অপরাধের বিচার যদি জনরোষ নির্ভর হয়, তাহলে তার শাস্তি প্রতিশোধের প্রদর্শনীতে পরিণত হয়
শোয়েব বিন আজিজ, গবেষক
বাংলাদেশে যখনই কোনো শিশু ধর্ষণ বা ভয়াবহ যৌন সহিংসতার ঘটনা সামনে আসে, তখন সমাজের একটা বড় অংশ খুব দ্রুত প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড, ক্রসফায়ার, শিরশ্ছেদ কিংবা শরীয়া আইনের দাবি তোলে। এই প্রতিক্রিয়া কেবল ক্ষোভ দ্বারা সৃষ্ট না। এর ভিতরে বহুদিনের জমে থাকা হতাশা, বিচারহীনতার ক্লান্তি, রাষ্ট্রের প্রতি অবিশ্বাস, ধর্মীয় আবেগ, নিরাপত্তাহীনতা সবকিছু একসাথে কাজ করে।
কারণ মানুষ বছরের পর বছর ধরে একটা জিনিস দেখছে যে, অপরাধী ধরা পড়ে ঠিকই কিন্তু বিচার শেষ হয়না। মামলা চলে কিন্তু রায় আসেনা। ক্ষমতাবান হলে বাঁচার রাস্তা তৈরি হয়। ভুক্তভোগীর পরিবার ভয় পায়।
গণমাধ্যম কিছুদিন চিৎকার করে তারপর অন্য ঘটনায় চলে যায়।
এই বাস্তবতার ভিতর দিয়ে মানুষের মধ্যে ধীরে ধীরে একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে, রাষ্ট্র হয় অক্ষম, না হয় যথেষ্ট আন্তরিক নয়। ফলত, মানুষ তখন আইনের ভাষাকে পাশ কাটিয়ে প্রতিশোধের ভাষায় কথা বলা শুরু করে।
বিশেষ করে শিশু ধর্ষণের মতো ঘটনায় মানুষের ভিতরে আদিম ঘৃণা কাজ করে। কারণ সাধারণত মানুষ শিশুদেরকে নিষ্পাপতার প্রতীক হিসেবে দেখে। ফলে এই ধরনের অপরাধ সমাজের কাছে শুধু আইনভঙ্গ নয়, বরং সভ্যতার বিরুদ্ধে আঘাত বলেও মনে হয়। তখন অনেকে মনে করেন এমন জঘন্য মানুষের জন্য মানবাধিকার বা আইনের যথাযথ প্রক্রিয়ার ধার ধারার দরকার নেই, যথাসম্ভব দ্রুত সময়ে চূড়ান্ত শাস্তি নিশ্চিত করা দরকার।
এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই প্রকাশ্যে ফাঁসি, পাথর নিক্ষেপ, অঙ্গচ্ছেদ কিংবা শরীয়া আইন নিয়ে আবেগীয় দাবি জনপরিসরে উঠতে থাকে।
কিন্তু ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হচ্ছে, এসব মুহূর্তে সমাজ অনেকসময় অপরাধের সামাজিক কারণগুলার চেয়ে শাস্তির দৃশ্যমানতা নিয়েই বেশি ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে। মনোভাব এমন যে, কেবল ভয়ংকর একটি শাস্তি নিশ্চিত করতে পারলেই সমাজ শুদ্ধ হয়ে যাবে।
অর্থাৎ প্রশ্নগুলো তখন আর আলোচনায় থাকে না। কেন এই ধরনের অপরাধ বারবার ঘটছে?
কেন শিশুরা নিরাপদ না?
কেন বিচারব্যবস্থা মানুষের আস্থা পূরণে ব্যর্থ?
বরং আলোচনাটা আড়াল হয়ে নিছক শাস্তিতে আবদ্ধ হয়: কীভাবে সবচেয়ে ভয়ংকর শাস্তি দেওয়া যায়।
এই জায়গাতেই শরীয়া আইন প্রসঙ্গটা আসে।
বাংলাদেশের বহু মানুষের কাছে শরীয়া আইন শুধু ধর্মীয় বিধান নয়, বরং দুর্নীতিগ্রস্ত ও অকার্যকর রাষ্ট্রীয় আইনের বিপরীতে একটা ন্যায়বিচারের কল্পনা। তারা মনে করে মানুষের বানানো আইন ব্যর্থ, এখন ঈশ্বরপ্রদত্ত আইন দরকার।
কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, শরীয়া আইন বলে একক, অভিন্ন, সবার কাছে গ্রহনযোগ্য ধ্রুব বিচারব্যবস্থা ইতিহাসে কখনো ছিল না।
বরং প্রশ্নটা হতে পারে, কোন শরীয়া? সৌদি আরবের? ইরানের? আফগানিস্তানের? পাকিস্তানের? উসমানীয় খেলাফতের ঐতিহাসিক বিচারব্যবস্থার? দক্ষিণ এশিয়ার হানাফি ঐতিহ্যের? নাকি আধুনিক ইসলামি চিন্তাবিদদের সংস্কারবাদী ব্যাখ্যার?
কারণ ইসলামি সভ্যতার ভিতরেই শরীয়ার ব্যাখ্যা, প্রয়োগ, বিচারনীতি, শাস্তি— সবকিছু নিয়েই দীর্ঘ বিতর্ক আছে। হানাফি, মালেকি, শাফেয়ি, হাম্বলি—প্রত্যেক ধারার ভিতরে আলাদা আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়েছে। একই কোরআন-সুন্নাহর ভিতর থেকে যুগ ও সময়ের প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যা বিভিন্ন হয়েছে। কারণ ব্যাখ্যা সবসময়ই ইতিহাস, সংস্কৃতি, রাষ্ট্র, সমাজ, ভাষা এবং ক্ষমতার বাস্তবতার মিথষ্ক্রিয়ায় তৈরি হয়।
এই কারণেই মুসলিম বিশ্বে শরীয়ার বাস্তব চেহারাও একরকম না।
কোথাও রাজতন্ত্রের সাথে শরীয়া মিশে গিয়েছে।
কোথাও উপজাতীয় বা লোকজ সংস্কৃতি, কোথাও উপনিবেশিক আইন কাঠামোয়, কোথাও সামরিক শাসনের সাথে।
আবার কোথাও শরীয়াকে মূলত পারিবারিক ও ব্যক্তিগত আইনের ভিতরে সীমিত রাখা হয়েছে।
ফলে শরীয়া আইন শব্দটা বাস্তবে নির্দিষ্ট ও অভিন্ন বিচারব্যবস্থার কাঠামো চেয়ে অনেকসময় একটা আবেগীয় প্রতীক হিসেবে বেশি উচ্চারিত হয়।
এছাড়া ইসলামি চিন্তা ঐতিহ্যের এমন ধারাও আছে যাদের মতে শরীয়ার মূল উদ্দেশ্য কেবল শাস্তি নয়, বরং মানবকল্যাণ, সামাজিক স্থিতি, ন্যায় এবং মানুষের সমমর্যাদা প্রতিষ্ঠার মাধ্যম। মাকাসিদ আল শরীয়া ধারার আলেমরা স্পষ্টভাবেই বলছেন, জীবন, বুদ্ধি, সম্পদ, পরিবার ও বিশ্বাসের সুরক্ষাই শরীয়ার কেন্দ্রীয় লক্ষ্য।
ফলে শরীয়া মানেই শুধু হাত কাটা, পাথর নিক্ষেপ বা প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড— এই ধারণাটা অনেকাংশেই জনতুষ্টিবাদীয় রাজনৈতিক কল্পনা।
আরেকটা ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হলো, ইতিহাসে বহু ইসলামি বিচারক কঠোর শাস্তি প্রয়োগের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কড়া সাক্ষ্যপ্রমাণ নিশ্চিতের কথা বলেছেন। যুক্তিসঙ্গত সন্দেহের অবকাশ থাকলে শাস্তি এড়ানোর ধারণাও ইসলামি বিচারচিন্তার ভিতরে আছে। কারণ নিরপরাধ ব্যক্তিকে দোষী সাব্যস্ত করার ভয়ও সেখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল।
কিন্তু বর্তমান সময়ে শরীয়া আইন শব্দটা অনেকসময় জটিল আইনদর্শন হিসেবে না বরং আবেগীয় ও রাজনৈতিক স্লোগান হিসেবেই বেশি ব্যবহৃত হয়।
কারণ পপুলিস্ট রাজনীতি সবসময় মানুষের গভীর আবেগের জায়গাগুলা ধরতে চায়। ধর্ম, নারী, শিশু, নৈতিকতা, নিরাপত্তা—এই বিষয়গুলা মানুষের ভিতরে খুব দ্রুত প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। ফলে কঠোর শাস্তির দাবি রাজনৈতিক জনতুষ্টিবাদের ভাষায় পরিণত হয়। মানুষ মনে করে কেউ অন্তত শক্ত কথা বলতেছে।
কিন্তু বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল।
পৃথিবীর যেসব দেশ নিজেদের শরীয়াভিত্তিক রাষ্ট্র বলে পরিচয় দেয়, সেসব দেশের বাস্তবতাও একরকম নয়। কোথাও রাজতন্ত্র, কোথাও সামরিক প্রভাব, কোথাও উপজাতীয় সংস্কৃতি, কোথাও আবার উপনিবেশিক আইনের সাথে শরীয়ার মিশ্রণ ঘটেছে। ফলে শরীয়া চালু করলেই অপরাধ কমে যাবে—এমন সরল সমীকরণ বাস্তবে বিরল।
কারণ ধর্ষণ বা যৌন সহিংসতা শুধু শাস্তির ভয় দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়না। এখানে ক্ষমতার অপব্যবহার, পারিবারিক সহিংসতা, সামাজিক দমন, বিকৃত পুরুষতন্ত্র, বিচারহীনতা, শিশুসুরক্ষার দুর্বলতা, রাজনৈতিক সংস্কৃতি— সবকিছু কাজ করে।
অনেক দেশেই মৃত্যুদণ্ড থাকার পরেও ধর্ষণ বন্ধ হয়নি। আবার কম কঠোর শাস্তির সমাজেও শিশু নিরাপত্তা তুলনামূলক প্রশংসনীয়। কারণ শুধু শাস্তির ভয় নয়, বিচার নিশ্চিত হওয়ার বাস্তব সম্ভাবনাও গুরুত্বপূর্ণ।
আরেকটা ভয়ংকর দিকও আছে। যখন সমাজ অত্যন্ত শাস্তিমুখী হয়ে যায়, তখন অভিযুক্ত আর অপরাধীর পার্থক্য বিলীন হতে শুরু করে। আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আদালতের আগেই রায় দিয়ে দেয়। তখন মিথ্যা অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, জনরোষের চাপে ত্রুটিপূর্ণ শাস্তির ঝুঁকিও বাড়ে।
ইতিহাসে বহু সমাজেই নৈতিক আতঙ্কের মুহূর্তে ভয়াবহ অন্যায় বিচার ঘটেছে। এই কারণে সভ্য বিচারব্যবস্থায় আবেগকে পুরোপুরি অস্বীকার না করলেও, আবেগ তাড়িত বিচার করে না। কারণ আইন যদি পুরোপুরি জনরোষের হাতে চলে যায়, তাইলে বিচার ধীরে ধীরে প্রতিশোধের প্রদর্শনীতে পরিণত হয়।
তবে এটাও সত্য যে, মানুষের এই ক্ষোভকে কেবল মধ্যযুগীয় মানসিকতা বলে উড়িয়ে দিলে তা হবে বাস্তবতাকে অস্বীকার করার নামান্তর। এই ক্ষোভের পেছনে বাস্তব অভিজ্ঞতা বিদ্যমান। মানুষ লক্ষ্য করছে যে, ক্ষমতাবানরা পার পেয়ে যায়, মামলা দীর্ঘসূত্রিতায় ঝুলে থাকে, ভুক্তভোগী বিচার পায় না আর অপরাধ বারবার ফিরে আসে।
ফলে তারা এমন এক শাস্তি কল্পনা করতে শুরু করে যেটা অন্তত তাদের মনে চূড়ান্ত ন্যায়বিচারের অনুভূতি দেয়।
মানে, অনেকসময় মানুষ শুধু শরীয়া আইন চায় না, আসলে তারা একটা কার্যকর রাষ্ট্র, দ্রুত বিচার, সামাজিক নিরাপত্তা এবং নৈতিক স্থিতির সন্ধান চায় যেটা তারা বর্তমান বিচারব্যবস্থায় খুঁজে পাচ্ছে না।
এই বাস্তবতা উপলব্ধি করতে না পারলে পুরো আলোচনা সাদাকালো হয়ে যায়।