বিজ্ঞান তাঁকে ভুলতে পারেনি, ইতিহাস প্রায় ভুলেই গিয়েছিল
ইমতিয়াজ রেজা ফাহাদ

গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাস ঘাঁটলে এমন কিছু ব্যক্তিত্বের দেখা মেলে, যাঁদের কাজ ছাড়া আধুনিক বিজ্ঞান স্থবির হয়ে পড়ত। অথচ ইতিহাসের পাতায় তাঁদের নাম ততটা উচ্চারিত হয় না, যতটা হওয়া উচিত ছিল। এমনই এক কালজয়ী ও বিস্ময়কর প্রতিভার নাম এমি নয়েদার (Emmy Noether)। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে, যখন বিজ্ঞান ও গণিতের জগৎ ছিল সম্পূর্ণ পুরুষতান্ত্রিক এবং নারীদের জন্য উচ্চশিক্ষার দুয়ার ছিল প্রায় রুদ্ধ, তখন সমস্ত সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাধা দু'পায়ে ঠেলে তিনি হয়ে উঠেছিলেন আধুনিক বীজগণিতের জননী।


কিংবদন্তি বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন তাঁর মৃত্যুর পর নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত এক শোকবার্তায় তাঁকে বর্ণনা করেছিলেন এভাবে— “নারীদের উচ্চশিক্ষার পথ উন্মুক্ত হওয়ার পর থেকে এমি নয়েদার ছিলেন এ যাবৎকালের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ, সৃজনশীল এবং অনন্যসাধারণ গাণিতিক প্রতিভা।” আজকের তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান এবং আধুনিক গণিতের যে বিশাল ইমারত আমরা দেখি, তার ভিত্তিমূল স্থাপন করে দিয়েছিলেন এই একাকিনী নারী।


১৮৮২ সালের ২৩ মার্চ জার্মানির বাভারিয়ার এরলানগেন (Erlangen) শহরের এক ইহুদি পরিবারে জন্ম নেন এমি নয়েদার। তাঁর বাবা মাক্স নয়েদারও ছিলেন এরলানগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন খ্যাতনামা গণিতের অধ্যাপক। ফলে ঘরের পরিবেশেই গণিতের একটি স্বাভাবিক আবহ ছিল। তবে তৎকালীন সমাজ মেয়েদের গণিতবিদ বা বিজ্ঞানী হিসেবে দেখার কথা ভাবতেও পারত না। শৈশবে এমিকে শেখানো হয়েছিল পিয়ানো বাজানো, রান্না করা এবং ঘরকন্নার কাজ। তিনি ফরাসি ও ইংরেজি ভাষায় বেশ দক্ষ ছিলেন এবং একসময় শিক্ষকতার সনদও অর্জন করেন। কিন্তু তাঁর ভেতরের গাণিতিক ক্ষুধা তাঁকে সাধারণ গৃহিণীর জীবনে আটকে থাকতে দেয়নি।


১৯০০ সালে তিনি এরলানগেন বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত পড়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু তৎকালীন নিয়ম অনুযায়ী নারীদের সেখানে আনুষ্ঠানিকভাবে ভর্তির কোনো সুযোগ ছিল না। ১৪০ জন পুরুষ শিক্ষার্থীর মধ্যে তিনি ছিলেন মাত্র দুজন নারীর একজন। তাও আবার ক্লাসে বসার জন্য তাঁকে প্রতিটি অধ্যাপকের কাছ থেকে আলাদাভাবে মৌখিক অনুমতি নিতে হতো। দীর্ঘ সংগ্রামের পর ১৯০৪ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টি নারীদের পূর্ণাঙ্গ ভর্তির অনুমতি দিলে এমি নয়েদার আনুষ্ঠানিকভাবে পড়াশোনা শুরু করেন এবং ১৯০৭ সালে পল গর্ডানের তত্ত্বাবধানে গণিতে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ছিলেন জার্মানির ইতিহাসে গণিতে পিএইচডি করা প্রথম কয়েকজন নারীর অন্যতম।


পিএইচডি করার পর শুরু হলো লিঙ্গবৈষম্যের প্রকৃত রূপ। ডক্টরেট ডিগ্রি থাকার পরও কোনো বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিতে রাজি হয়নি। ১৯০৮ থেকে ১৯১৫ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সাত বছর তিনি এরলানগেন গণিত ইনস্টিটিউটে কোনো পদমর্যাদা এবং কোনো ধরনের বেতন ছাড়াই কাজ করেন। মাঝে মাঝে তাঁর অসুস্থ বাবার পরিবর্তে ছদ্মনামে ক্লাসও নিতেন।


১৯১৫ সালে বিখ্যাত গণিতবিদ ডেভিড হিলবার্ট এবং ফেলিক্স ক্লেইন এমি নয়েদারের প্রতিভা অনুধাবন করতে পারেন এবং তাঁকে গটিংগেন বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানান। কিন্তু সেখানেও অনুষদের অন্যান্য সদস্য একজন নারীকে অধ্যাপক হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানান। তাঁদের যুক্তি ছিল, একজন নারী কীভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য হবেন? এর জবাবে ডেভিড হিলবার্ট ক্ষোভ প্রকাশ করে একটি ঐতিহাসিক মন্তব্য করেছিলেন— “আমি বুঝতে পারছি না প্রার্থীর লিঙ্গ কেন তাঁকে একজন লেকচারার হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে বাধা হবে। সর্বোপরি, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়টি একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, এটি কোনো গণগোসলখানা (Public Bath) নয়!”


তবে অনুষদের আপত্তির কারণে প্রথম কয়েক বছর এমি নয়েদারকে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পদ দেওয়া হয়নি। তিনি হিলবার্টের নামেই লেকচার দিতেন এবং তাঁর সহকারী হিসেবে কাজ করতেন। অবশেষে ১৯১৯ সালে তিনি ‘প্রাইভেটডোজেন্ট’ (বেতনহীন প্রভাষক) হিসেবে স্বীকৃতি পান এবং ১৯২২ সালে অত্যন্ত নামমাত্র বেতনে সহকারী অধ্যাপকের পদ লাভ করেন।


এমি নয়েদার মূলত বিশুদ্ধ গণিতবিদ হলেও পদার্থবিজ্ঞানে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয়। ১৯১৫ সালে আলবার্ট আইনস্টাইন যখন তাঁর সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব (General Theory of Relativity) প্রকাশ করেন, তখন শক্তির সংরক্ষণশীলতা নিয়ে একটি জটিল গাণিতিক সমস্যা দেখা দেয়। আইনস্টাইন, হিলবার্ট ও ক্লেইন—কেউই সেই জট খুলতে পারছিলেন না। হিলবার্ট এই সমস্যার সমাধানের দায়িত্ব দেন এমির ওপর। এমি নয়েদার শুধু সেই সমস্যার সমাধানই করেননি, বরং পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি উপপাদ্য আবিষ্কার করেন, যা আজ ‘নয়েদারের উপপাদ্য’ (Noether’s Theorem) নামে পরিচিত। ১৯১৮ সালে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয়। এই উপপাদ্যটি পদার্থবিজ্ঞানের দুটি আপাত ভিন্ন ধারণাকে এক সুতোয় বেঁধে দেয়—প্রতিসাম্য (Symmetry) এবং সংরক্ষণশীলতার নীতি (Conservation Laws)।


সহজ কথায়, প্রকৃতিতে যদি কোনো গাণিতিক প্রতিসাম্য থাকে, তবে তার সমান্তরালে একটি ভৌত রাশি সবসময় সংরক্ষিত থাকবে। আজকের কোয়ান্টাম মেকানিক্স, কণা পদার্থবিজ্ঞান (Particle Physics) এবং হিগস বোসন বা ‘ঈশ্বর কণা’–সংক্রান্ত গবেষণার অন্যতম তাত্ত্বিক ভিত্তি হলো নয়েদারের এই উপপাদ্য। এই কাজ দেখে মুগ্ধ হয়ে আইনস্টাইন হিলবার্টকে এক চিঠিতে লিখেছিলেন, “নয়েদার কত চমৎকার গাণিতিক চিন্তাভাবনা করতে পারেন, আমাদের পুরোনো শিক্ষকেরা তাঁর কাছে নস্যি।”


পদার্থবিজ্ঞানের জট খুলে দিয়ে এমি নয়েদার আবার ফিরে যান তাঁর প্রিয় আঙিনা—বিশুদ্ধ গণিতে। ১৯২০ থেকে ১৯৩৩ সালের মধ্যে তিনি গণিতের জগৎকে আমূল বদলে দেন। তিনি ‘অ্যাবস্ট্রাক্ট অ্যালজেব্রা’ বা বিমূর্ত বীজগণিতের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। তাঁর আগের গণিতবিদরা মূলত নির্দিষ্ট সংখ্যা বা সমীকরণ নিয়ে কাজ করতেন। কিন্তু নয়েদার গণিতকে সংখ্যার খাঁচা থেকে বের করে এনে ‘বিমূর্ত কাঠামো’ (Abstract Structures) হিসেবে দেখতে শেখান।


তিনি রিং (Rings), ফিল্ডস (Fields), গ্রুপ (Groups) এবং আইডিয়ালস (Ideals) নিয়ে মৌলিক কাজ করেন। তাঁর নামানুসারে আধুনিক গণিতে স্থান করে নিয়েছে নয়েদারিয়ান রিং (Noetherian Rings), নয়েদারিয়ান গ্রুপ (Noetherian Groups), নয়েদারিয়ান মডিউল (Noetherian Modules) প্রভৃতি ধারণা। তিনি গণিতের বিভিন্ন শাখাকে একটি সাধারণ গাণিতিক কাঠামোর আওতায় নিয়ে আসেন, যা আজকের রিং থিওরি এবং লিনিয়ার অ্যালজেব্রার অন্যতম ভিত্তি। গণিতবিদ বি. এল. ভ্যান ডার ভার্ডেন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ Modern Algebra রচনার ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে নয়েদারের লেকচারের ওপর নির্ভর করেছিলেন।

photo: ১৯১৮ সালে প্রকাশিত এমি নয়েদারের প্রমাণিত থিওরম "Invariante Variationsprobleme"

গটিংগেন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর সময় এমি নয়েদারকে কেন্দ্র করে একদল তরুণ প্রতিভাবান গণিতবিদের দল গড়ে উঠেছিল, যাঁদের স্নেহভরে ‘নয়েদার বয়েজ’ (Noether Boys) বলা হতো। শিক্ষক হিসেবে নয়েদার ছিলেন অত্যন্ত অমায়িক ও উদার। নিজের কোনো আইডিয়া বা আবিষ্কার তিনি নিজের নামে কুক্ষিগত করে রাখতেন না; বরং শিক্ষার্থীদের বলতেন সেগুলো নিয়ে কাজ করে নিজেদের নামে গবেষণাপত্র প্রকাশ করতে। তিনি ক্লাস নেওয়ার সময় কোনো নোট ব্যবহার করতেন না। বোর্ডে তাৎক্ষণিকভাবে গাণিতিক সমস্যার সমাধান করতে করতে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করতেন। তাঁর এই প্রাণবন্ত ও স্নেহশীল আচরণের কারণে শিক্ষার্থীরা তাঁকে মায়ের মতো শ্রদ্ধা করত।


১৯৩৩ সাল। জার্মানিতে এডলফ হিটলারের নাৎসি বাহিনীর উত্থান ঘটে। ইহুদিদের ওপর শুরু হয় অমানুষিক নির্যাতন। নাৎসি সরকার আইন পাস করে যে কোনো ইহুদি সরকারি বা বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরিতে থাকতে পারবে না। ফলস্বরূপ, এমি নয়েদারকে গটিংগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনা থেকে বরখাস্ত করা হয়। চাকরি হারানোর পরও তিনি দমে যাননি। তিনি নিজের অ্যাপার্টমেন্টে গোপনে শিক্ষার্থীদের ডেকে গণিত শেখাতেন। এমনকি নাৎসি ইউনিফর্ম পরা শিক্ষার্থীদেরও তিনি সানন্দে গণিত শিখিয়েছেন, কারণ তাঁর কাছে বিজ্ঞানের চেয়ে বড় কোনো ধর্ম বা রাজনীতি ছিল না। তবে পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ হতে থাকায় ১৯৩৩ সালের শেষের দিকে তিনি জার্মানি ছেড়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। সেখানে তিনি পেনসিলভানিয়ার ‘ব্রিন মার’ (Bryn Mawr) নারী কলেজে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন এবং প্রিন্সটনের ইনস্টিটিউট ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিতে লেকচার দেওয়া শুরু করেন।


আমেরিকায় এসে এমি নয়েদার তাঁর জীবনের এক শান্তিময় ও সম্মানজনক অধ্যায় শুরু করেছিলেন। কিন্তু নিয়তি ছিল নিষ্ঠুর। ১৯৩৫ সালের এপ্রিল মাসে তাঁর শরীরে একটি টিউমার ধরা পড়ে। অস্ত্রোপচার সফল হলেও, তার মাত্র কয়েকদিন পর ১৯৩৫ সালের ১৪ এপ্রিল হঠাৎ করেই এক অভ্যন্তরীণ জটিলতার কারণে মাত্র ৫৩ বছর বয়সে এই মহান বিজ্ঞানী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।


এমি নয়েদারের জীবন ছিল এক নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামের গল্প। তিনি এমন এক সময়ে বিজ্ঞানচর্চা করেছেন, যখন সমাজ মনে করত নারীর মস্তিষ্ক জটিল গণিত বা বিজ্ঞানের জন্য উপযুক্ত নয়। তিনি কোনো দিন বিয়ে করেননি, কোনো দিন অঢেল সম্পদের মালিক হননি; জীবনের সিংহভাগ সময় পার করেছেন প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি এবং পর্যাপ্ত বেতন ছাড়াই। কিন্তু বিজ্ঞানের প্রতি তাঁর যে নিখাদ ভালোবাসা ছিল, তা তাঁকে করে তুলেছে অমর।


আজকের বিজ্ঞান জগৎ এমি নয়েদারকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। চাঁদের একটি গহ্বরের নাম রাখা হয়েছে তাঁর নামে—Noether Crater। প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা যখনই কোনো প্রতিসাম্য বা বীজগণিতের জটিল সমীকরণ নিয়ে কাজ করে, তখনই তারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এমি নয়েদারের মেধার কাছে ঋণী থাকে। তিনি শুধু আধুনিক বীজগণিতের জননীই নন, বরং যুগে যুগে বিজ্ঞানমনস্ক নারীদের জন্য এক অফুরন্ত অনুপ্রেরণার বাতিঘর।