নিজস্ব প্রতিবেদক | ক্রাইম ক্রনিকল
বিএনপি সরকারের প্রথম চার মাসে দেশের সড়ক ও সেতু উন্নয়ন প্রকল্পে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পেয়েছে বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলা। স্থানীয় সরকার বিভাগের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সারাদেশে সিটি করপোরেশনের বাইরে তিন হাজারের বেশি সড়ক ও সেতু প্রকল্পের মধ্যে শিবগঞ্জ একাই পেয়েছে প্রায় ৭৪ কোটি টাকার কাজ। এই বরাদ্দ দেশের গড় একটি উপজেলার তুলনায় প্রায় ২০ গুণ বেশি।
অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, এসব প্রকল্পের বড় অংশ পেয়েছে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের ছেলে এবং বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। একই সঙ্গে অভিযোগ উঠেছে, বড় প্রকল্পগুলো খণ্ডিত করে সীমিত দরপত্র পদ্ধতিতে (এলটিএম) পছন্দের ঠিকাদারদের মধ্যে কাজ বণ্টনের।
বগুড়া সবার ওপরে
স্থানীয় সরকার বিভাগের চার মাসের প্রকল্প বরাদ্দ বিশ্লেষণে দেখা যায়, জেলা হিসেবে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পেয়েছে বগুড়া। জেলার মোট বরাদ্দ প্রায় ১৩২ কোটি ২০ লাখ টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা গাজীপুর পেয়েছে ৬৯ কোটি ২০ লাখ টাকা, যা বগুড়ার তুলনায় প্রায় ৯০ শতাংশ কম।
দেশে জেলা প্রতি গড় বরাদ্দ ছিল প্রায় ২২ কোটি ১০ লাখ টাকা। সে হিসাবে বগুড়া একাই প্রায় ছয়টি জেলার সমপরিমাণ প্রকল্প পেয়েছে। তবে আরও বিস্ময়কর তথ্য হলো, বগুড়ার মোট বরাদ্দের অর্ধেকেরও বেশি—প্রায় ৭৪ কোটি টাকা—গিয়েছে একটি উপজেলায়, প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের নির্বাচনী এলাকা শিবগঞ্জে।
শিবগঞ্জ বনাম পুরো দেশ
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দেশের ৩৭৩টি উপজেলা গড়ে পেয়েছে ৩ কোটি ৮০ লাখ টাকার প্রকল্প। অথচ শিবগঞ্জ একাই পেয়েছে ৭৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ গড়ে প্রায় ২০টি উপজেলার সমপরিমাণ বরাদ্দ গেছে এই এক উপজেলায়।
একই সময়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাওয়া গাজীপুরের কালীগঞ্জ পেয়েছে প্রায় ৩২ কোটি টাকা, যা শিবগঞ্জের অর্ধেকেরও কম।
বগুড়ার গাবতলী উপজেলা—যাকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পৈতৃক নিবাস হিসেবে উল্লেখ করা হয়—পেয়েছে প্রায় ২০ কোটি টাকার প্রকল্প। অর্থাৎ শিবগঞ্জ পেয়েছে গাবতলীর চেয়ে সাড়ে তিন গুণেরও বেশি বরাদ্দ।
জেলার বাকি ১০টি উপজেলার ভাগ্যে মোট বরাদ্দের ৩০ শতাংশও জোটেনি। শিবগঞ্জ একাই পেয়েছে বাকি ১০ উপজেলার সম্মিলিত বরাদ্দের প্রায় দ্বিগুণ।
মাঠে গিয়ে যা দেখা গেল
শিবগঞ্জ শহরে ঢুকলেই চোখে পড়ে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের ব্যানার, ফেস্টুন ও পোস্টারের আধিক্য। রাস্তার মোড় থেকে বাজার, ল্যাম্পপোস্ট থেকে দেয়াল—সবখানেই তার উপস্থিতি।
শহরের বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে নতুন ভিত্তিপ্রস্তর। অধিকাংশ ফলকে উদ্বোধক হিসেবে রয়েছে প্রতিমন্ত্রীর নাম। কয়েকটিতে ঠিকাদার হিসেবে খোদাই করা রয়েছে তার ছেলের প্রতিষ্ঠানের নামও।
পৌরসভার গরীবপুর এলাকায় এমন কয়েকটি সরু রাস্তার সন্ধান পাওয়া গেছে, যেখানে গাড়ি চলাচলই কষ্টকর। সেসব জায়গাতেও নতুন রাস্তা নির্মাণের প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে।
সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী প্রতিমন্ত্রীর ছেলে
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শিবগঞ্জে বরাদ্দ পাওয়া ৭৪ কোটি টাকার প্রকল্পের মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ পেয়েছে প্রতিমন্ত্রীর ছেলে মীর শাকরুল আলম সীমান্তের প্রতিষ্ঠান মীর সীমান্ত ইঞ্জিনিয়ারিং।
প্রতিষ্ঠানটি পেয়েছে প্রায় ১৩ কোটি ৫০ লাখ টাকার কাজ, যা শিবগঞ্জের মোট বরাদ্দের প্রায় ১৮ শতাংশ।
সীমান্ত শিবগঞ্জ বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
শুধু তাই নয়, যেসব প্রকল্পের কাজ তার প্রতিষ্ঠানের হাতে গেছে, সেগুলোর কয়েকটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছেন তার বাবা প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম নিজেই।
বিএনপি-ঘনিষ্ঠদের দখলে অর্ধেকের বেশি প্রকল্প
শুধু প্রতিমন্ত্রীর ছেলে নয়, স্থানীয় বিএনপি ও যুবদল নেতাদের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছেও গেছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রকল্প।
শিবগঞ্জ পৌর বিএনপির সভাপতি বুলবুল ইসলামের প্রতিষ্ঠান পেয়েছে প্রায় ১৪ শতাংশ কাজ। যুবদল নেতা খালিদ হাসান আরমানের বোন সোহানী খাতুনের প্রতিষ্ঠান পেয়েছে প্রায় ১২ শতাংশ কাজ। আরমানের নিজের প্রতিষ্ঠানও রয়েছে প্রকল্পপ্রাপ্তদের তালিকায়।
সব মিলিয়ে শিবগঞ্জের ৫২টি প্রকল্পের অন্তত ৩০টি গেছে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত সাতটি প্রতিষ্ঠানের কাছে। মূল্যমানের হিসেবে যা মোট বরাদ্দের প্রায় ৫৩ শতাংশ।
এলটিএমে প্রকল্প বণ্টনের অভিযোগ
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শিবগঞ্জের ৭৪ কোটি টাকার প্রকল্পের মধ্যে প্রায় ৫২ কোটি ৬০ লাখ টাকার কাজ দেওয়া হয়েছে ‘লিমিটেড টেন্ডার মেথড’ (এলটিএম) পদ্ধতিতে।
এই পদ্ধতিতে উন্মুক্ত দরপত্রের পরিবর্তে নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারের কাছ থেকে দরপত্র নেওয়া হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশেষ কারিগরি সক্ষমতার প্রয়োজন হলে এলটিএম ব্যবহার করার কথা। কিন্তু বাস্তবে সাধারণ সড়ক ও অবকাঠামো নির্মাণেও এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে।
বাংলাদেশের সরকারি ক্রয় আইনে পাঁচ কোটি টাকার নিচের কাজের ক্ষেত্রে এলটিএম ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, বড় প্রকল্পগুলোকে ছোট ছোট প্যাকেজে ভাগ করে এই সুবিধা নেওয়া হয়েছে।
এর একটি উদাহরণ হলো ৪২ কোটি টাকার ‘ইম্পর্ট্যান্ট আরবান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (দ্বিতীয় পর্যায়)’। পুরো প্রকল্পকে ১৬টি ছোট প্যাকেজে ভাগ করা হয়। এর মধ্যে পাঁচটি প্যাকেজ পেয়েছে মীর সীমান্ত ইঞ্জিনিয়ারিং। বাকি বেশিরভাগও গেছে স্থানীয় বিএনপি-ঘনিষ্ঠ প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে।
দেশের সবচেয়ে বড় ৫০টি এলটিএম সড়ক প্রকল্পের মধ্যে ১৬টিই গেছে শিবগঞ্জে।
প্রতিমন্ত্রীর ব্যাখ্যা
লিখিত জবাবে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, দায়িত্ব পাওয়ার পর উন্নয়নবঞ্চিত বগুড়ার বিভিন্ন উপজেলার জন্য তিনি বিভিন্ন দপ্তরে ডিও লেটার দিয়েছেন। এর ফলেই জেলার বিভিন্ন এলাকায় সড়ক, সেতু ও অন্যান্য অবকাঠামো প্রকল্পের বরাদ্দ এসেছে।
ছেলের প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে তিনি দাবি করেন, প্রতিষ্ঠানটির লাইসেন্স অনেক আগে আমমোক্তারনামার মাধ্যমে অন্য একজনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ফলে সেখানে তার বা তার সন্তানের কোনো স্বার্থ জড়িত নেই।
তবে আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, আমমোক্তারনামা বা পাওয়ার অব অ্যাটর্নির মাধ্যমে কোনো প্রতিষ্ঠানের মালিকানা আইনগতভাবে হস্তান্তর করা যায় না। এতে কেবল প্রতিনিধিত্বের ক্ষমতা দেওয়া হয়, মালিকানা বা লভ্যাংশের অধিকার পরিবর্তিত হয় না।
প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবতা
নির্বাচনের আগে বগুড়ার এক জনসভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছিলেন, সরকার গঠন করলে শুধু নিজের এলাকা নয়, পুরো দেশের উন্নয়নকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
কিন্তু সরকারের প্রথম চার মাসের প্রকল্প বণ্টনের চিত্রে দেখা যাচ্ছে, জেলা হিসেবে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পেয়েছে বগুড়া, আর সেই বগুড়ার মধ্যেও সবচেয়ে বড় অংশ গেছে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের নিজ নির্বাচনী এলাকা শিবগঞ্জে।
প্রশ্ন উঠছে, এটি কি উন্নয়নের মডেল, নাকি ক্ষমতার কেন্দ্রকে ঘিরে সরকারি সম্পদের অস্বাভাবিক কেন্দ্রীকরণ?
সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে স্থানীয় মানুষ, বিরোধী রাজনৈতিক মহল এবং সুশাসনকর্মীরা।
তথ্য সূত্র: নেত্র নিউজ