নিজস্ব প্রতিবেদক | মানিকগঞ্জ


বিদ্যালয়ে এক সহপাঠীর সঙ্গে আপত্তিকর অবস্থায় ধরা পড়ার অভিযোগ। একই দিন দুই শিক্ষার্থীকে দেওয়া হয় ট্রান্সফার সার্টিফিকেট (টিসি)। সেদিনই বাড়ি থেকে বেরিয়ে নিখোঁজ হয় অষ্টম শ্রেণির এক ছাত্রী। ছয় দিন পর কবরস্থানসংলগ্ন একটি বাঁশঝোপ থেকে উদ্ধার হয় তার অর্ধগলিত খণ্ডিত মরদেহ।


মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার এই ঘটনাকে ঘিরে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। তবে মৃত্যুর কারণ, এটি হত্যা নাকি আত্মহত্যা—কোনোটিই এখনো নিশ্চিত নয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। তদন্তের স্বার্থে একই বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।


যা জানা গেছে


নিহত কিশোরী মারিয়া (১৪) সিংগাইর উপজেলার শায়েস্তা ইউনিয়নের বাসিন্দা এবং স্থানীয় সাহরাইল উচ্চবিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী। তার বাবা প্রবাসে থাকেন।


পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, গত ১৫ জুন টিফিন বিরতির সময় বিদ্যালয়ের একটি শ্রেণিকক্ষে দশম শ্রেণির এক ছাত্রের (আলিফের  )সঙ্গে ওই কিশোরীকে আপত্তিকর অবস্থায় দেখা যায় বলে অভিযোগ ওঠে। বিদ্যালয়ের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনার পর দুই শিক্ষার্থীর অভিভাবকদের ডাকা হয়। পরে মুচলেকা নিয়ে উভয়কেই ট্রান্সফার সার্টিফিকেট (টিসি) দেওয়া হয়।


পরিবারের দাবি, ওই দিনই কিশোরী নিজের মোবাইল ফোন বাসায় রেখে বেরিয়ে যায়। এরপর আর তার খোঁজ পাওয়া যায়নি। বিষয়টি নিয়ে সিংগাইর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়।


রোববার (২১ জুন) বিকেল পৌনে ৫টার দিকে উপজেলার জামির্ত্তা ইউনিয়নের চন্দননগর এলাকার একটি কবরস্থানসংলগ্ন বাঁশঝোপে স্থানীয়রা একটি মরদেহ দেখতে পেয়ে পুলিশে খবর দেন।


পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখতে পায়, মরদেহের ওপরের অংশ গলায় ওড়না পেঁচানো অবস্থায় একটি গাছের সঙ্গে ঝুলছিল। কোমরের নিচের অংশ মাটিতে পড়ে ছিল। মরদেহটি অর্ধগলিত অবস্থায় ছিল। ঘটনাস্থলের কাছ থেকে একটি স্কুলব্যাগ ও এক জোড়া জুতা উদ্ধার করা হয়েছে।




পরে মরদেহটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।


তদন্তে যেসব প্রশ্ন


ঘটনার পর থেকেই এলাকায় নানা ধরনের আলোচনা ও গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিভিন্ন দাবি করা হচ্ছে। তবে এসব দাবির কোনোটি এখন পর্যন্ত তদন্তে নিশ্চিত হয়নি।


তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর মিললেই ঘটনার প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।


প্রথমত, টিসি পাওয়ার পর কিশোরী কেন সেদিনই বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল? বের হওয়ার আগে বা পরে কারও সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়েছিল কি না, সেটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।


দ্বিতীয়ত, কিশোরীর মৃত্যু আত্মহত্যা, নাকি অন্য কোনো অপরাধের ফল—তা নির্ধারণে ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক পরীক্ষার প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।


তৃতীয়ত, মরদেহ যেভাবে পাওয়া গেছে, সেটি ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয়েছে, নাকি অন্য কোথাও হত্যার পর সেখানে এনে রাখা হয়েছে—সেটিও তদন্তের অংশ।


একজনকে ঘিরে ক্ষোভ, তবে তদন্ত এখনো শেষ হয়নি


ঘটনার পর একই বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী আলিফকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ। তবে তাকে এখনো আদালতে দোষী সাব্যস্ত করা হয়নি।


এদিকে স্থানীয়দের একাংশ ওই শিক্ষার্থীকে দায়ী করে বিক্ষোভ করেন। অভিযোগ রয়েছে, তার পরিবারের বাড়িতেও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এ বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।


পুলিশের বক্তব্য


সিংগাইর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাজহারুল ইসলাম বলেন, "ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হচ্ছে। একজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার আগে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়।"


তিনি বলেন, তদন্তের প্রতিটি দিক গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা


অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, আলোচিত বা আবেগঘন কোনো ঘটনায় তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, সম্ভাব্য আলামত, ফরেনসিক পরীক্ষা এবং সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই ঘটনার চূড়ান্ত চিত্র নির্ধারিত হবে।