প্রযুক্তি ডেস্ক | নাসির আহমেদ 


পাখির কিচিরমিচির শুনলে মনে হতে পারে এলোমেলো কিছু সুর। কিন্তু নতুন এক গবেষণা বলছে, গানের গঠনে তারা মেনে চলে ঠিক সেই গাণিতিক নিয়ম, যা মানুষের ভাষাতেও কাজ করে।


গবেষণাপত্রটি গত ৭ আগস্ট প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্স অ্যাডভান্সেসে। যৌথভাবে এর নেতৃত্ব দিয়েছেন এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাইমন কার্বি, হিব্রু ইউনিভার্সিটি অব জেরুজালেমের অধ্যাপক ইনবাল আর্নন এবং জাপানের তেইকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কাজুও ওকানোয়া।


গবেষণার বিষয় ছিল বেঙ্গলিজ ফিঞ্চ নামের একটি ছোট পাখি, যারা তাদের জটিল ও শেখা গানের জন্য পরিচিত।


জিফের সূত্র কী

মানুষের ভাষায় শব্দ ব্যবহারের একটি অদ্ভুত নিয়ম আছে। হাতেগোনা কিছু শব্দ ব্যবহৃত হয় অসংখ্যবার, আর বেশিরভাগ শব্দই ব্যবহৃত হয় কদাচিৎ।


ইংরেজিতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত শব্দটি ব্যবহৃত হয় দ্বিতীয় সর্বাধিক ব্যবহৃত শব্দের প্রায় দ্বিগুণ, তৃতীয়টির প্রায় তিন গুণ — এভাবেই চলতে থাকে। এই বণ্টনকেই বলা হয় জিফের সূত্র। গবেষকরা দেখেছেন, বেঙ্গলিজ ফিঞ্চের গানেও ঠিক একই বণ্টন কাজ করছে।


অধ্যাপক ওকানোয়া জানিয়েছেন, ঘন ঘন ব্যবহৃত সুরের গুচ্ছগুলো তুলনামূলক ছোট হয়, আর কম ব্যবহৃত গুচ্ছগুলো লম্বা। বহু বছর এই পাখির গান নিয়ে কাজ করার পরও বিষয়টি তাঁর কাছে বিস্ময়কর ঠেকেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।


শিশুর ভাষা শেখা থেকে ধার করা পদ্ধতি

গবেষণার পদ্ধতিটিও কৌতূহলোদ্দীপক।

শিশুরা কীভাবে অবিচ্ছিন্ন কথার স্রোত থেকে আলাদা শব্দ চিনে নেয়, সেই গবেষণার পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়েছে জাপানে সংগৃহীত ফিঞ্চের গানের তথ্যের ওপর।


তাতে দেখা যায়, গানের ভেতরে রয়েছে সুরের কিছু সুসংহত ক্রম — যা কার্যত পাখিদের ‘শব্দ’। আর সেই ক্রমগুলোই অনুসরণ করছে জিফের বণ্টন।


গবেষকদের ব্যাখ্যা, এই কাঠামো তৈরি হয় সাংস্কৃতিক সঞ্চারণের মধ্য দিয়ে। শিশু যেমন বারবার ফিরে আসা ধ্বনির ধরন চিনে ভাষা শেখে, তরুণ ফিঞ্চও তেমনি সুরের কম্পাঙ্ক খেয়াল করে গান মুখস্থ করে।


তিন প্রজাতি, লক্ষ বছরের দূরত্ব

এর আগে ২০২৫ সালে কুঁজো তিমির গানেও একই বণ্টন শনাক্ত করেছিলেন গবেষকরা। এই দলটিই সেই কাজ করেছিল, আর এবার একই পদ্ধতি প্রয়োগ করেছে পাখির ক্ষেত্রে।


অর্থাৎ বিবর্তনের ধারায় লক্ষ লক্ষ বছর দূরে থাকা অন্তত তিনটি বংশধারায় — মানুষ, বেঙ্গলিজ ফিঞ্চ ও কুঁজো তিমি — একই কাঠামো স্বাধীনভাবে তৈরি হয়েছে।


অধ্যাপক আর্নন বলেন, ভাষাকে সাধারণত মানুষের একচেটিয়া বৈশিষ্ট্য বলে ভাবা হয়। তাঁদের গবেষণা বলছে, যেখানেই যোগাযোগ শেখা হয় এবং এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে ছড়ায়, সেখানেই ভাষার কিছু মৌলিক বৈশিষ্ট্য গড়ে উঠতে পারে।


তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এর অর্থ এই নয় যে মানুষের ভাষা অন্যান্য দিক থেকে বিশেষ নয়।


অর্থ নয়, কাঠামো

গবেষকরা স্পষ্ট করেছেন, পাখির গানের এই ক্রমগুলো মানুষের শব্দের মতো নির্দিষ্ট অর্থ বহন করে না।

অর্থাৎ ফিঞ্চের একটি সুরের গুচ্ছের মানে ‘খাবার’ বা ‘বিপদ’ নয়। মিলটি অর্থে নয়, কাঠামোয়।


গবেষকদের ধারণা, তথ্য যখন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে হস্তান্তরিত হয়, তখন শেখার কাজটি সহজ করতে এই ধরনের গাণিতিক শর্টকাট আপনাআপনিই তৈরি হয়।


দলটি এখন জিফের সূত্রের বাইরে মানুষের ভাষার সঙ্গে আরও সাদৃশ্য খোঁজার পরিকল্পনা করছে।


যে পাখি নিয়ে গবেষণা

বেঙ্গলিজ ফিঞ্চ প্রকৃতিতে পাওয়া যায় না। এটি গৃহপালিত একটি রূপ, যাদের জাপানে প্রায় আড়াইশ বছর ধরে প্রজনন করানো হচ্ছে। অধিকাংশ বিশেষজ্ঞের মতে এরা তিলা মুনিয়ার বংশধর, তবে উৎপত্তি নিয়ে মতভেদ রয়েছে।


কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, বন্য মুনিয়ার গান তুলনামূলক সরল। শিকারির ভয় ও খাদ্যসংকটের চাপে তাদের টিকে থাকতে হয়।


কিন্তু খাঁচার নিরাপদ পরিবেশে প্রজন্মের পর প্রজন্ম কাটানো বেঙ্গলিজ ফিঞ্চের গান হয়ে উঠেছে অনেক বেশি জটিল। গবেষণার জন্য এদের বেছে নেওয়ার কারণও সেটাই।


তথ্যসূত্র: সায়েন্স অ্যাডভান্সেস (কার্বি, ওকানোয়া, গারল্যান্ড, তাকাহাশি ও আর্নন, ২০২৬), এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়, সায়েন্টিফিক আমেরিকান