পরিবেশ ডেস্ক | ক্রাইম ক্রনিকল
তীব্র খরা ও দাবদাহে ইউরোপের দ্বিতীয় দীর্ঘতম নদী দানিউবের পানি নেমে গেছে রেকর্ড পর্যায়ে। ফলে নদীর তলদেশ থেকে বেরিয়ে আসছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ডুবিয়ে দেওয়া জার্মান যুদ্ধজাহাজের ধ্বংসাবশেষ।
সার্বিয়া ও রোমানিয়ার সীমান্তে সার্বীয় বন্দর শহর প্রাহোভোর কাছে এসব ধ্বংসাবশেষ দেখা যাচ্ছে। নদীর মাঝখানে এখন স্পষ্ট মরচে ধরা পাটাতন আর ভাঙা মাস্তুল — যেখানে একসময় উড়ত নাৎসি পতাকা।
জানা গেছে, জাহাজগুলোর কোনো কোনোটিতে এখনো অস্ত্র ও গোলাবারুদ রয়ে গেছে। এ কারণে উদ্ধার কাজ কারিগরিভাবে যেমন কঠিন, তেমনি ঝুঁকিপূর্ণও।
যেভাবে ডুবেছিল জাহাজগুলো
জাহাজগুলো ছিল নাৎসি জার্মানির কৃষ্ণসাগর ও দানিউব নৌবহরের অংশ। ১৯৪৪ সালে সোভিয়েত বাহিনী এগিয়ে আসতে থাকলে রোমানিয়া থেকে পিছু হটার সময় জার্মান বাহিনী নিজেরাই সেগুলো ডুবিয়ে দেয়।
উদ্দেশ্য ছিল দুটি — শত্রুর হাতে জাহাজ পড়তে না দেওয়া এবং নদীপথ আটকে বলকান অঞ্চলে সোভিয়েত অগ্রযাত্রা ধীর করা। তবে কয়েক মাসের মধ্যেই, ১৯৪৫ সালের মে মাসে, আত্মসমর্পণ করে নাৎসি জার্মানি।
সেই যুদ্ধকালীন বাধা যুদ্ধের চেয়েও দীর্ঘায়ু পেয়েছে। ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, প্রাহোভোর কাছে নদীর প্রায় পাঁচ কিলোমিটার অংশজুড়ে এখনো ছড়িয়ে আছে প্রায় ২০০টি ধ্বংসাবশেষ।
এর মধ্যে রয়েছে যুদ্ধজাহাজ, বার্জ, টাগবোট ও মালবাহী নৌযান। কোনোটির বুরুজ, কমান্ড ব্রিজ বা পেঁচিয়ে যাওয়া কাঠামো এখনো চেনা যায়, কোনোটি আবার প্রায় পুরোটাই বালুচরের নিচে।
শুধু জাহাজ নয়
এবারের খরায় জেগে উঠেছে আরও পুরোনো ইতিহাসও। নদীগর্ভ থেকে বেরিয়ে এসেছে প্রাগৈতিহাসিক লোমশ ম্যামথের হাড়ও।
তবে কৌতূহলের পাশাপাশি সংকটও তীব্র হচ্ছে। জানা গেছে, পানির স্তর নেমে যাওয়ায় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে এবং মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের সরকারগুলো বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে পদক্ষেপ নিচ্ছে।
দশটি দেশের ভেতর দিয়ে বয়ে চলা এই নদীতে জাহাজ চলাচল সচল রাখতে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। প্রাহোভোর বাসিন্দা ক্রিস্তা ব্রান্দিচের ভাষ্য, পানি এতটাই কমেছে যে বড় জাহাজ আর চলতে পারছে না।
সার্বিয়া, ক্রোয়েশিয়া, হাঙ্গেরি ও রোমানিয়ার বিভিন্ন অংশে নদীর স্তর নেমে বিশাল বালুচর জেগে উঠেছে। ব্যাহত হচ্ছে পণ্য পরিবহন, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পর্যটন।
নতুন কিছু নয়, বাড়ছে ঘনঘন
এই দৃশ্য অবশ্য প্রথমবার নয়। ২০২২ সালে রেকর্ড পরিমাণ পানি কমে যাওয়ার পর প্রাহোভোর কাছে একইভাবে জাহাজগুলো ভেসে উঠেছিল।
২০২৪ সালেও বিস্ফোরকবাহী কিছু জাহাজ দৃশ্যমান হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, অস্বাভাবিক এই তাপপ্রবাহের পেছনে বৈশ্বিক উষ্ণায়নসহ একাধিক কারণ কাজ করছে।
ধ্বংসাবশেষ অপসারণে ইতিমধ্যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রথম ধাপে নৌচলাচলের পথে বা তার কাছাকাছি থাকা ২১টি জাহাজ সরানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যদিও বেশিরভাগই এখনো পানির নিচে।