স্টাফ রিপোর্টার | ক্রাইম ক্রনিকল
যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টারে আন্তর্জাতিক ফ্যাশন শিল্পে প্রতিষ্ঠিত ক্যারিয়ার, উচ্চ বেতন এবং আরামদায়ক করপোরেট জীবন ছেড়ে প্রায় এক দশক আগে খাগড়াছড়ির পাহাড়ে স্থায়ী হয়েছিলেন মাহফুজ আহমেদ রাসেল। সেই সিদ্ধান্তই আজ তাকে দেশের প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখে পরিণত করেছে। দীর্ঘদিনের সংরক্ষণ কার্যক্রমের স্বীকৃতি হিসেবে এবার তিনি পেয়েছেন ‘বৃক্ষরোপণে জাতীয় পুরস্কার-২০২৫’।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের দেওয়া এই পুরস্কারে তিনি বৃক্ষ গবেষণা, সংরক্ষণ ও উদ্ভাবন বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন করেছেন। চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের।

পিটাছড়ায় বুলবুলির ৩ টি ছানা। মাহফুজ রাসেলের ফেসবুক ওয়াল থেকে নেওয়া।
বর্তমানে খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলার পূর্ব খেদাছড়ায় গড়ে তোলা তার ৭৫ একরের প্রাকৃতিক মিশ্র চিরহরিৎ বন ‘পিটাছড়া’ দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বন্যপ্রাণী আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
করপোরেট জীবন থেকে প্রকৃতির পথে
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবসায় প্রশাসনে পড়াশোনা শেষ করে পোশাক খাতে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন মাহফুজ রাসেল। পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাজ্যে যান এবং আন্তর্জাতিক ফ্যাশন শিল্পে দ্রুত সাফল্য অর্জন করেন। প্যারিস, মিলান, লন্ডন ও টোকিওর মতো বিশ্বখ্যাত নগরীতেও কাজ করেছেন তিনি।
তবে এই সাফল্য ও চাকরিজীবন তাকে মানসিক তৃপ্তি দিতে পারেনি। রাসেলের ভাষায়, আধুনিক ভোগবাদী সংস্কৃতিকে কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা তাকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করে।
এই উপলব্ধি থেকেই তিনি ইউরোপ, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন পরিবেশবান্ধব কমিউনিটিতে কাজ শুরু করেন। বিশেষ করে আমাজন অঞ্চলে কাজ করার অভিজ্ঞতা তার চিন্তাজগতে বড় পরিবর্তন আনে। তিনি উপলব্ধি করেন, মানুষ প্রকৃতির মালিক নয়; বরং প্রকৃতির বৃহৎ ব্যবস্থারই একটি ক্ষুদ্র অংশ।
পাঁচ একর থেকে ৭৫ একরের বন
এই ভাবনা থেকেই ২০১৬ সালে ম্যানচেস্টারের জীবন ছেড়ে দেশে ফেরেন মাহফুজ রাসেল। প্রথমে খাগড়াছড়িতে মাত্র পাঁচ একর পাহাড়ি জমি কেনেন। শুরুতে তার উদ্দেশ্য ছিল প্রকৃতির কাছাকাছি একটি শান্ত জীবন গড়ে তোলা।

পিটাছড়ায় মাহবুব রনির তোলা একই জায়গায় ২০১৮ আর ২০২১ এ তোলা ছবি। মাহফুজ রাসেলের পিটাছড়া এলবাম থেকে সংগৃহীত।
কিন্তু পাহাড়ে এসে তিনি বন উজাড়, তামাক চাষের বিস্তার এবং বন্যপ্রাণী নিধনের বাস্তবতা প্রত্যক্ষ করেন। এরপরই একটি নিরাপদ বনাঞ্চল গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন।
শুরুটা ছিল কঠিন। পাহাড়ি এলাকায় আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ছাড়াই বাঁশ ও ছনের তৈরি ঘরে বসবাস শুরু করেন। স্থানীয়দের অনেকেই তখন তার উদ্যোগকে অস্বাভাবিক বলে মনে করতেন।
তবে ধীরে ধীরে তার সঙ্গে যুক্ত হতে থাকেন প্রকৃতিপ্রেমী মানুষ ও সহযাত্রীরা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাঁচ একরের উদ্যোগ বিস্তৃত হয়ে ৭৫ একরের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে রূপ নেয়।
প্রকৃতিকে প্রকৃতির মতোই বেড়ে উঠতে দেওয়া
পিটাছড়া বনের মূল দর্শন হলো ‘হস্তক্ষেপহীন সংরক্ষণ’। অর্থাৎ প্রকৃতিকে তার নিজস্ব নিয়মে বিকশিত হওয়ার সুযোগ দেওয়া।

মাশরুম। মাহফুজ রাসেলের ফেসবুক এলবাম ‘পিটাছড়া’ থেকে নেওয়া।
মাহফুজ রাসেলের মতে, প্রকৃতি নিজেকে পুনর্গঠন করার ক্ষমতা মানুষের চেয়ে অনেক ভালোভাবে জানে। তাই বন তৈরির ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ না করে পরিবেশকে স্বাভাবিকভাবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ দেওয়াই সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি।
এই দর্শনের ফলেই গত এক দশকে পিটাছড়ায় গড়ে উঠেছে গর্জন, চাপালিশ, গামার, ডুমুর, বুনো আমড়াসহ অসংখ্য দেশীয় বৃক্ষের সমৃদ্ধ বনভূমি।
বিপন্ন প্রাণীর নিরাপদ আশ্রয়
বর্তমানে পিটাছড়া শুধু একটি বন নয়, বরং বহু বিপন্ন ও বিরল প্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল।

পিটাছড়ায় ‘পিগমি ট্রি ফ্রগ’। ছবি: মাহফুজ রাসেল
এখানে নিয়মিত দেখা মেলে মহাবিপন্ন এশীয় হলদে কচ্ছপ, পাহাড়ি শিলা কচ্ছপ, গোলবাহার অজগর, চশমাপড়া হনুমান, কেউটে ও শঙ্খিনীর মতো বিভিন্ন প্রাণীর।
বনের ঝিরি ও ছড়াগুলোতে রয়েছে ৩০টিরও বেশি প্রজাতির পাহাড়ি ব্যাঙ। এছাড়া লজ্জাবতী বানর, উল্টোলেজি বানর, বনরুই, বুনো সজারু এবং চিতা বিড়ালের মতো প্রাণীরও আবাস গড়ে উঠেছে এখানে।
পাখিপ্রেমীদের কাছেও পিটাছড়া একটি গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। ধনেশ, হিল ময়না, কাঠঠোকরা, সাহেব বুলবুল ও বিভিন্ন প্রজাতির বুনো পেঁচার উপস্থিতি বনের জীববৈচিত্র্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
ঝিরি ও পাহাড়ি জলধারা রক্ষার উদ্যোগ
‘পিটাছড়া’ নামটির মধ্যেও রয়েছে সংরক্ষণের দর্শন। ‘পিটা’ একটি বিরল পাখির নাম এবং ‘ছড়া’ বলতে বোঝায় পাহাড়ি জলধারা।
মাহফুজ রাসেলের মতে, পার্বত্য অঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার জন্য ঝিরি ও প্রাকৃতিক জলধারা সংরক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

পিটাছড়ায় ছড়ার জলে ভাসছে ডালুপ / পাহাড়ি কদম / ভোলা কদম এর ফুল। ছবি: মাহফুজ রাসেলের ফেসবুক ওয়াল
তার ভাষায়, জলধারা শুকিয়ে গেলে বন্যপ্রাণীর টিকে থাকাও কঠিন হয়ে পড়বে। তাই স্থানীয় প্রজাতির গাছপালা সংরক্ষণের মাধ্যমে পানির উৎস সচল রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি মনে করেন, শুধু শিকার বন্ধ করলেই বন রক্ষা সম্ভব নয়; বনভূমির অস্তিত্বও সমানভাবে নিশ্চিত করতে হবে।
স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সঙ্গে নিয়েই সংরক্ষণ
পিটাছড়া প্রকল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সক্রিয় অংশগ্রহণ।
এখানে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা সহায়তা, মাশরুম চাষ এবং জৈব কৃষি প্রশিক্ষণসহ নানা সামাজিক কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে। প্রায় এক দশক ধরে পরিচালিত একটি বিনামূল্যের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র স্থানীয় বাসিন্দাদের চিকিৎসা সহায়তা দিয়ে আসছে।

পিটাছড়ায় পাঠাগার। ছবি: মাহফুজ রাসেলের ফেসবুক এলবাম।
স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ ইউসুফ জানান, এসব উদ্যোগের ফলে এলাকায় শিকার করার প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
মাহফুজ রাসেলের মতে, মানুষের জীবনমান উন্নত করতে পারলে বনভূমির ওপর চাপও কমে আসে।
গবেষণার নতুন কেন্দ্র
বর্তমানে পিটাছড়া দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান, বনবিদ্যা ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য একটি বাস্তবভিত্তিক গবেষণাগারে পরিণত হয়েছে।
এখানে একটি পূর্ণাঙ্গ সংরক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাও রয়েছে। দেশি-বিদেশি গবেষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য গবেষণা, প্রশিক্ষণ এবং পরিবেশ শিক্ষা কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
ভবিষ্যতের পরিকল্পনা
জাতীয় পুরস্কার অর্জনের পরও থেমে থাকতে চান না মাহফুজ রাসেল। তার লক্ষ্য পার্বত্য অঞ্চলে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে বৃহৎ পরিসরে বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম পরিচালনা করা।
তিনি মনে করেন, বন সংরক্ষণকে টেকসই করতে হলে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জীবিকার উন্নয়নকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
জাতীয় স্বীকৃতি প্রসঙ্গে মাহফুজ রাসেল বলেন, এই অর্জন কোনো একক ব্যক্তির নয়; বরং বহু মানুষের সহযোগিতা, বিশ্বাস ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল।