স্টাফ রিপোর্টার | ক্রাইম ক্রনিকল
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে ঢাকার অবস্থানের কেন্দ্রে রয়েছে দুটি নাম – শেখ হাসিনা এবং শরিফ ওসমান বিন হাদি।
রোববার (১৬ আগস্ট) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ও জনকূটনীতি অনুবিভাগের অতিরিক্ত পররাষ্ট্র সচিব একেএম শহীদুল করিম জানিয়েছেন, সফরের আগে অনুকূল পরিবেশ তৈরির বার্তা দিল্লিকে দেওয়া হয়েছে।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে দেওয়া, ওসমান হাদি হত্যায় অভিযুক্তদের প্রত্যর্পণ এবং অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করলেই প্রধানমন্ত্রী ভারত সফর করবেন।
অর্থাৎ দুটি আলাদা মামলা এখন একটি কূটনৈতিক সফরের পূর্বশর্তে পরিণত হয়েছে।
প্রথম নাম: শেখ হাসিনা
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর থেকে তিনি সেখানেই অবস্থান করছেন।
মানবতাবিরোধী অপরাধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করেছে। ২০১৩ সালের প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় তাঁকে ফেরত পাঠাতে ভারতের কাছে একাধিকবার চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। তবে সাড়া মেলেনি।
পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয় চলতি মাসের শুরুতে। ৫ আগস্ট, জুলাই অভ্যুত্থানের বার্ষিকীর দিনে দিল্লিতে বিদেশি সাংবাদিকদের একটি ফোরামে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন তিনি।
সেদিন সন্ধ্যায়ই আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বিবৃতিতে বলা হয়, অভ্যুত্থানের বার্ষিকীর দিনে ভারতের মাটিতে এমন সুযোগ দেওয়া বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি অসম্মানজনক।
দিল্লির জবাব ছিল দূরত্ব রাখার। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানান, আয়োজনটি বেসরকারি এবং ওই অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্য ভারত সরকার সমর্থন করে না।

মুখপাত্র শহীদুল করিমের ভাষ্য অনুযায়ী, এই ঘটনাতেই সফর-প্রক্রিয়াটি বিঘ্নিত হয়েছে।
দ্বিতীয় নাম: ওসমান হাদি
দ্বিতীয় মামলাটি তুলনামূলক কম আলোচিত, কিন্তু কূটনৈতিকভাবে সম্ভবত বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান বিন হাদি গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর পুরানা পল্টনে গুলিবিদ্ধ হন। সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর তিনি মারা যান।
মামলার প্রধান আসামি ও তাঁর এক সহযোগী সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে চলে যান। মার্চ মাসে পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁ থেকে তাঁরা গ্রেপ্তার হন।
এরপর পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও তাঁদের দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। জুন মাসে এ নিয়ে রাজপথে বিক্ষোভও করেছে ইনকিলাব মঞ্চ।
কেন হাদি মামলাটি আলাদা
দুটি মামলার আইনি অবস্থান এক নয়, আর এখানেই বিষয়টি জটিল।
শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক আশ্রয়ের প্রশ্ন জড়িত। আন্তর্জাতিক অনুশীলনে এ ধরনের ক্ষেত্রে আশ্রয়দাতা রাষ্ট্রের বিবেচনার সুযোগ থাকে যথেষ্ট। ফলে চুক্তির ধারা উদ্ধৃত করে চাপ তৈরি করা গেলেও বাধ্য করা কঠিন।
কিন্তু হাদি মামলার অভিযুক্তরা সাধারণ ফৌজদারি মামলার আসামি। তাঁরা ভারতে গ্রেপ্তারও হয়েছেন। এখানে রাজনৈতিক আশ্রয়ের যুক্তি খাটে না।
এ কারণেই বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, দিল্লির সদিচ্ছার সবচেয়ে বাস্তব মাপকাঠি হতে পারে এই মামলাটিই।
সফর নিয়ে যা চলছে
আমন্ত্রণের বিষয়টি ভারত একাধিকবার নিশ্চিত করেছে।
গত ১১ আগস্ট সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে জয়সওয়াল জানান, বাংলাদেশে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ পাঠানো হয়েছিল। পাশাপাশি বিমসটেকের চেয়ারপারসন হিসেবে আসন্ন ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ পর্বেও আমন্ত্রণ জানানো হয়।
১৪ আগস্ট আরেক ব্রিফিংয়ে তিনি আবারও আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণের কথা নিশ্চিত করেন।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে জানিয়েছিল, দুই দিনের সফরে ভারত যেতে পারেন প্রধানমন্ত্রী। অন্য একটি প্রতিবেদনে সম্ভাব্য তারিখ হিসেবে ২২ ও ২৩ আগস্টের কথা এসেছে।
তবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় কিংবা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় – কোনো পক্ষই এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়নি।
দেশের ভেতরে বিভক্ত মত
সফর নিয়ে রাজনৈতিক মহলেও মতভেদ স্পষ্ট।
জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, প্রত্যর্পণ প্রশ্নের সমাধান ছাড়া ভারতের সঙ্গে স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার কোনো উদ্যোগ জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। তাঁর চার দাবির দুটিই ছিল হাসিনা ও হাদি-সংক্রান্ত প্রত্যর্পণ।
অন্যদিকে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের মনে করেন, ভারতের আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রীর যাওয়া উচিত।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্রিফিং