নিজস্ব প্রতিবেদক | ক্রাইম ক্রনিকল

লেখা: শোয়েব বিন আজিজ


কালেমা লেখা সাদা বা কালো পতাকা নিয়ে আলাপ করতে গেলে প্রথমেই একটা মস্ত বড় ভুল ধারণা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলা দরকার। আমাদের চারপাশে অনেকেই এমনভাবে কথা বলেন, যেন এই পতাকাটা ইসলামের চৌদ্দশ বছরের পুরানো, একদম সর্বজনস্বীকৃত আর অবিতর্কিত কোনো 'ডিভাইন' প্রতীক। অথচ বাস্তবতার জমিনটা অনেক বেশি কমপ্লিকেটেড, অনেক বেশি পলিটিক্যাল।


ইসলামের প্রাথমিক যুগে, মানে রাসূলুল্লাহ (সা.) বা সাহাবিদের আমলে বিভিন্ন রঙের ব্যানার বা পতাকার চল ছিল --- সেইটা ঐতিহাসিক সত্য। কিন্তু আজকে আমরা যেভাবে সাদা বা কালো কাপড়ের ওপর নির্দিষ্ট ফন্টে কালেমা লেখা পতাকা দেখি, সেটার বর্তমান রাজনৈতিক অর্থ মূলত আধুনিক যুগে তৈরি।


বিশেষ করে বিংশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে শুরু করে একবিংশ শতাব্দীতে --- সালাফি, জিহাদি, খেলাফতপন্থী আর ইসলামপন্থী বিভিন্ন দল ও উপদল এই প্রতীকটারে নিজেদের পরিচয়ের প্রধান অংশ বানিয়ে ফেলছে। আফগান জিহাদ থেকে শুরু করে আল-কায়েদা, তালেবান, আইএস, আল-শা*বাব কিংবা দুনিয়ার নানা প্রান্তের নানা ইসলামি সংগঠন এই ধরনের পতাকা কমবেশি ব্যবহার করছে।


ফলে, এই পতাকা আজ আর স্রেফ একটা বিমূর্ত ধর্মীয় আবেগ বা বিশ্বাসের জায়গায় আটকে নাই। এর গায়ে লেপ্টে আছে একটা দীর্ঘ, জটিল এবং বিতর্কিত রাজনৈতিক ইতিহাস।


জরুরি প্রশ্নটা হইলো --- বর্তমানে যারা এই পতাকা ওড়াচ্ছেন, তারা আসলে কী প্রকাশ করতে চান?

অবশ্যই সবার উদ্দেশ্য এক না। কেউ হয়তো স্রেফ নিজের মুসলিম পরিচয়ের একটা সরল প্রকাশ ঘটাইতে চাচ্ছেন। কেউ হয়তো মনে করেন, কৃত্রিম ভূ-রাজনৈতিক সীমানার জাতীয় পতাকার থেকে বৈশ্বিক মুসলিম উম্মাহর প্রতীকটাই তার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।


আবার কেউ কেউ হয়তো এর মাধ্যমে বর্তমান সেক্যুলার বিশ্বব্যবস্থা, জাতীয়তাবাদ কিংবা আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামোর প্রতি নিজের একধরনের বৈপ্লবিক অসন্তোষ বা আপত্তি প্রকাশ করছেন। কিন্তু মুশকিল হইলো, আলাপের শেষটা এখানে হয় না।


কারণ, কোনো প্রতীক বা সিম্বল কেবল তার বর্তমান ব্যবহারকারীর নিয়ত দিয়ে সংজ্ঞায়িত হয় না। প্রতীকের একটা নিজস্ব লাইফলাইন থাকে, তার ইতিহাসও তার অর্থ নির্ধারণে ভূমিকা রাখে।


যেমন ধরা যাক, আজকে দুনিয়ার কোথাও যদি কেউ হুট করে একটা হাতুড়ি-কাস্তে আঁকা লাল পতাকা উড়িয়ে দেয়, লোকে কিন্তু স্রেফ তার ব্যক্তিগত নিয়ত খুঁজতে যাবে না। মানুষ স্বাভাবিকভাবেই সোভিয়েত ইউনিয়নের ইতিহাস, কমিউনিস্ট আন্দোলন, স্তালিনের আমল কিংবা সামগ্রিক শ্রেণিসংগ্রামের অনুষঙ্গগুলা মাথায় আনবে। প্রতীকটা তার ইতিহাসের দায় কোনোভাবেই এড়াইতে পারে না।


কালেমার পতাকার ক্ষেত্রেও ঠিক এই জিনিসটা ঘটে। গত কয়েক দশকে এই পতাকা সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হইছে এমন সব শক্তির হাতে, যাদের লক্ষ্য কেবল ব্যক্তিগত পর্যায়ে ধর্মচর্চা করা ছিল না। সমাজ, রাষ্ট্র ও আইনি ব্যবস্থারে একটা নির্দিষ্ট ইসলামি রাজনৈতিক ছাঁচে পুনর্গঠন করা ছিল তাদের মূল এজেন্ডা।


অবশ্য এই আন্দোলনগুলার ভেতরে আবার আকাশ-পাতাল ফারাক আছে। তালেবানের রাজনীতি একরকম, আল-কায়েদা-র স্ট্র্যাটেজি আরেক রকম, আবার আইএ+সের নৃশংস*তার মাত্রা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।


কিন্তু তাদের সবার ভেতরে একটা কমন সুতো আছে। তারা প্রত্যেকেই আধুনিক জাতিরাষ্ট্র ধারণার প্রতি গভীরভাবে সন্দিহান বা বিরূপ। তাদের বয়ান অনুযায়ী, একজন মুসলমানের প্রধান রাজনৈতিক পরিচয় ভৌগোলিক রাষ্ট্রভিত্তিক নাগরিকত্ব হইতে পারে না।


তার আসল পরিচয় উম্মাহর সদস্যত্ব। অনেক ক্ষেত্রে তারা লিবারেল ডেমোক্রেসি, সেক্যুলারিজম, আধুনিক মানবাধিকার কিংবা নারী-পুরুষের সমঅধিকারের আধুনিক ধারণার প্রতিও সরাসরি আপত্তি জানায়।


ফলে, এই পতাকা যখন কোনো সমাজে হঠাৎ জনপ্রিয় হইতে শুরু করে, তখন প্রশ্ন ওঠাটা খুবই স্বাভাবিক --- মানুষ কি এখানে স্রেফ একটা ব্যক্তিগত ধর্মীয় পরিচয় প্রকাশ করছে, নাকি এর আড়ালে কোনো বৃহত্তর, অনুচ্চারিত রাজনৈতিক কল্পনাও কাজ করছে?


এই প্রশ্নটা বাংলাদেশের মতো একটা দেশে আরও বেশি সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে এই পতাকা যারা উড়াচ্ছেন, তাদের একটা অংশ স্রেফ ধর্মপ্রাণ সাধারণ মুসলমান হইলেও, এর ভেতরে এমন কিছু সুসংগঠিত গোষ্ঠী বা অ্যাক্টিভিস্টও আছেন, যারা প্রকাশ্যে কিংবা পরোক্ষভাবে খেলাফত, শরিয়াহভিত্তি-ক রাষ্ট্র বা ইসলামি রাজনৈতিক আধিপত্যের ধারণা প্রচার করেন।


তাদের কাছে এই পতাকাটা স্রেফ একটা কাপড়ের টুকরা না। এটা একধরনের রাজনৈতিক ঘোষণা। ফলে, সাধারণ একজন তরুণের উদ্দেশ্য যা-ই হোক না কেন, এই প্রতীকের যে একটা রাজনৈতিক পাঠ বা পলিটিক্যাল রিডিং আছে, সেইটারে পুরোপুরি অযৌক্তিক কিংবা ষড়যন্ত্রতত্ত্ব বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।


অনেকে আবার একটা অদ্ভুত যুক্তি দেন যে, বিশ্বকাপের সময় আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিলের পতাকা উড়ালে ক্ষতি নাই, আর কালেমার পতাকা উড়ালেই সমস্যা কেন! এখানে একটা বড় ধোঁয়াশা আছে উনাদের।


আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিলের পতাকা উড়ানো মূলত একটা বিনোদন ও খেলা-কেন্দ্রিক সাময়িক আবেগের বহিঃপ্রকাশ। ঐ পতাকা উড়ানো মানে কেউ আর্জেন্টিনার নাগরিকত্ব দাবি করছে না, কিংবা বাংলাদেশের সংবিধান বদলাইয়া আর্জেন্টিনার আইন চালু করতে চাচ্ছে না।


কিন্তু কালেমার পতাকা উড়ানোর পেছনে কোনো ফুটবল ম্যাচ থাকে না। এর কেন্দ্রে থাকে গভীর পরিচয়বোধ, জীবনদর্শন এবং মতাদর্শ। একটার ভিত্তি বিনোদন, অন্যটার ভিত্তি যাপন ও শাসন। দুটার সামাজিক ও রাজনৈতিক ওজন তাই এক না।


সুতরাং, দিনশেষে আসল সমস্যা এইটা না যে --- একটা গণতান্ত্রিক বা স্বাধীন সমাজে মানুষের এই পতাকা উড়ানোর অধিকার আছে কি নাই! নাগরিক অধিকারের জায়গা থেকে সেই স্বাধীনতা অবশ্যই থাকা উচিত, যতক্ষণ না তা অন্য কারও ক্ষতির কারণ হচ্ছে।


আসল চিন্তার জায়গাটা হইলো --- এই প্রতীকটা ঠিক কী ধরনের ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার বহন করছে, কোন কোন রাজনৈতিক শক্তি এইটারে আজকের এই রূপ দিছে, এবং বর্তমানে যারা এই পতাকা উড়াচ্ছেন তারা আমাদের এই চেনা সমাজ ও রাষ্ট্রটারে ভাঙিয়া আগামীতে কেমন একটা ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতেছেন।


কারণ, পৃথিবীর কোনো পতাকাই শূন্যে জন্ম নেয় না। প্রতিটা পতাকার পেছনে একটা সুনির্দিষ্ট ইতিহাস থাকে, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব থাকে, রাজনীতি থাকে, আর থাকে ভবিষ্যতের একটা ছক।


কালেমার পতাকাও সেই অলঙ্ঘনীয় নিয়মের বাইরে কোনো ব্যতিক্রম না।


লেখায় প্রকাশিত মতামত সম্পূর্ণরূপে লেখকের নিজস্ব; ক্রাইম ক্রনিকলের সম্পাদকীয় অবস্থান নয়।