত্ন, বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্যের পরিচর্যা, ঘর গোছানো এবং পরিবারের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর দায়িত্ব অনেক ক্ষেত্রেই তাকেই পালন করতে হয়। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, নারীরা পুরুষদের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি সময় অবৈতনিক গৃহস্থালির কাজে ব্যয় করেন। এই অদৃশ্য শ্রম অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও তার যথাযথ স্বীকৃতি খুব কমই মেলে।

দ্বৈত দায়িত্বের এই চাপ কেবল শারীরিক ক্লান্তি নয়, মানসিক স্বাস্থ্যকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করে। কর্মক্ষেত্রের লক্ষ্য পূরণ, পারিবারিক দায়িত্ব এবং সামাজিক প্রত্যাশার ভার একসঙ্গে বহন করতে গিয়ে অনেক নারী দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ, উদ্বেগ, ঘুমের সমস্যা এবং বার্নআউটের ঝুঁকিতে পড়েন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বার্নআউটকে দীর্ঘমেয়াদি কর্মক্ষেত্র-সম্পর্কিত চাপের ফল হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যা কর্মক্ষমতা ও ব্যক্তিগত জীবনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

প্রযুক্তির দ্রুত প্রসার কাজের ধরন বদলে দিয়েছে, কিন্তু বিশ্রামের সময়ও কমিয়ে এনেছে। অফিস শেষে ফোন, ই-মেইল, মেসেজ কিংবা অনলাইন বৈঠকের কারণে অনেক কর্মজীবী নারী কার্যত সবসময় কর্মস্থলের সঙ্গে সংযুক্ত থাকেন। এতে কাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের সীমারেখা ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। পরিবারকে সময় দেওয়া কিংবা নিজের জন্য কিছুটা অবসর বের করা অনেকের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।

সমস্যার আরেকটি বড় কারণ সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি। একই পরিবারে স্বামী-স্ত্রী দুজনই চাকরি করলেও গৃহস্থালির অধিকাংশ দায়িত্ব নারীর ওপর বর্তায়। ফলে কর্মজীবনে দক্ষতা ও সাফল্য দেখানোর পাশাপাশি পরিবার পরিচালনার চাপও তাকেই সামলাতে হয়। এই অসম দায়িত্ববণ্টন নারীদের পেশাগত উন্নয়ন, নেতৃত্বের সুযোগ এবং মানসিক সুস্থতার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

এই সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন নীতিগত ও সামাজিক—উভয় ধরনের পরিবর্তন। কর্মক্ষেত্রে নমনীয় কর্মঘণ্টা, হাইব্রিড বা দূরবর্তী কাজের সুযোগ, সমান বেতন, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং গোপনীয় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে কার্যকর পিতৃত্বকালীন ছুটি চালু ও ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া প্রয়োজন, যাতে সন্তান ও পরিবারের যত্নের দায়িত্ব নারী-পুরুষ উভয়ে সমানভাবে ভাগ করে নিতে পারেন। বড় প্রতিষ্ঠানে ডে-কেয়ার সুবিধা এবং বয়োজ্যেষ্ঠ পরিচর্যার সহায়ক ব্যবস্থাও কর্মজীবী পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা হতে পারে।

তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি আসতে হবে পরিবার থেকেই। গৃহস্থালির কাজকে নারীর একক দায়িত্ব নয়, বরং পরিবারের সবার যৌথ দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। দায়িত্বের ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত হলে নারীরা শুধু মানসিক চাপ থেকেই মুক্তি পাবেন না; কর্মক্ষেত্রেও তাদের দক্ষতা ও সৃজনশীলতার পূর্ণ বিকাশ ঘটবে।

একটি উন্নত সমাজ কেবল তখনই গড়ে ওঠে, যখন নারীরা কর্মক্ষেত্রে সফল হওয়ার পাশাপাশি ঘরেও সমান সহযোগিতা পান। তাই নারীর অগ্রযাত্রাকে টেকসই করতে হলে কর্মক্ষেত্রের নীতিমালার পাশাপাশি পারিবারিক মানসিকতার পরিবর্তনও সমান জরুরি।